কক্সবাজারের টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্তের নাফ নদীতে ৫-৬ দিন আগেও নৌকার ছলাৎছল শব্দের সঙ্গে মিশে ছিল মোহাম্মদ হানিফের (২৬) জীবন। নাফ নদীতে জাল ফেলতেন, মাছ ধরতেন আর ঘরে ফিরতেন পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে। অথচ সেই মানুষটিই এখন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছেন এক পা কম নিয়ে। তার কাঁধে এখন অসংখ্য প্রশ্ন আর অনিশ্চয়তার ভার।টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল এলাকার বাসিন্দা হানিফ এখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। গত সোমবার (১২ জানুয়ারি) সকালে নাফ নদীতে মাছ ধরার নৌকা ঠিক আছে কি না দেখতে গিয়েছিলেন তিনি। এ সময় পুঁতে রাখা মাইন বিস্ফোরণে মুহূর্তেই বদলে যায় তার জীবন। বিস্ফোরণে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তার বাঁ পায়ের গোড়ালি। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ঘটনায় শেষ হয়ে যায় একজন মানুষের স্বাভাবিক জীবনের নিশ্চয়তা। পরিবারের দাবি, হানিফ ছিলেন তাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। মাছ ধরাই ছিল তার পেশা, নদী ছিল কর্মক্ষেত্র। সেই নদীতেই তার ভবিষ্যৎ থমকে গেছে। এখন আর আগের মতো জাল কাঁধে নদীতে নামার প্রশ্নই ওঠে না। লম্বাবিলের পাহাড়ের ঢালে ছোট্ট টিনের ঘরটিতে এখন শুধুই নীরবতা। যে ছেলেটি প্রতিদিন উঁচু-নিচু পাহাড় বেয়ে ঘরে ফিরত, সে আজ কীভাবে বাড়ি ফিরবে, এই প্রশ্নেই থমকে আছে পুরো পরিবার। হানিফের মা জাহানারা বেগম (৫৫) বলেন, ‘নাফ নদীতে মাছ ধরে ছেলের আয়েই সংসার চলে। আমরা হতদরিদ্র। হানিফ মাছ শিকার করে আয় করতে পারলে সংসার চলে, না হলে খুবই কষ্টে পড়ে যাই। সীমান্তে যখন আরাকান আর্মি ও সন্ত্রাসীদের মধ্যে গোলাগুলি হয়, তখন সে নদীতে যেতে পারেনি। গোলাগুলি থেমে গেলে হানিফ মাছ ধরার নৌকা ঠিক আছে কি না দেখতে গিয়েছিল। হানিফ তো জানতো না মাটিতে মাইন পুঁতে রেখেছে। এখন মাইনের ওপর হানিফের পা পড়তেই বিস্ফোরণে পা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এখন এই সংসার কীভাবে চলবে? আমার ছেলের দায়িত্ব কে নেবে?’ আরও পড়ুন: নাফ নদীতে মাইন বিস্ফোরণে উড়ে গেল বাংলাদেশি যুবকের পা অসহায় কণ্ঠে বাবা ফজলুল করিম (৬০) বলেন, ‘ছেলেটাই ছিল আমাদের ভরসা। এখন সে নিজেই সাহায্যের মুখাপেক্ষী। হানিফ যদি বাড়ি ফেরেও, এই পাহাড় বেয়ে চলবে কীভাবে, সেটাই বুঝতে পারছি না।’ এদিকে হানিফের বাড়িতে বাবা-মাকে সান্ত্বনা দিতে ছুটে এসেছেন অনেক প্রতিবেশী। তারা এমন ঘটনায় ক্ষুব্ধ। প্রতিবেশী ইসলাম মাহমুদ (৩২) জানান, বাংলাদেশ সীমান্তের প্রায় এক থেকে দেড় কিলোমিটার ভেতরে গোলাগুলি ও বোমা হামলার ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষের একপর্যায়ে কেউ হয়তো বোমা ও মাইন পুঁতে রেখে চলে যায়, যা স্থানীয় গ্রামবাসীরা জানতেন না। তিনি বলেন, ‘ঘটনার দিন সকাল ১০টার দিকে নৌকা ও জাল দেখতে গিয়ে হানিফ একটি পুঁতে রাখা মাইনের ওপর পা দিলে বিস্ফোরণ ঘটে এবং তার পা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে পরিবারটি চরম বিপাকে পড়েছে। সীমান্ত এলাকায় চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে গেছে এবং জীবিকা ও চিকিৎসা দুটিই এখন বড় সংকট।’ তিনি একজন বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে প্রশাসনের কাছে হানিফের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের বিচার দাবি করেন। বর্তমানে হাসপাতালে হানিফের পাশে সারাক্ষণ রয়েছেন তার স্ত্রী সুফায়রা বেগম। সঙ্গে আছে নয় বছরের ছেলে ওবায়দুল হক।