বিশ্বনবি ও বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত, রাহমাতুল্লিল আলামিন, হজরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সান্নিধ্য লাভ করে পবিত্র মেরাজের মাধ্যমে। বিশ্বনবি ও শ্রেষ্ঠনবি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের মেরাজের যে ঘটনা তা নবুওয়তের পঞ্চম বা ৬ষ্ঠ বছরে ঘটেছিল। পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন ‘তিনি পরম পবিত্র ও মহিমায়, যিনি রাত্রিযোগে আপন বান্দাকে মসজিদুল হারাম (সম্মানিত মসজিদ) থেকে মসজিদুল আকসা (দূরবর্তী মসজিদ) পর্যন্ত নিয়ে গেলেন, যার চারদিকে আমি বরকত মণ্ডিত করেছি, যেন আমি তাকে আমার কিছু নিদর্শন দেখাই, নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ১) এ আয়াতে বিশ্বনবির (সা.) রাত্রিকালীন সফর সম্পর্কে ব্যক্ত হয়েছে, যা অধিকাংশ তফসিরকারকের মতে মেরাজ বলে পরিচিত। মহানবির যে মেরাজ সংঘটিত হয়, তাতে তিনি বহু ঊর্ধ্ব-লোকে উপনীত হয়ে আল্লাহ জ্যোতিসমূহের বিকাশ প্রত্যক্ষ করেন। অপরদিকে মহান আল্লাহর জ্যোতিমালাও তার প্রিয় রাসুলের (সা.) দিকে অবতরণ করে। এভাবেই একদিকে আল্লাহর রাসুল (সা.) আল্লাহর দিকে অগ্রসর হন, অপর দিকে আল্লাহও অগ্রসর হন তার প্রিয় রাসুলের (সা.) দিকে। মানুষের পক্ষে যতটা আধ্যাত্মিক-উন্নতি অর্জন করা সম্ভব, তার সবটাই ঘটেছিলো রাসুলের (সা.) মাঝে। মহান আল্লাহর শক্তি ও মহিমার জ্যোতি যতটা মানুষের পক্ষে দেখা সম্ভব, তার সবটাই দেখেছিলেন আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় এই রাসুল (সা.)। এই মহামানবকে (সা.) যত বেশী করে আঁকড়ে ধরা যাবে, যত বেশী গভীরে যাওয়া যাবে তার শিক্ষার, ততই বেশী করে মুক্তির স্বাদ পাওয়া যাবে, পাপ থেকে ততই বেশী মুক্তি পাওয়া যাবে। পবিত্র কুরআনের সুরা নযমে উল্লিখিত মেরাজের ঘটনার বর্ণনা সম্পর্কে যতই আমরা জ্ঞান অর্জন করব, ততই বুঝা সম্ভব হবে মেরাজের মাহাত্ম্য। নবুওয়তের একাদশ বা দ্বাদশ বছরে মহানবির (সা.) প্রিয়তম পত্নী হজরত খদিজার (রা.) ইন্তেকালের পর কাবাগৃহের নিকটবর্তী তার চাচাতো বোন উম্মে হানির বাসভবনে অবস্থানকালে একরাতে তিনি জেরুজালেমে অবস্থিত ‘আল আকসা মসজিদ’ গমন করেন। সেখানেই তিনি পূর্ববর্তী নবিগণের সাক্ষাৎ লাভ করেন। এটি ইসরা নামে পরিচিত। পূর্ববর্তী জমানায় আল্লাহর তরফ থেকে প্রেরিত নবিগণ আল আকসা মসজিদে শ্রেষ্ঠনবির (সা.) পেছনে নামাজ পড়েন। এরপর তিনি আবার মক্কায় ফিরে আসেন। সুরা বনি ইসরাইলে আল্লাহ এ ঘটনার বর্ণনা করেছেন। মেরাজ এবং ইসরা দুটি ভিন্ন সময়ের ঘটনা। দু’টিই ভিন্ন সময়ের ভিন্ন ঘটনা অথচ লোকেরা অজ্ঞতার বশে দুটি ঘটনাকে একত্রে বেঁধে দিয়ে প্রচার করছে। মেরাজের বর্ণনা সম্পর্কে মহানবি (সা.) নিজে বলেছেন, ‘একদা আমি কা’বার ‘হাতিম’ অংশে সটান হয়ে শুয়েছিলাম। ...হঠাৎ একজন আগন্তুক আমার কাছে এলেন। তিনি আমার (বুক) এ স্থান থেকে এ স্থান পর্যন্ত বিদীর্ণ করলেন।...এ ঘটনার বর্ণনা প্রসঙ্গে হজরত আনাস (রা.) বলেন, তিনি তার পাশে বসা (জনৈক সাহাবি) জারুদকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ স্থান থেকে এ স্থান পর্যন্ত’ এর অর্থ কি? তিনি (তার ব্যাখ্যা দিয়ে) বলেন, হলকুমের নীচ থেকে নাভি পর্যন্ত। অতঃপর তিনি (আগন্তুক) আমার হৃৎপিণ্ডটি বের করলেন। তারপর ইমানে পরিপূর্ণ একটি থালা আমার কাছে আনা হলো, অতঃপর আমার হৃৎপিণ্ডটাকে ধৌত করা হলো। তারপর তাকে ইমানে পরিপূর্ণ করে আবার পূর্বের জায়গায় রাখা হল। অতঃপর আকারে খচ্চরের চাইতে ছোট ও গাধার চাইতে বড়ো একটি শুভ্র জানোয়ার (বাহন) আমার সামনে হাজির করা হলো। তখন হজরত জারুদ (রা.) হজরত আনাস (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আবু হামযা! (আনাসের ডাক নাম) ওটাই কি বুরাক ছিল? হজরত আনাস (রা.) বললেন, হ্যাঁ, তার দৃষ্টি যতদূর যেত, সেখানে সে পা রাখতো। অর্থাৎ তার পথ অতিক্রমের গতিবেগ ছিল দৃষ্টি-শক্তির গতিবেগের সমান। মহানবি (সা.) বললেন, অতঃপর আমাকে তার ওপর আরোহণ করানো হলো। জিবরাইল বললেন, এটাই সিদরাতুল-মুনতাহা। আমি আরো দেখতে পেলাম চারটি নহর। দুটো নহর অপ্রকাশ্য আর দুটো প্রকাশ্য। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিবরাইল! এ নহরের তাৎপর্য কি? তিনি বললেন, অপ্রকাশ্য নহর দুটো হলো জান্নাতে প্রবাহিত দুটি ঝর্ণাধারা, আর প্রকাশ্য দু’টো হলো মিসরের নীল নদ ও বাগদাদের ফুরাত (ইউফ্রেটিস) নদী। তারপর আল বায়তুল মা’মুর ঘরটি আমার সামনে পেশ করা হলো। অতঃপর আমার সামনে হাজির করা হলো এক পাত্র মদ, এক পাত্র দুধ ও এক পাত্র মধু। এর মধ্য থেকে আমি দুধ গ্রহণ করলাম এবং তা পান করলাম। তখন জিবরাইল (আ.) বললেন, আপনি এবং আপনার উম্মত যে ইসলাম রুপি স্বভাবজাত ধর্মের অনুসারী, এটা তারই নিদর্শন। তারপর আমার ওপর দৈনিক পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হলো এবং আমি ফিরে চললাম। হজরত মুসা (আ.)-এর সম্মুখে দিয়ে যাবার সময় তিনি আমাকে বললেন, কী করতে আদেশ করা হয়েছে? আমি বললাম, দৈনিক পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজের আদেশ করা হয়েছে। তিনি বললেন, আপনার উম্মত দৈনিক পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ সম্পাদনে সক্ষম হবে না। আল্লাহর কসম, আপনার পূর্বে আমি (ইসরাঈল) লোকদেরকে পরীক্ষা করে দেখেছি এবং বনী ইসরাইলের হেদায়েতের জন্য যথাসাধ্য পরিশ্রম করেছি। অতএব, সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই আপনাকে বলছি, আপনি আপনার রবের কাছে ফিরে যান এবং আপনার উম্মতের পক্ষে নামাজ আরো হ্রাস করার জন্য আবেদন করুন। তখন আমি ফিরে গেলাম এবং ঐভাবে প্রার্থনা জানালে আল্লাহ আমার ওপর থেকে দশ ওয়াক্ত নামাজ কমিয়ে দিলেন। তারপর আমি মুসার নিকট ফিরে গেলাম। তিনি এবারও অনুরূপ কথা বললেন। ফলে, আমি পুনরায় আল্লাহর কাছে ফিরে গেলাম। তিনি আমার ওপর থেকে আরো দশ ওয়াক্ত নামাজ কমিয়ে দিলেন। আবার আমি মুসার কাছে ফিরে এলে তিনি অনুরূপ কথাই বললেন। তাই আমি আবার ফিরে গেলাম। তখন আল্লাহ আরো দশ ওয়াক্ত নামাজ মাফ করে দিলেন। তারপর আমি মুসার কাছে ফিরে এলে আবারও তিনি ঐ কথাই বললেন। আমি আবার ফিরে গেলে আল্লাহ আমার জন্যে আরো দশ ওয়াক্ত কম করে দিলেন এবং আমাকে প্রত্যহ দশ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের আদেশ করা হলো। আমি মুসার কাছে ফিরে এলাম। এবারও তিনি অনুরূপ কথাই বললেন। ফলে, আমি পুনরায় ফিরে গেলে আমাকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আদেশ করা হলো। আমি মুসার কাছে আবার ফিরে এলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনাকে সর্বশেষ কি করতে আদেশ করা হলো? আমি বললাম, আমাকে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আদেশ করা হয়েছে। আপনার উম্মত প্রত্যহ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সমাপনে সক্ষম হবে না। আপনার পূর্বে আমি (ইসরাইল) লোকদেরকে বিশেষভাবে পরীক্ষা করে দেখেছি এবং তাদের হেদায়েতের জন্যে যথাসাধ্য চেষ্টা ও কষ্ট স্বীকার করেছি। তাই আমি বলছি, আপনি আপনার রবের নিকট ফিরে যান এবং আপনার উম্মতের জন্যে নামাজ হ্রাস করার প্রার্থনা জানান। মহানবি (সা.) বললেন, আমি আমার রবের কাছে (কর্তব্য হ্রাসের জন্য) এত অধিক বার প্রার্থনা জানিয়েছি যে, (পুনরায় প্রার্থনা জানাতে) আমি লজ্জাবোধ করছি। বরঞ্চ আমি এতটুকুতেই সন্তুষ্ট ও আনুগত্য প্রকাশ করছি। মহানবি (সা.) বলেন, আমি যখন মুসাকে অতিক্রম করে সামনে অগ্রসর হলাম, তখন জনৈক আহ্বানকারী আমাকে আহ্বান জানিয়ে বললেন, আমার অবশ্য-পালনীয় আদেশটি আমি জারি করে দিলাম এবং আমার বান্দাদের জন্য আদেশটি লঘু করে দিলাম।” (সহিহ বুখারি, কিতাবুল মানকিব, ৩য় খণ্ড) সাধারণভাবে বলা হয়, মেরাজের ৩টি অংশ। প্রথম অংশ হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা গমন। দ্বিতীয় অংশ বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে আসমানে ভ্রমণ এবং তৃতীয় অংশ আসমান থেকে মসজিদে হারামে প্রত্যাবর্তন। হাদিসে আছে, হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর যখন মেরাজ হয়, তখন তিনি মসজিদে হারামের হাতিমে শুয়ে ছিলেন। অন্য হাদিসে আছে, তিনি তার চাচাতো বোন উম্মে হানির ঘরে শুয়ে ছিলেন। কিন্তু হাদিস ও কুরআন থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, মেরাজ ও ইসরা পৃথক পৃথক সময়ে হয়েছিল। মেরাজের ঘটনা সুরা নজমে আছে, যা নবুওয়তের ৫ম সালে হয়েছিল। আর ইসরার ঘটনা কুরআনের সুরা বনি ইসরাইলে আছে, যা হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর মাক্কি জীবনের শেষ-বর্ষে অর্থাৎ নবুওয়তের ১১/১২ সালে হয়েছিল। হাদিসে এর সমর্থন পাওয়া যায়। সুরা নজমে হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর বায়তুল মুকাদ্দাস যাওয়ার বর্ণনা নেই। আকাশে যাওয়ার কথা আছে। সুরা বনি ইসরাইলে আকাশে যাওয়ার কথা নেই। কিন্তু বায়তুল মাকাদ্দাসে যাওয়ার কথা আছে। হাদিস থেকে জানা যায়, মেরাজে নামাজ ফরজ হওয়ার কথা আছে। আবার হাদিসে আছে নবুয়তের শুরু থেকে নামাজ ফরজ হয়নি। মেরাজ রাসুলুল্লাহ (সা.) নবুয়ত প্রাপ্তির প্রথম দিকে হয়েছিল। ইসরা সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘটনা। এটি হযরতের মক্কি জীবনের শেষ বর্ষে ঘটেছে, যখন বিবি খাদিজা (রা.) ইন্তেকাল করেন এবং তিনি (সা.) উম্মে হানীর গৃহে অবস্থান করছিলেন। পবিত্র কুরআনের সুরা নজমে আছে যে, তার হৃদয় এই দৃশ্য দেখেছিলো। হাদিসে আছে, যখন তিনি এই দৃশ্য দেখেছিলেন, তখন তার (সা.) চোখ বোজা অবস্থায় ছিলো। হাদিসে আছে, তিনি (সা.) নবিদের জামাতে ইমামতি করেছিলেন। মহানবির (সা.) রূহকে স্বয়ং আল্লাহপাক পবিত্র করেছিলেন, যার ফলে আল্লাহতায়ালা এই মহান নবিকে মেরাজে নিয়ে গিয়েছিলেন। নবি করিম (সা.)-এর জীবনে মিরাজ শুধু একবারই যে ঘটেছে তা কিন্তু নয়, কারণ ছিনাচাকের যে ঘটনা, তা তার শৈশবেই ঘটেছিল, যখন তিনি (সা.) ছাগল চড়াচ্ছিলেন। তবে কুরআন করিমে তার (সা.) যে মেরাজের কথা উল্লেখ রয়েছে, তা একটি বিশেষ রাতে সংঘটিত হয়েছিল। এই রাতে মহানবির (সা.) কাছে জিবরাইল ও মিকাইল (আ.) যখন আসে, তখন তিনি (সা.) ঘুমন্ত ও জাগ্রত অবস্থার মাঝামাঝি ছিলেন। তখন জিবরাইল (আ.) তার (সা.) সীনা থেকে নাভির ওপর পর্যন্ত ফেড়ে এবং তার বুক ও পেট থেকে কিছু বের করে সেসবকে যমযমের পানি দিয়ে ধুয়ে তার পেটকে পাক পবিত্র করে দেন। তারপর তিনি সোনার একটি তশুরি আনেন, যা ইমান ও হিকমতে পরিপূর্ণ ছিল। এর মাধ্যমে তিনি তার সীনাটাকে ভরে দেন এবং ফাড়া অংশটা ঠিকঠাক করে দেন (বুখারি, মুসলিম ও মিশকাত)। এই বিশেষ রাতে আল্লাহপাকের ইচ্ছায় মহানবির (সা.) রূহকে পাকসাফ এবং সতেজ করা হয়েছিল। একজন মুমিন বান্দা যখন সকল পাপ থেকে মুক্ত হয়ে আত্মাকে পবিত্র করবে এবং তার আত্মা নাফসে মুতমাইন্নার স্তরে অর্থাৎ প্রশান্তিপ্রাপ্ত আত্মায় পরিণত হবে তখন সেও আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি অর্জনে ধন্য হবে। তার নামাজে সে লাভ করবে ভিন্ন এক প্রশান্তি। যেভাবে হাদিসে এসেছে নামাজ মুমিনের মেরাজস্বরূপ। এক মুমিনের সবকিছু যখন কেবল মাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে করবে তখন তার হৃদয় প্রশান্ত হয়ে তার প্রভুর সান্নিধ্য লাভ করবে। আল্লাহতায়ালা মুসলিম উম্মাহকে মেরাজের প্রকৃত শিক্ষার ওপর আমল করার এবং এর তাৎপর্য বুঝার তাওফিক দান করুন, আমিন। লেখক: প্রাবন্ধিক, ইসলামি চিন্তাবিদ।masumon83@yahoo.com এইচআর/এমএস