ভেনেজুয়েলার ওপেকে থাকা নিয়ে যা বললেন ট্রাম্প

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ভেনেজুয়েলার জন্য ওপেকে থাকাই ভালো হবে। বুধবার (১৪ জানুয়ারি) বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।ভেনেজুয়েলা যাতে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ওপেক থেকে বেরিয়ে না যায় সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কি- এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার মনে হয়, ওদের জন্য ওপেকে থাকাই ভালো।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটা আমাদের জন্য ভালো কি না, আমি নিশ্চিত নই।’ ট্রাম্প আরও বলেন, ভেনেজুয়েলা ওপেকের সদস্য। তবে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি। ভেনেজুয়েলা ওপেকের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। দেশটির মাটির নিচে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলের মজুতগুলোর একটি রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট, অব্যবস্থাপনা আর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির তেল উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে গেছে। আরও পড়ুন: বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের ভিসা কেন স্থগিত করছে যুক্তরাষ্ট্র? কয়েক মাসের হুমকি-ধামকির অবশেষে গত শনিবার (৩ জানুয়ারি) গভীর রাতে ভেনিজুয়েলায় আক্রমণ করে মার্কিন বাহিনী। রাজধানী কারাকাস ছাড়াও কয়েক শহরে যুদ্ধবিমান থেকে বোমা বর্ষণ করে এবং মাদুরো ও তার স্ত্রীকে তুলে নিয়ে যায়। এর মধ্যে ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছেন, এখন থেকে ভেনিজুয়েলা চালাবে আমেরিকা। সেই সঙ্গে এর তেলভাণ্ডারের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব ঘোষণা করেন। এদিকে মাদুরোর অপহরণের পর ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ। তাকে সমর্থন দিয়ে ট্রাম্প বলেছেন, রদ্রিগেজ যতক্ষণ পর্যন্ত ওয়াশিংটনকে তার দেশের তেলের নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে দেশ শাসন করতে দেবেন। ভেনেজুয়েলাকে নিয়ে এখন নানা পরিকল্পনা সাজাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। গত সপ্তাহে (৭ জানুয়ারি) মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, ভেনেজুয়েলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি ধাপের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, এটা ভেনেজুয়েলায় স্থিতিশীলতা আনার মধ্যদিয়ে শুরু হবে, সেখানকার পরিস্থিতি পুনরুদ্ধার করা হবে এবং একটি পরিবর্তন ঘটানোর মধ্যদিয়ে শেষ হবে। এরপর হোয়াইট হাউসে তেল ব্যবসায়ীদের এক বৈঠকে ভেনেজুয়েলার জ্বালানি তেল খাতে কমপক্ষে ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের জন্য মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ট্রাম্প। বৈঠকে তিনি বলেন, মার্কিন কোম্পানিগুলোর সামনে এখন ভেনেজুয়েলার ‘জরাজীর্ণ’ জ্বালানি অবকাঠামো নতুন করে গড়ার সুযোগ এসেছে, যা দেশটিতে তেলের উৎপাদনকে ‘নজিরবিহীন উচ্চতায়’ নিয়ে যাবে। আরও পড়ুন: ভেনেজুয়েলার তেল খাতে ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ চান ট্রাম্প, যা বলছে কোম্পানিগুলো বর্তমানে ভেনেজুয়েলায় সচল থাকা একমাত্র মার্কিন বড় কোম্পানি শেভরন কিছুটা আগ্রহ দেখালেও কনোকোফিলিপসসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক ঝুঁকির কারণে বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দ্বিধাগ্রস্ত বলে জানা গেছে। তবে কিছু ছোট স্বতন্ত্র কোম্পানি এবং প্রাইভেট ইক্যুইটি সংস্থা ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়েছে এবং তারা মার্কিন লাইসেন্সের অধীনে ভেনেজুয়েলার তেল বাজারজাত করতে ইচ্ছুক। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবাধীন কোনো তেল নীতির আওতায় ভেনেজুয়েলাকে কি ওপেকের উৎপাদন সীমা মানতে হবে-এমন প্রশ্নে ট্রাম্প বলেন, বিষয়টি এখনও সময়ের আগেই তোলা হচ্ছে। তার ভাষায়, ‘এ নিয়ে এখন ভাবার দরকার নেই। কারণ ওপেকের সঙ্গে আমার সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।’ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র যদি বড় বিনিয়োগ করে, তাহলে ওপেকের অন্য সদস্যদের সঙ্গে দেশটির মতবিরোধ দেখা দিতে পারে। কারণ ওপেক সাধারণত তেলের দাম স্থিতিশীল রাখতে একসঙ্গে উৎপাদন কমানো বা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ওপেকের ভেতরে সিদ্ধান্ত হয় সমষ্টিগতভাবে। তবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল রফতানিকারক দেশ সৌদি আরবকে এই জোটের কার্যত নেতা বলা হয়। তাদের উৎপাদন ক্ষমতা বেশি এবং তারা দ্রুত তেল সরবরাহ বাড়ানো বা কমাতে পারে। আরও পড়ুন: গাজায় যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ শুরুর ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সময়ে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা এবং বাইরের উপদেষ্টারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলা ওপেকে থাকবে কি না তা এখনো আলোচনায় আসেনি। তবে ট্রাম্প যদি তেল উৎপাদন বাড়াতে চান আর ওপেক যদি দাম ধরে রাখতে উৎপাদন কমানোর পথে হাঁটে, তাহলে দুই পক্ষের লক্ষ্য এক জায়গায় নাও মিলতে পারে। এর আগেও ওপেকের কিছু সদস্য দেশ-যেমন ইরাক, নাইজেরিয়া ও অ্যাঙ্গোলা-কোটা ব্যবস্থার কারণে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। তাদের অভিযোগ, উৎপাদন সীমার কারণে তারা নিজেদের তেলের পুরো সুবিধা নিতে পারে না এবং দেশের অর্থনৈতিক চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। সব মিলিয়ে ভেনেজুয়েলা, ওপেক আর যুক্তরাষ্ট্র-এই তিন পক্ষের সম্পর্ক কোন পথে যাবে, তা এখনও অনিশ্চিত। তবে তেলের রাজনীতিতে নতুন টানাপোড়েন যে সামনে আসছে, তার ইঙ্গিত মিলছে এখনই।