মিয়ানমারে জাতীয় নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপেও বেশিরভাগ আসনে জয় দাবি করেছে জান্তা সমর্থিত দল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি)। ভোটগ্রহণের দুদিন পর মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলটির একজন নেতা জানান, দ্বিতীয় ধাপের ভোটে তারা ‘১০০টির মধ্যে ৮৭টি আসন জিতেছেন’। এএফপি।সশস্ত্র সংঘাতের কারণে তিন ধাপে আয়োজন করা হয়েছে মিয়ানমারের নির্বাচন। গত ২৮ ডিসেম্বর প্রথম দফায় ৩৩০টির মধ্যে ১০২টি আসনে ভোটগ্রহণ করা হয়। ভোটে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের ১০২ আসনের মধ্যে ৮৯টিতে জয়ী বলে দাবি করেছে জান্তাপন্থি দল ইউএসডিপি। যা শতকরা হিসেবে প্রায় ৮৭ শতাংশ। বাকি আসনগুলো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের প্রতিনিধিত্বকারী কয়েকটি দল পেয়েছে। বিশ্লেষক ও গণতন্ত্র নিরীক্ষকরা ইউএসডিপিকে সামরিক বাহিনীর আজ্ঞাবহ দল হিসেবে বিবেচনা করেন। দলটির জ্যেষ্ঠ পদে অসংখ্য সাবেক ও অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা আছেন। এরপর গত রোববার (১১ জানুয়ারি) দ্বিতীয় ধাপের ভোট অনুষ্ঠিত হয়। ইউএসডিপির হিসেব অনুসারে, দুই ধাপের ফলাফল মিলিয়ে দলটি এখন পর্যন্ত নিম্নকক্ষের ১৭৬টি আসন পেয়েছে। অর্থাৎ তৃতীয় ধাপের নির্বাচন হওয়ার আগেই ৩৩০টি আসনের অর্ধেকেরও বেশিতে জয় নিশ্চিত করে ফেলেছে দলটি। আগামী ২৫ জানুয়ারি তৃতীয় ও সবশেষ দফার ভোট গ্রহণ করা হবে। আরও পড়ুন: মিয়ানমারে সংঘাত / গুলি-স্থলমাইন ও অনুপ্রবেশে সীমান্তে উদ্বেগ ২০২০ সালের নভেম্বরে নির্বাচনে শান্তিতে নোবেলজয়ী গণতন্ত্রপন্থি নেত্রী অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) কাছে ভরাডুবি হয় ইউএসডিপির। সামরিক বাহিনী ওই ভোটের ফল বয়কট করে। ভোটে কারচুপির অভিযোগ তুলে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে সেনাবাহিনী। সুচি ও তার এনএলডির নেতাদের গ্রেফতার করা হয়। এরপর দল হিসেবে এনএলডিকে বিলুপ্ত করা হয়। সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ তীব্র রূপ ধারণ করে। জান্তা সরকার ব্যাপকভাবে বিক্ষোভ দমন শুরু করলে সশস্ত্র সংগ্রাম দানা বাঁধে। শুরু হয় রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ। লড়াইয়ের মাধ্যমে সুচির ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট-এর নেতৃত্বাধীন পিপলস ডিফেন্স ফোর্সের (পিডিএফ) পাশাপাশি আরাকান আর্মিসহ একাধিক বিদ্রোহী সংগঠন মিয়ানমারের বেশ বড় একটি অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নেয়। হারানো এসব এলাকা পুনরুদ্ধারে তীব্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে জান্তা বাহিনী। দেশের একটি বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে না থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন আয়োজন করেছে সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং-এর সরকার। এই নির্বাচনকে ‘গণতন্ত্রের পথে’ ফিরে আসার উদ্যোগ হিসেবে দেখাতে চাইছে সামরিক জান্তা। আরও পড়ুন: মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের জীবন দুঃস্বপ্নে পরিণত করেছে: আন্তর্জাতিক আদালতে গাম্বিয়া পশ্চিমা কূটনীতিক ও মিয়ানমারের গণতন্ত্রকামীরা এই নির্বাচন বয়কট করেছেন। তারা এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছেন, এটি সামরিক শাসনেরই আরেক রূপ হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচন ‘নতুন বোতলে পুরনো মদ’ ছাড়া আর কিছুই নয়। যুক্তি হিসেবে তারা অং সান সু চির কারাদণ্ড, তার দল বিলুপ্ত করা, ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে সরকারের দমন-পীড়ন ও ভোটে সেনাবাহিনীর মিত্রদের আধিপত্যের কথা উল্লেখ করেন। বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকায় ভোট প্রতিহত করার অঙ্গীকার করে। জান্তা কর্তৃপক্ষ জানায়, দেশের সব অঞ্চলে নির্বাচনের আয়োজন করা সম্ভব নয়। ফলে বেশ কিছু এলাকা বাদ রেখেই নির্বাচন করা হচ্ছে।