বায়তুল মুকাদ্দাস যেভাবে পুনরুদ্ধার করেছিলেন সালাহউদ্দিন আইয়ুবি রহ.

ইসলামের ইতিহাসে বায়তুল মাকদিস (জেরুজালেম) একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ স্থান। এটি মুসলমানদের প্রথম কিবলা, মসজিদুল আকসার অবস্থানভূমি এবং অসংখ্য নবী-রসুলের স্মৃতিবিজড়িত পবিত্র ভূমি।১০৯৯ খ্রিস্টাব্দে প্রথম ক্রুসেডের সময় ইউরোপীয় খ্রিস্টান ক্রুসেডাররা জেরুজালেম দখল করে নেয় এবং সেখানে ভয়াবহ গণহত্যা চালায়। প্রায় ৮৮ বছর ধরে বায়তুল মাকদিস ক্রুসেডারদের দখলে ছিল। (ইবনু আসির, আল-কামিল ফিত তারিখ:৯;) এই দীর্ঘ দখলদারিত্বের অবসান ঘটান মহান মুসলিম সেনানায়ক সুলতান সালাহউদ্দিন আইউবি রহ.। সালাহউদ্দিন আল-আইয়ুবির পরিচয়সালাহউদ্দিন আইয়ুবি (৫৩২-৫৮৯ হিজরি / ১১৩৭-১১৯৩ খ্রি.) ছিলেন কুর্দি বংশোদ্ভূত এক মহৎ মুসলিম শাসক ও বীর সেনানায়ক। তিনি আইয়ুবি শাসনামলের প্রতিষ্ঠাতা। তার জীবনের প্রধান লক্ষ্য ছিল মুসলিম ভূখণ্ড থেকে ক্রুসেডারদের বিতাড়ন এবং বায়তুল মাকদিস পুনরুদ্ধার। (ইবনু কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ১২) দক্ষ যোদ্ধাই নন; বরং তাকওয়া, ন্যায়বিচার, উদারতা ও মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত ছিলেন। আরও পড়ুন: মসজিদুল হারামে তারাবি পড়াবেন ৭ ইমাম মুসলিম ঐক্য গঠন ও প্রস্তুতি জেরুজালেম মুক্তির পূর্বে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি রহ. মিসর, সিরিয়া ও আশপাশের মুসলিম অঞ্চলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করেন। তিনি রাজনৈতিক বিভক্তি দূর করে ঈমান, জিহাদ ও শৃঙ্খলার ভিত্তিতে একটি শক্তিশালী মুসলিম বাহিনী গড়ে তোলেন, যা ক্রুসেডারদের মোকাবিলায় সক্ষম হয়। (ইবনু কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া:১২) হিত্তিনের ঐতিহাসিক যুদ্ধ ৫৮৩ হিজরি / ১১৮৭ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত হিত্তিনের যুদ্ধে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি আইয়ুবি ক্রুসেডারদের প্রধান সেনাবাহিনীকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেন। এই যুদ্ধে ক্রুসেডার নেতা গাই অব লুসিগনান বন্দী হন এবং ক্রুসেডারদের সামরিক শক্তি সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ে। (ইবনু আসির, আল-কামিল ফিত তারিখ:১০) রজব মাসে জেরুজালেম অবরোধ হিত্তিনের বিজয়ের পর সালাহউদ্দিন আইয়ুবি রহ.একে একে ক্রুসেডারদের দখলকৃত শহরগুলো পুনরুদ্ধার করেন। অবশেষে তিনি ৫৮৩ হিজরির রজব মাসে জেরুজালেম অবরোধ করেন। দীর্ঘ অবরোধের ফলে ক্রুসেডাররা আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। (ইমাদুদ্দিন আল-ইসফাহানি, আল-ফাতহুল কুসসি) জেরুজালেমের মুক্তি ২৭ রজব ৫৮৩ হিজরি (অক্টোবর ১১৮৭ খ্রি.) শবে মিরাজের দিনে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি রহ. বায়তুল মাকদিসে প্রবেশ করেন এবং প্রায় এক শতাব্দী পর শহরটি মুসলমানদের হাতে ফিরে আসে। এই দিনটি ইসলামি ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় বিজয়ের দিন হিসেবে স্মরণীয়। (ইবনু কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১২;) ৭. সালাহউদ্দিন আইয়ুবি-র মানবিকতা ও ক্ষমাশীলতা জেরুজালেম বিজয়ের পর সালাহউদ্দিন আইয়ুবি রহ. সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। তিনি খ্রিস্টান নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন এবং অনেক বন্দিকে মুক্তিপণ ছাড়াই মুক্ত করে দেন। তার এই মানবিক আচরণ ইসলামি শাসনের মহান আদর্শকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে। ইবনু শাদ্দাদ (সালাহউদ্দিন আইয়ুবি রহ .-র ঘনিষ্ঠ সঙ্গী ও প্রত্যক্ষদর্শী) ইবনু শাদ্দাদ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, সালাহউদ্দিন আইয়ুবি রহ. জেরুজালেম বিজয়ের পর সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন এবং বহু বন্দিকে বিনা মুক্তিপণে মুক্ত করে দেন। ইবনু শাদ্দাদ, (আন-নাওয়াদিরুস সুলতানিয়্যা ওয়াল মাহাসিনুল ইউসুফিয়্যা:৫৮-৬২) ইমাদুদ্দিন আল-ইসফাহানি তিনি লিখেছেন, সালাহউদ্দিন আইয়ুবি রহ. খ্রিস্টানদের সঙ্গে প্রতিশোধমূলক আচরণ করেননি; বরং দয়া ও ইনসাফের নীতি অনুসরণ করেছেন এবং নারী-শিশুদের পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়েছেন। (ইমাদুদ্দিন আল-ইসফাহানি, আল-ফাতহুল কুসসি ফিল ফাতহিল কুদসি:৭২-৭৫) ইবনু কাসির রহ.জেরুজালেম বিজয়ের বিবরণে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি রহ.-র ক্ষমাশীলতা ও মানবিক নীতির কথা উল্লেখ করেছেন। (ইবনু কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ১২/ ২৬৯-২৭২) শিক্ষণীয় বিষয়রজব মাসে জেরুজালেম মুক্তি প্রমাণ করে যে ঈমান, ঐক্য ও ন্যায়পরায়ণ নেতৃত্ব থাকলে মুসলমানরা অসম্ভবকেও সম্ভব করতে পারে। এই বিজয় আজও মুসলিম উম্মাহর জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।