৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের শোচনীয় পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতি ও প্রশাসনিক বাস্তবতায় একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—আর তা হলো \'মব\' সংস্কৃতির বিস্তার। আইন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা, প্রশাসনিক দুর্বলতা কিংবা শূন্যতা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় পেশি শক্তির সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির মানুষ হঠাৎ হঠাৎ সহিংস কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ছে। আরও ভয়ংকর বিষয় হলো, এসব কর্মকাণ্ডে বাধা দিতে গেলে অনেক সময় উল্টো পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সাধারণ নাগরিকগণকে। সমস্যা হল, এই \'মব\' কথাটাকে আবার অনেকে মেনে নিতে পারছেন না। বিশেষ করে একশ্রেণির সোশ্যাল এক্টিভিস্টগণ। তাদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছেন কিছু অতি উৎসাহী মানুষ। তাদের যুক্তি, এই মব না হলে আওয়ামী লীগের পতন হতো না। আবার অনেকে এও যুক্তি দেন- আওয়ামী লীগ আমলে যখন মব হয়েছে তখন আপনারা কোথায় ছিলেন? স্বৈরাচার এবং ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর আমরা সঠিক গণতান্ত্রিক, স্থিতিশীল ও শান্তিময় একটি দেশ গঠনের দিকে ধাবিত হচ্ছি। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আশাবাদী হবে এমনটিই আমরা আশা করছি। এ কথা মানতে হবে যে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটিয়ে কিংবা নিজেরাই আইন হাতে তুলে নিয়ে সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না। কেননা, মব সংস্কৃতির মূল বৈশিষ্ট্য হলো—ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে বিচার তুলে নেওয়া এবং তা হতে হবে তাৎক্ষণিক। অভিযোগ সত্য কি মিথ্যা, অপরাধ প্রমাণিত কি না, এসবের কোনো তোয়াক্কা না করেই মানুষ দলবদ্ধ হয়ে আক্রমণ চালাচ্ছে, লুটপাট করছে, বাড়িঘর ভাঙচুর করছে, আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে এবং সর্বোপরি মানুষকে হেনস্তা করছে। কোথাও কোথাও দেখা যাচ্ছে, একটি দল বা গ্রুপ মব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে, পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে আরেকটি দল এসে সেই মবকেই ‘রক্ষা’ করছে। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেমন দুর্বল হচ্ছে, তেমনি রাষ্ট্রের কর্তৃত্বও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। আমরা নিরাপত্তাহীনতার দিকে বেশি ধাবিত হচ্ছি। এটি কোনক্রমেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল্যবোধ নয়। এ ধরনের বাজে পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ স্পষ্ট। প্রথমত, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের দেড় বছর পার হয়ে গেলেও আইন শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত পুলিশ বাহিনী এখনো পূর্ণ রূপে ফিরতে পারছে না। মাঠপর্যায়ে অনেক কর্মকর্তা পরিস্থিতি সামলাতে গিয়ে দ্বিধায় পড়ছেন এই সন্দেহে যে—মব ঠেকাতে কঠোর হলে রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রতিক্রিয়া আসবে কি না। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি মানুষকে এই বার্তা দিয়েছে যে, আইন নিজের হাতে তুলে নিলেও শেষ পর্যন্ত পার পাওয়া যায়, তেমন কিছু হয় না। বরং হিরো হওয়া যায়! তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও উসকানিমূলক তথ্য মুহূর্তের মধ্যে মানুষকে উত্তেজিত করে তুলছে, যা মব তৈরি করতে সহায়ক হচ্ছে। ,মব সংস্কৃতির মূল বৈশিষ্ট্য হলো—ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে বিচার তুলে নেওয়া এবং তা হতে হবে তাৎক্ষণিক। অভিযোগ সত্য কি মিথ্যা, অপরাধ প্রমাণিত কি না, এসবের কোনো তোয়াক্কা না করেই মানুষ দলবদ্ধ হয়ে আক্রমণ চালাচ্ছে, লুটপাট করছে, বাড়িঘর ভাঙচুর করছে, আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে এবং সর্বোপরি মানুষকে হেনস্তা করছে। কোথাও কোথাও দেখা যাচ্ছে, একটি দল বা গ্রুপ মব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে, পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে আরেকটি দল এসে সেই মবকেই ‘রক্ষা’ করছে। কিন্তু এই মব সংস্কৃতি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করছে আমাদের সাধারণ মানুষকেই। আজ যাকে ‘অপরাধী’ আখ্যা দিয়ে মারধর করা হচ্ছে, যার অর্থ সম্পত্তি লুটপাট করা হচ্ছে, যার বাড়ি ঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে কাল সেই একই পদ্ধতির শিকার হতে পারে নির্দোষ যে কেউ। আইনের শাসন ভেঙে পড়লে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়বো। তাছাড়া, ইতিহাস বলে, মব কখনো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে না; বরং নতুন অন্যায়ের জন্ম দেয়, পেশী শক্তির সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই অবস্থায় মব সংস্কৃতি রুখতে রাষ্ট্রকে দ্রুত ও দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে স্পষ্ট নির্দেশনা দিতে হবে—আইন প্রয়োগে কোনো ধরনের দ্বিধা বা রাজনৈতিক চাপ গ্রহণযোগ্য নয়। মব সহিংসতায় জড়িত সবার পরিচয় বা অবস্থান জেনে আইনের আওতায় আনতে হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, গুজব রোধে তথ্যভিত্তিক ও দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। জনসচেতনতা ব্যাপক বাড়াতে হবে। মব কালচার রোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি সেটি হল, এই রাষ্ট্রের নাগরিকদেরকেই ব্যাপক সচেতন হতে হবে। সমাজে পাঁচ জন লোক যদি অন্যায় পথ বেছে নেয় তাহলে আরো দশ জনকে সে পথ থেকে তাদেরকে রুখতে এগিয়ে আসতে হবে, শান্তিপূর্ণ উপায়ে। সমাজের ১০ জন খারাপ মানুষ কিন্তু ৯০ জনকে আক্রান্ত করে, অশান্তিতে ফেলে। আমাদের মনে রাখতে হবে, বিচার ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে মবকে মেনে নেওয়া মানে নিজের নিরাপত্তাকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলা। এর বলি বা শিকার আমি/আমরাও একদিন হতে পারি। মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্র ও সভ্য সমাজের ভিত্তি হলো আইন ও ন্যায়বিচার—দলবদ্ধ উন্মত্ততা নয়। বহু রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের মধ্য দিয়ে আইন ও গণতন্ত্রের মূল্য দিতে শিখেছে বাংলাদেশ। এই মুহূর্তে মব সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দিলে সেই উজ্জল ও গর্বিত ইতিহাস-ই আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। আমরা হারাবো আমাদের সত্ত্বাকে। তাই মব নয়, এখনই সময় আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। না হলে এর মূল্য দিতে হবে আপনাকে, আমাকে তথা পুরো জাতিকে। লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট এইচআর/এমএস