পৌষের শেষ বিকেল। ময়মনসিংহ ফুলবাড়িয়ায় উপজেলার লক্ষ্মীপুর বড়ই আটা বন্দ মাঠে মানুষের ঢল। চারিদিকে সাজসাজ রব। উচ্চ স্বরে বাজানো হচ্ছে সাউন্ড বক্স। পিতলের তৈরি প্রায় এক মন ওজনের গোলাকার বলের দখল নিতে চলছে কাড়াকাড়ি। এই বলটির নাম হুম গুটি। গুটিটি যেদিকে যাচ্ছে, তার পেছন পেছন ছুটছে হাজারো মানুষ। আজব এ খেলায় নেই কোনো রেফারি, নেই নির্দিষ্ট কোনো দল কিংবা খেলোয়াড়। তবুও মানুষের ঢল দেখতেই যেন হাজির হয় শিশু থেকে বৃদ্ধ- নানা শ্রেণি পেশার মানুষ।বুধবার (১৪ জানুয়ারি) পৌষের শেষ বিকেলে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় জমিদার আমলের তালুক-পরগনা সীমানায় অনুষ্ঠিত হলো দুই শতাধিক বছরের ঐতিহ্যবাহী ২৬৭তম হুম গুটি খেলা।গুটি সংরক্ষণকারী মন্ডল পরিবারের আবুবকর সিদ্দিক দলবেঁধে গুটি নিয়ে মাঠে উপস্থিত হওয়ার পর শুরু হয় গুটি খেলা। গুটি না লুকানো পর্যন্ত চলে খেলাটি। গায়ের জোরে এ খেলা অনুষ্ঠিত হয় বলে অনেকেই এ খেলাকে হুমজিক্যালি বা হুমগুটি খেলা বলে থাকেন।এলাকাবাসী জানান, মুক্তাগাছার জমিদার রাজা শশীকান্তের সাথে ত্রিশালের বৈলরের হেম চন্দ্র রায় জমিদারের জমির পরিমাপ নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। জমিদার আমলের শুরু থেকেই তালুকের প্রতি কাঠা জমির পরিমাপ ছিল সাড়ে ৯ শতাংশে, পরগনার প্রতি কাঠা জমির পরিমাপ ছিল সাড়ে ৬ শতাংশে।একই জমিদারের ভূখণ্ডে দুই নীতির প্রতিবাদে তীব্র প্রতিবাদ গড়ে ওঠে। জমির পরিমাপ নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ মীমাংসার জন্য লক্ষ্মীপুর গ্রামের বড়ই আটা নামক স্থানে প্রথমবারের মতো আয়োজন করা হয় এই গুটি খেলার। শর্ত ছিল, গুটি যে দিকে যাবে তা হবে তালুক, পরাজিত অংশের নাম হবে পরগনা। জমিদার আমলের গুটি খেলায় মুক্তাগাছা জমিদারের প্রজারা বিজয়ী হন। তালুক পরগনার সীমান্তের জিরো পয়েন্টে ব্রিটিশ আমলে জমিদাররা খেলার গোড়াপত্তন। এখনো জমির পরিমাপ একইভাবে চলছে।আরও পড়ুন: কনকনে শীতে কটিয়াদীতে ঐতিহ্যবাহী ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা১৯৯৫ সাল থেকে গুটি খেলা পরিচালনা করে আসছে আবুবকর সিদ্দিক। তিনি জানান, তার চাচা ইয়াকুব আলী মন্ডল নিজে গুটি খেলা পরিচালনা করতেন। তার চাচার বয়স বেড়ে যাওয়ায় তিনি গুটিটি তার হাতে তুলে দেন। এ পর্যন্ত কোন ঝামেলা ছাড়াই গুটি খেলা চলছে। হাজার মানুষের সমাগম হলেও কোনো ঝগড়া বিবাধ হয়নি।স্থানীয় ও দর্শকরা জানান, গুটি খেলাকে ঘিরে উৎসবের আমেজ বিরাজ করে। জবাই হয় শতাধিক গরু। দূরদূরান্ত থেকে আত্মীয়রা আসে দলবেঁধে। শিশুরা পড়ে নতুন জামাকাপড়। এ যেন ঈদের আনন্দ!হুম গুটি খেলাকে ঘিরে বসে গ্রামীণ মেলাও। যেখানে শিশুদের খেলনা ও খাবারের দোকানগুলোতেও ছিল উপচে পড়া ভিড়।