ইসলামের ইতিহাসে মিরাজ একটি অতুলনীয় ও অলৌকিক ঘটনা, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তার প্রিয় নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বিশেষ সম্মান ও মর্যাদায় ভূষিত করেন। এই মহান সফরে রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়ার সীমা অতিক্রম করে আসমানসমূহের ঊর্ধ্বে গমন করেন এবং এমন সব নিদর্শন প্রত্যক্ষ করেন, যা সাধারণ মানববুদ্ধি ও কল্পনার ঊর্ধ্বে।মিরাজের এই সফরের সর্বোচ্চ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তরসমূহের মধ্যে রয়েছে সিদরাতুল মুনতাহা এবং শরিফুল আকলাম। সিদরাতুল মুনতাহা হলো সৃষ্টিজগতের জ্ঞান ও গমনাগমনের শেষ সীমানা, যেখানে পৌঁছে মানব ও ফেরেশতার সামর্থ্য সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। আর এর ঊর্ধ্বে অবস্থিত শরিফুল আকলাম হলো আল্লাহ তাআলার তাকদির ও চূড়ান্ত ফয়সালা লিপিবদ্ধ হওয়ার মহান কেন্দ্র। এই আলোচনায় কুরআনের আয়াত, সহিহ হাদিস এবং মুহাদ্দিস ও শারেহিনদের ব্যাখ্যার আলোকে সিদরাতুল মুনতাহা ও শরিফুল আকলামের পরিচয়, সেখানে রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিশেষ দর্শন, জান্নাত ও জাহান্নাম অবলোকন এবং তাকদির লেখার বিষয়টি ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করা হলো।সিদরাতুল মুনতাহার পরিচয়মিরাজের সফরে রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে সিদরাতুল মুনতাহায় নিয়ে যাওয়া হয়। এটি একটি বরই গাছ যা সপ্তম আকাশের ঊর্ধ্বে অবস্থিত। মুনতাহা শব্দের অর্থ চূড়ান্ত সীমা। শরহে হাদিসের আলোকে জানা যায়, পৃথিবী থেকে ঊর্ধ্বে উত্থিত সকল আমল সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত এসে থামে ঊর্ধ্বজগত থেকে অবতীর্ণ সকল খোদায়ী আদেশ ও তাকদির প্রথমে এখানেই অবতরণ করে এর পরবর্তী স্তর সাধারণ সৃষ্টির জন্য সম্পূর্ণ নিশিদ্ধ। এই কারণেই একে বলা হয় সিদরাতুল মুনতাহা,অর্থাৎ সৃষ্টির জ্ঞান ও গমনাগমনের শেষ সীমানা। শরহুজ জুরকানি আলাল মাওয়াহিব: ৬/১৮ আরও পড়ুন: নবীজির রমজানের ৫ প্রস্তুতি সিদরাতুল মুনতাহায় জিবরাঈল আ.-এর প্রকৃত রূপ দর্শনرَأَى جِبْرِيلَ لَمْ يَرَهُ فِي صُورَتِهِ إِلاَّ مَرَّتَيْنِ مَرَّةً عِنْدَ سِدْرَةِ الْمُنْتَهَى وَمَرَّةً فِي جِيَادٍ لَهُ سِتُّمِائَةِ جَنَاحٍ قَدْ سَدَّ الأُفُقَ রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজরত জিবরাঈল আ.-কে তার প্রকৃত আকৃতিতে মাত্র দু’বার দেখেছেন। একবার তিনি তাকে দেখেছেন সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে, আর আরেকবার তাকে দেখেছেন এমন এক রূপে,যার ছিল ছয়শত ডানা, যা দিগন্ত আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। (সুনান আত তিরমিজি:৩২৭৮) জান্নাতের অবস্থান: কুরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণা عِندَ سِدْرَةِ الْمُنْتَهَى عِندَهَا جَنَّةُ الْمَأْوَى সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে রয়েছে জান্নাতুল মাওয়া। (সুরা নাজম: ১৪-১৫) জান্নাত ও জাহান্নাম অবলোকন ثُمَّ أُدْخِلْتُ الجَنَّةَ، فإذا فيها جَنابِذُ اللُّؤْلُؤَ، وإذا تُرابُها المِسْكُ এরপর আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হলো। সেখানে দেখলাম, তার গম্বুজসমূহ মণি-মুক্তার এবং তার মাটি মেশক (কস্তুরী)। (সহিহ বুখারি:৩২০৭; সহিহ মুসলিম: ১৬৩)হজরত আবু সাইদ খুদরি রা. বলেন, صَلَّى رَسُولُ اللَّهِ ﷺ فِي الْبَيْتِ الْمَعْمُورِ، ثُمَّ أُتِيَ بِهِ إِلَى سِدْرَةِ الْمُنْتَهَى، ثُمَّ أُدْخِلَ الْجَنَّةَ، ثُمَّ عُرِضَتْ عَلَيْهِ النَّارُ রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বায়তুল মামুরে নামাজ আদায় করেন, এরপর সিদরাতুল মুনতাহায় পৌঁছান, তারপর জান্নাত ও জাহান্নাম প্রদর্শন করা হয়। (খসায়িসুল কুবরা, ইমাম সুয়ুতি:১/১৬৯) শরিফুল আকলাম: তাকদীর লেখার মহান স্থানثُمَّ رُفِعْتُ حَتَّى سَمِعْتُ صَرِيفَ الأَقْلَامِ এরপর আমাকে আরও ঊর্ধ্বে উঠানো হলো, এমনকি আমি কলমের লেখার শব্দ শুনতে পেলাম। (সহিহ মুসলিম:১৬৪) এই কলম লওহে মাহফুজে, তাকদির আল্লাহ তাআলার ফয়সালা,সৃষ্টিজগতের সকল বিধান লিপিবদ্ধ করছিল।বিশ্লেষণমূলক সিদ্ধান্ত ১. শরিফুল আকলাম সিদরাতুল মুনতাহার পরবর্তী স্তর ২. হাদীসে “ثُمَّ” (এরপর) শব্দ ধাপে ধাপে ঊর্ধ্বগমনের প্রমাণ ৩. সৃষ্টির জ্ঞান ও গমনাগমনের শেষ সীমা হলো সিদরাতুল মুনতাহা। ৪. এর ঊর্ধ্বে রয়েছে আল্লাহর তাকদির জারির কেন্দ্র ৫. নামাজ ফরজ হওয়ার ঘটনা এই স্তরের পরেই সংঘটিত। সিদরাতুল মুনতাহা হলো সৃষ্টিজগতের সর্বশেষ সীমা, আর শরিফুল আকলাম হলো আল্লাহ তাআলার তাকদির ও ফয়সালার মহান দফতর। মিরাজের এই স্তরসমূহ রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মর্যাদা ও আল্লাহর কুদরতের অতুলনীয় নিদর্শন। আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক অবগত।