জাপানের টোকিওতে হাজারো মানুষের যাতায়াতে ব্যস্ত থাকে ট্রেন স্টেশনগুলো। ট্রেন আসা–যাওয়া, তাড়াহুড়ো, অফিসের দেরি — এসব প্রতিদিনে ঘটনার মধ্যেই কিছু মানুষের জীবনে আসে নীরব, অদৃশ্য এক সংকট — হঠাৎ নেওয়া একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। ২০০০–এর দশকের শুরুতে জাপানের কিছু রেলস্টেশনে আত্মহত্যার ঘটনা বাড়তে থাকায় কর্তৃপক্ষ নতুনভাবে ভাবতে শুরু করে। বড় কোনো নিরাপত্তা প্রাচীর নয়, কড়া নজরদারিও নয় — বরং তারা বেছে নেয় এক অদ্ভুত সমাধান। প্ল্যাটফর্মে বসানো হলো নীল রঙের এলইডি লাইট। নীল আলো সাধারণত শান্তির প্রতীক। সমুদ্র, আকাশ, সন্ধ্যার নরম আলো — এসবের সঙ্গে আমাদের মস্তিষ্কের একটা অদ্ভুত সম্পর্ক আছে। গবেষকদের ধারণা ছিল, এই আলো মানুষের স্নায়ুকে খানিকটা শান্ত করতে পারে, অন্তত কয়েক সেকেন্ডের জন্য হলেও তীব্র আবেগের গতি কমাতে পারে। সেই কয়েক সেকেন্ডই হয়তো কাউকে থামিয়ে দিতে পারে। এর ফল বিশ্বব্যাপী অনেক মানুষকে অবাক করে দিয়েছে। কয়েকটি গবেষণায় দেখা যায়, যেসব স্টেশনে নীল এলইডি লাইট বসানো হয়েছিল, সেখানে আত্মহত্যার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, কিছু ক্ষেত্রে প্রায় ৭০ শতাংশেরও বেশি। অর্থাৎ, আলোটা হয়তো শুধু চোখে নয়, মনের ভেতরেও কিছু একটা বদলে দিচ্ছিল। বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিতভাবে বলেন না যে, নীল আলোই একমাত্র কারণ। তবে তারা এটুকু মানেন — হঠাৎ নেওয়া সিদ্ধান্ত অনেক সময় পরিবেশের ছোট পরিবর্তনেও থমকে যেতে পারে। আলো, রঙ, মুহূর্তের শান্তি—এসব মিলেই হয়তো কাউকে আরেকটা দিন বাঁচতে সাহায্য করেছে। রঙ কেন এত শক্তিশালী? মনোবিজ্ঞানে রঙকে বলা হয় ‘নন-ভার্বাল সিগন্যাল’, যা শব্দ ছাড়াই আমাদের মস্তিষ্কে বার্তা পাঠায়। নীল রঙ সাধারণত ঠান্ডা, স্থিরতা আর নিরাপত্তার অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত। তাই হাসপাতাল, থেরাপি রুম বা মেডিটেশন স্পেসে নীল বা হালকা সবুজ রঙ বেশি ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে, লাল বা উজ্জ্বল হলুদ রঙ উত্তেজনা বাড়ায়। রেস্টুরেন্টে এগুলো ক্ষুধা বাড়াতে সাহায্য করে, কিন্তু একই রঙ বেশি থাকলে অস্থিরতাও বাড়তে পারে। তাই জায়গা ভেদে রঙের প্রভাব একেবারে আলাদা। আলো শুধু দেখার জন্য নয়, অনুভবের জন্যও আলোর তীব্রতা এবং রঙের তাপমাত্রা (ওয়ার্ম না কুল) – এই দুই বিষয়ও খুব গুরুত্বপূর্ণ। খুব উজ্জ্বল সাদা আলোতে দীর্ঘ সময় থাকলে তা ক্লান্তি, মাথাব্যথা বা বিরক্তি তৈরি করতে পারে। আবার খুব কম আলো মনকে ঝিমিয়ে দিতে পারে, মন খারাপ বাড়াতে পারে। এই কারণেই শীতকালে দিনের আলো কমে গেলে অনেকের মধ্যে মন খারাপ, ক্লান্তি বা ডিপ্রেশনের লক্ষণ বাড়ে —যা কে বলা হয় সিজনাল অ্যাফেকটিভ ডিজঅর্ডার। এখানে আলোই বড় ফ্যাক্টর। শহর পরিকল্পনা থেকে ঘরের কোণ শুধু মেট্রো স্টেশন নয়, আধুনিক শহর পরিকল্পনাতেও এখন আলো ও রঙ নিয়ে নতুন করে ভাবা হচ্ছে। স্কুলে নরম আলো, অফিসে চোখে আরামদায়ক লাইট, হাসপাতালের করিডরে শান্ত রঙ — সবকিছুর পেছনেই আছে মনস্তাত্ত্বিক হিসাব। একই কথা ঘরের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। শোবার ঘরে খুব উজ্জ্বল সাদা আলো ঘুমের সমস্যা বাড়াতে পারে, আবার উষ্ণ হলুদ আলো মস্তিষ্ককে বিশ্রামে যেতে সাহায্য করে। আমাদের মন শুধু ভেতরের চিন্তা দিয়ে তৈরি হয় না, চারপাশের পরিবেশও তার বড় অংশ। আর আলো ও রঙ সেই পরিবেশের নীরব কিন্তু শক্তিশালী উপাদান। জাপানের নীল আলো হয়তো সব সমস্যার সমাধান নয়, কিন্তু এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় — কখনও কখনও পরিবেশে ছোট পরিবর্তনই বড় মানসিক প্রভাব ফেলতে পারে। সূত্র: ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব সাইকোলজি, জাপান; জার্নাল অব অ্যাফেকটিভ ডিসঅর্ডারস; ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক; ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নাল এএমপি/জেআইএম