বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলামের এক মন্তব্য ঘিরে গত দুই দিন সরগরম ছিল দেশের ক্রিকেটপাড়া। নাজমুলের পদত্যাগ দাবি করে ক্রিকেটারদের সব ধরনের খেলা বয়কটের ঘোষণা, বিপিএল স্থগিত হওয়া, বোর্ড-কোয়াব সমঝোতায় পৌঁছানো; কম নাটকীয়তা হয়নি শেষ ৪৮ ঘণ্টায়।এর মধ্যে আবার প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছেন ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব) এর সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন। তিনি ও ক্রিকেটারদের সংগঠনের বিরুদ্ধে আবার অনেকে অভিযোগ তুলছেন— তারা সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালের ইন্ধনে চলেন। সব বিতর্ক, অভিযোগ ও হুমকি নিয়ে মিঠুন কথা বলেছেন ক্রিকবাজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে। পাঠকদের জন্য তার সাক্ষাৎকারের অংশ তুলে ধরা হলো: আপনাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সবকিছু হয়েছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে মিঠুন বলেন, ‘না, সবকিছু আমাদের চাওয়া অনুযায়ী হয়নি। কিন্তু ক্রিকেটের স্বার্থে এবং সব খেলোয়াড়ের কথা ভেবে, কিছু জায়গায় আমাদের ছাড় দিতে হয়েছে। শুরুতে আমরা খুব কঠোর ছিলাম, এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবু আমাদের সব সময় চাওয়া ছিল খেলা যেন হয়। যখন দেখলাম জেদ ধরে রাখলে খেলা একেবারেই হবে না, তখন কিছু বিষয়ে সমঝোতায় যেতে হয়েছে।’ কোয়াবকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা আছে কিনা প্রশ্নে মিঠুন, ‘হ্যাঁ, আমরা বিশ্বাস করতে চাই। না করলে সেটা খেলোয়াড়দের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হবে, কারণ বিপিএলের স্বার্থে তারা আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে আমরা শুধু বিপিএলের জন্য কথা বলিনি, পুরো ক্রিকেটের জন্য বলেছি। বিপিএল চলমান থাকায় দ্রুত সিদ্ধান্ত দরকার ছিল। তাই সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু পাওয়া সম্ভব হয়নি।’ নাজমুল ইসলামের বিষয়টি এখন কোন পর্যায়ে জানতে চাইলে মিঠুনের উত্তর ‘তারা (বিসিবি) বলেছে, নাজমুল ভাইয়ের সঙ্গে তারা যোগাযোগ করতে পারছে না। তিনি কারও ফোন ধরছেন না। তাকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। দুই দিনের মধ্যে জবাব না পেলে যে কমিটি গঠন করা হয়েছে, তারা প্রক্রিয়া চালু করবে এবং যত দ্রুত সম্ভব বাস্তবায়ন করবে।’ আরও পড়ুন: রংপুরের অধিনায়কত্ব থেকে সরে দাঁড়ালেন সোহান ঢাকা প্রথম বিভাগ ক্রিকেট, নারী খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা ও বিপিএল ড্রাফট–সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে বিসিবির বার্তা কী? মিঠুন বলেন, ‘ওগুলোতে তাদের কোনো আপত্তি নেই। আমার কথা ছিল এগুলো বিলম্ব করা যাবে না। তারা জানিয়েছে, প্রথম বিভাগের বিষয়টি ২৫ তারিখের জন্য নির্ধারিত। অন্য বিষয়গুলোও দ্রুত দৃশ্যমান হবে— মানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’ প্রাণনাশের হুমকির সত্যতা সম্পর্কে মিঠুন বলেন, ‘হ্যাঁ, সত্যি। জীবনে প্রথমবার এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছি। আমি কখনো বিতর্কিত কথা বলেছি বলে মনে পড়ে না। বিষয়টা আমার মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে— আমি কখন দেশের বিরুদ্ধে কথা বলেছি?’ হুমকিতে মানসিকভাবে তিনি বিপর্যস্ত কিনা জানতে চাইলে বলেন, ‘এটা কীভাবে নেব বা ব্যাখ্যা করব, জানি না। আমি দেশের বিরুদ্ধে কোনো শব্দ ব্যবহার করিনি। আমি শুধু ক্রিকেট ও খেলোয়াড়দের স্বার্থে কথা বলেছি। এখানে কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নেই। আমি যদি খেলোয়াড়দের অধিকার নিয়ে কথা না বলি, তাহলে এই পদে থাকার মানে কী? কেউ দেশের ঊর্ধ্বে নয়।’ বিসিবি বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হুমকি পাওয়ার বিষয়ে জানিয়েছেন কিনা জানতে চাইলে মিঠুনের উত্তর, ‘না, বোর্ডকে জানাইনি। অচেনা নম্বর থেকে আসা কল ধরছি না। তবে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ বা ভয়েস নোট বন্ধ করা যায় না। শুধু আমি নই, অন্য খেলোয়াড়দের কাছেও বিভিন্ন ধরনের হুমকি গেছে বলে শুনেছি। এখনো বোর্ডের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়নি। আমি এমন ধরনের বল আগে কখনো খেলিনি। বাউন্সার, হাফ ভলি, গুড লেংথ খেলেছি— কিন্তু এটা না। তাই কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাব, সেটাও বুঝতে পারছি না। কখনো থানায় যাইনি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাহায্য কীভাবে নেব, সেটাও জানি না।’ পেছন থেকে তামিম ইকবাল কোয়াবকে পরিচালনা করছেন এমন অভিযোগের ব্যাপারে মিঠুন বলেন, ‘এটা আমার জন্য খুবই বিব্রতকর। কোয়াব গঠনের সময় শুধু তামিম ভাই ছিলেন না। মিঠু ভাই থেকে শুরু করে সেলিম শাহেদ ভাই, রাহুল ভাই, শুভ ভাই— সিনিয়র-জুনিয়র সবাই ছিলেন। তামিম ভাই খেলোয়াড়দের স্বার্থে এসেছিলেন, ভোট দিয়েছেন। আমি সভাপতি হওয়ার পর শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, এই পর্যন্তই। এরপর কোয়াবের কোনো সিদ্ধান্তে তার ভূমিকা নেই। খেলোয়াড়দের স্বার্থে তিনি পরামর্শ দিতে পারেন, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার তার নেই। এটা ভুল ধারণা।’ আরও পড়ুন: বাংলাদেশে আসছে আইসিসির প্রতিনিধি দল! কোয়াব খেলতে রাজি হয়েছিল কিন্তু তামিমের কারণে সেটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এমন অভিযোগ, কতটা সত্যি?মিঠুনের উত্তর, “না, আমরা কখনো খেলব না, এমন সিদ্ধান্ত নেইনি। অনেক খেলোয়াড় এক জায়গায় থাকলে মতভেদ থাকাটাই স্বাভাবিক। ১০০ জনের মধ্যে যদি ৬০ জন ‘হ্যাঁ’ বলে, আমাকে সেটার সঙ্গেই থাকতে হবে। অনেক জুনিয়র খেলোয়াড় নিরাপত্তার ভয়ে কথা বলতে পারে না। শেষ পর্যন্ত আমাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ খেলোয়াড়দের সিদ্ধান্তের পক্ষেই দাঁড়াতে হয়।” আসন্ন বিশ্বকাপ নিয়ে কোয়াবের অবস্থান কী? কোয়াব সভাপতি বলেন, ‘আমরা খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা চাই। কেউ প্রাণনাশের হুমকির মধ্যে খেলুক— এটা আমরা চাই না। আবার বিশ্বকাপ তো বিশ্বকাপই। বোর্ড ও সরকার খেলোয়াড়দের কল্যাণ বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেবে— এটাই বিশ্বাস করি।’ আরও পড়ুন: ‘নাটকীয় একদিন’ শেষে মাঠে ফিরেছেন ক্রিকেটাররা, দর্শকদের উন্মাদনা চরমে বোর্ড আরও আগেভাগে ভূমিকা নিলে কি পরিস্থিতি এড়ানো যেত? জবাবে মিঠুন বলেন, ‘মিঠু ভাই সংবাদ সম্মেলনে ভুল স্বীকার করেছেন। কেউ ভুল মানলে সেটা নিয়ে পড়ে থাকতে চাই না। তবে ভবিষ্যতে বোর্ডকে আরও সক্রিয় হতে হবে। বোর্ডে যথেষ্ট জনবল আছে। সবাই যদি দায়িত্বশীলভাবে বিষয়গুলো নজরে রাখে, তাহলে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব।’