বিয়ে এত সহজ নয়, কাঠ কেটে বর-কনেকে দিতে হয় পরীক্ষা

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিয়ের রীতি ও আনুষ্ঠানিকতায় রয়েছে বিস্ময়কর বৈচিত্র্য। কোথাও বিয়ের দিনে কনের হাতে মেহেদি, কোথাও আগুনের চারপাশে সাত পাকে ঘোরা, আবার কোথাও বর-কনের মাথায় মুকুট। তবে ইউরোপের দেশ জার্মানিতে এমন একটি বিয়ের রীতি আছে, যা শুনলে অনেকেই অবাক হন বিয়ের দিন বর ও কনেকে একসঙ্গে একটি বড় কাঠ করাত দিয়ে কাটতে হয়। এই প্রতীকী কাজটির মাধ্যমে দাম্পত্য জীবনে সহযোগিতা, ধৈর্য ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার বার্তা দেওয়া হয়। জার্মান ভাষায় এই রীতিকে বলা হয় ‘বাউমস্টাম্ম সাগেন’, যার অর্থ ‘গাছের গুঁড়ি কাটা’। বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর বা কখনো কখনো রেজিস্ট্রেশন সেরেই অতিথিদের সামনে বর ও কনের সামনে রাখা হয় একটি মোটা কাঠের গুঁড়ি ও বড় আকারের হাতে চালানো করাত। বর ও কনে দু’প্রান্তে দাঁড়িয়ে একসঙ্গে করাত চালিয়ে সেই কাঠ কাটেন। এই রীতির মূল দর্শন খুবই গভীর। এটি বোঝায় জীবনের পথ কখনো মসৃণ হবে না, সেখানে আসবে কঠিন বাধা। তবে স্বামী-স্ত্রী যদি একসঙ্গে কাজ করেন, তাল মিলিয়ে চলেন এবং একে অপরের শক্তিকে সম্মান করেন, তাহলে যে কোনো সমস্যাই জয় করা সম্ভব। অনেক সময় দেখা যায়, শুরুতে করাত চালাতে গিয়ে তারা একটু হিমশিম খান, অতিথিরা হাসেন, উৎসাহ দেন। শেষ পর্যন্ত কাঠ কাটতে পারাই হয়ে ওঠে দাম্পত্য জীবনের প্রথম জয়। জার্মান বিয়ের আয়োজন সাধারণত খুব বেশি জাঁকজমকপূর্ণ নয়, তবে প্রতিটি ধাপে থাকে অর্থ ও শৃঙ্খলা। বিয়ের ধরন অনুযায়ী আয়োজন দুই ভাগে বিভক্ত স্ট্যান্ডেসআম্ট অর্থাৎ সরকারি নিবন্ধন এবং চার্চ ওয়েডিং বা ধর্মীয় অনুষ্ঠান। আইনগতভাবে জার্মানিতে বিয়ে করতে হলে প্রথমে স্ট্যান্ডেসআম্টে গিয়ে সরকারি রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। এটি ছাড়া বিয়ে বৈধ নয়। অনেক দম্পতি শুধু এই নিবন্ধন করেই ছোট পরিসরে বিয়ে সম্পন্ন করেন। আবার কেউ কেউ পরে গির্জায় ধর্মীয় আচার পালন করেন। জার্মানির একটি বড় অংশ খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী হওয়ায় চার্চ ওয়েডিং এখনও জনপ্রিয়। চার্চে বিয়ের সময় যাজক বর-কনেকে ধর্মীয় শপথ পাঠ করান। বাইবেল পাঠ, প্রার্থনা এবং গানের মাধ্যমে অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। তবে আধুনিক জার্মান সমাজে ধর্মীয় অনুষঙ্গ অনেকটাই ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় হয়ে উঠেছে। জার্মান কনের পোশাক সাধারণত সাদা গাউন, যা পাশ্চাত্য বিয়ের ঐতিহ্য অনুসরণ করে। এই সাদা রং বিশুদ্ধতা ও নতুন জীবনের সূচক হিসেবে ধরা হয়। কনের মাথায় ভেল এবং হাতে ছোট ফুলের তোড়া দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে কনের গাউন হয় মিনিমাল ডিজাইনের অতিরিক্ত ঝলমলে নয়, বরং মার্জিত। বর সাধারণত পরেন ডার্ক স্যুট বা টাক্সেডো। কালো, নীল বা ধূসর রঙের স্যুট বেশি জনপ্রিয়। টাই বা বো-টাই, পালিশ করা জুতা এবং পরিমিত সাজ বরকে দেয় গাম্ভীর্যপূর্ণ চেহারা। তবে গ্রামাঞ্চল বা ঐতিহ্যবাহী উৎসবে অনেক সময় দেখা যায় ডির্নডল ও লেডারহোজেন। ডির্নডল হলো নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, আর লেডারহোজেন হলো চামড়ার তৈরি হাঁটু পর্যন্ত প্যান্ট, যা পুরুষরা পরে থাকেন। এসব পোশাক বিয়েকে দেয় এক বিশেষ লোকজ আবহ। জার্মান বিয়েতে শুধু করাত কাটাই নয়, আরও কিছু মজার রীতি রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো পলটেরাবেন্ড। বিয়ের আগের রাতে বন্ধু ও আত্মীয়রা বর-কনের বাড়ির সামনে জড়ো হয়ে পুরোনো থালা-বাসন, সিরামিক প্লেট ভাঙেন। বিশ্বাস করা হয়, এই ভাঙা শব্দ অশুভ শক্তিকে দূরে রাখে। তবে কাঁচ ভাঙা নিষেধ, কারণ কাঁচ ভাঙাকে দুর্ভাগ্যের প্রতীক মনে করা হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভাঙা থালা-বাসন পরিষ্কার করতে হয় বর ও কনেকেই একসঙ্গে। এটিও দাম্পত্য জীবনের সহযোগিতার প্রতীক। জার্মান বিয়েতে খাবারের আয়োজন হয় পরিমিত কিন্তু মানসম্মত। মেনুতে থাকতে পারে রোস্টেড মিট, সসেজ, আলু, সালাদ ও স্থানীয় খাবার। জার্মান বিয়েতে কেক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত বহু স্তরের কেক বানানো হয়, যা বর ও কনে একসঙ্গে কাটেন। কেক কাটার সময়ও অতিথিরা লক্ষ করেন বর ও কনে একে অপরকে কীভাবে সহযোগিতা করছেন। কে আগে ছুরি ধরলেন, কে সাহায্য করলেন এসব নিয়েও থাকে হালকা মজা ও প্রতীকী ব্যাখ্যা। জার্মান বিয়েতে অতিথির সংখ্যা সাধারণত সীমিত হয়। ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও পরিবারই বেশি আমন্ত্রিত হন। অনুষ্ঠান হয় সময়ানুবর্তিতার সঙ্গে। নির্ধারিত সময়ের আগেই অতিথিরা উপস্থিত থাকেন, যা জার্মান সংস্কৃতির শৃঙ্খলাবোধের পরিচয় দেয়। অতিথিরা বর-কনেকে উপহার হিসেবে দেন অর্থ, গৃহস্থালির সামগ্রী বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনীয় জিনিস। উপহার মোড়ানো ও কার্ড লেখাতেও দেখা যায় পরিমিতি ও রুচিশীলতা। সময় বদলের সঙ্গে সঙ্গে জার্মান বিয়ের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। এখন অনেক দম্পতি ডেস্টিনেশন ওয়েডিং করছেন, কেউ করছেন আউটডোর ওয়েডিং। তবু কাঠ কাটার মতো প্রতীকী রীতিগুলো আজও টিকে আছে, কারণ এগুলো শুধুই লোকাচার নয় এগুলো জীবনের গভীর দর্শন বহন করে। জার্মান বিয়ের কাঠ করাত দিয়ে কাটার রীতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় বিয়ে মানে শুধু সাজ, গান বা উৎসব নয়; বিয়ে মানে দায়িত্ব ভাগাভাগি করা। একসঙ্গে কঠিন কাজ করা, একে অপরকে বুঝে নেওয়া এবং জীবনের প্রতিটি চ্যালেঞ্জে পাশাপাশি থাকা।এই রীতির মাধ্যমে জার্মান সমাজ যেন নতুন দম্পতিকে বলে দেয় ভালোবাসা শুধু অনুভূতি নয়, এটি একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার। আর সেই অঙ্গীকারের প্রথম পরীক্ষা হয় একটি বড় কাঠের গুঁড়ি কেটে ফেলার মধ্য দিয়ে। আরও পড়ুনবাঙালি বিয়েতে গায়েহলুদ, এই রীতির ইতিহাস কী জানেন?যার সংগ্রহে যত তিমির দাঁত, বিয়ের পাত্র হিসেবে সে তত এগিয়ে সূত্র: কালিনা ওয়েডিং কেএসকে