মানুষের চিরন্তন প্রশ্ন, আমি কে? কোথা থেকে এলাম? আমার স্রষ্টা কে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কেউ আকাশের দিকে তাকায়, কেউ দর্শনের বই উল্টায়, আবার কেউ আত্মার গভীরে ডুব দেয়।কিন্তু আল-কোরআন আমাদের এক অনন্য দিকনির্দেশনা দেয়, স্রষ্টাকে খুঁজতে হলে সৃষ্টির দিকেই তাকাও। কারণ সৃষ্ট জীবের প্রতিটি স্তর, প্রতিটি শ্বাস, প্রতিটি নিয়ম ও শৃঙ্খলার ভেতরেই স্রষ্টার নিদর্শন ছড়িয়ে আছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি তাদেরকে শীঘ্রই আমার নিদর্শনাবলি দেখাবো দিগন্তসমূহে এবং তাদের নিজেদের মধ্যেও,যতক্ষণ না তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, এ কুরআনই সত্য। (সুরা ফুসসিলাত:৫৩) সৃষ্টিই স্রষ্টার অস্তিত্বের দলিল এই বিশ্বজগত শৃঙ্খলাবদ্ধ, উদ্দেশ্যপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ। এটি নিজেই সাক্ষ্য দেয় যে এর পেছনে আছেন এক মহান পরিকল্পনাকারী।আল্লাহ বলেন, إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَآيَاتٍ لِأُولِي الْأَلْبَابِ নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে এবং দিন ও রাতের পর্যায়ক্রমে আবর্তনে বোধশক্তিসম্পন্নদের জন্য রয়েছে নিদর্শন। (সুরা আল ইমরান:১৯০) যে চিন্তা করে, সে সৃষ্টির প্রতিটি নিয়মের পেছনে স্রষ্টার প্রজ্ঞা দেখতে পায়। মানুষের সৃষ্টিতে স্রষ্টার নিদর্শনমানুষ নিজেই আল্লাহর এক জীবন্ত নিদর্শন।আল্লাহ বলেন, وَفِي أَنفُسِكُمْ ۚ أَفَلَا تُبْصِرُونَ আর তোমাদের নিজেদের মধ্যেও (নিদর্শন রয়েছে), তবুও কি তোমরা দেখবে না? (সুরা জারিয়াত:২১) আরও বলেন, لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ فِي أَحْسَنِ تَقْوِيمٍ নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম আকৃতিতে। (সুরা তিন:৪) এক ফোঁটা পানির মধ্য থেকে বিবেকবান মানুষ,এ কি স্রষ্টা ছাড়া সম্ভব? প্রতিটি জীব আল্লাহর তাসবিহে রত এই বিশ্বে এমন কোনো সত্তা নেই যে আল্লাহর ইবাদত করছে না। আল্লাহ বলেন, تُسَبِّحُ لَهُ السَّمَاوَاتُ السَّبْعُ وَالْأَرْضُ وَمَن فِيهِنَّ ۚ وَإِن مِّن شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ وَلَٰكِن لَّا تَفْقَهُونَ تَسْبِيحَهُمْ সাত আকাশ, পৃথিবী এবং তাতে যা কিছু আছে সবই তার পবিত্রতা ঘোষণা করে। এমন কিছু নেই যা তাঁর প্রশংসাসহ তাসবিহ করে না; কিন্তু তোমরা তাদের তাসবিহ অনুধাবন করতে পারো না। (সুরা বনি ইসরাইল:৪৪) সৃষ্টির এই নীরব ইবাদতই স্রষ্টার অস্তিত্বের এক অনবরত ঘোষণা। রসুল সল্লাল্লাহু আলাই ওয়া সাল্লাম ও সৃষ্টির মাধ্যমে আল্লাহর পরিচয়। রসুল সল্লাল্লাহু আলাই ওয়া সাল্লাম মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকতেন সৃষ্টির বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে। তিনি বলেন, إِنَّ الدُّنْيَا حُلْوَةٌ خَضِرَةٌ، وَإِنَّ اللَّهَ مُسْتَخْلِفُكُمْ فِيهَا فَيَنْظُرُ كَيْفَ تَعْمَلُونَ নিশ্চয়ই এই দুনিয়া সুশোভিত ও সবুজ। আল্লাহ তোমাদেরকে এতে প্রতিনিধি বানিয়েছেন, অতঃপর দেখবেন তোমরা কীভাবে কাজ করো। (সহিহ মুসলিম: ২৭৪২) তিনি মানুষকে উট, আকাশ, পাহাড়,সবকিছুর দিকে তাকাতে বলতেন, যেন তারা স্রষ্টাকে চিনতে পারে। সৃষ্টির সৌন্দর্য ও আল্লাহর সৌন্দর্য সৃষ্টি শুধু কার্যকর নয়, অপূর্ব সুন্দর। আর এই সৌন্দর্য আল্লাহর এক গুণের প্রতিফলন। রসুল সল্লাল্লাহু আলাই ওয়া সাল্লাম বলেন, إِنَّ اللَّهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ নিশ্চয়ই আল্লাহ সুন্দর, এবং তিনি সৌন্দর্য ভালোবাসেন। (সহিহ মুসলিম: ৯১) প্রকৃতির সৌন্দর্য আমাদের হৃদয়কে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে দেয়। আরও পড়ুন: এবার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে আমির হামজাকে লিগ্যাল নোটিশ কেন মানুষ স্রষ্টাকে দেখতে পায় না? সমস্যা চোখে নয়, সমস্যাটি হৃদয়ে। আল্লাহ বলেন, فَإِنَّهَا لَا تَعْمَى الْأَبْصَارُ وَلَٰكِن تَعْمَى الْقُلُوبُ الَّتِي فِي الصُّدُورِ চোখ অন্ধ হয় না; বরং অন্ধ হয় সেই হৃদয় যা বুকে রয়েছে। (সুরা হজ:৪৬) গাফিলতি ও অহংকার মানুষের অন্তরকে অন্ধ করে দেয়। সৃষ্টির মাঝে স্রষ্টাকে খুঁজে পাওয়ার ফল যে ব্যক্তি সৃষ্ট জীবের মাঝেই স্রষ্টার সন্ধান পায়, ১.তার ঈমান মজবুত হয় ২.তার জীবন উদ্দেশ্যপূর্ণ হয় ৩.তার অন্তর প্রশান্ত হয়আল্লাহ বলেন, وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। (সুরা-তালাক:২) স্রষ্টাকে খুঁজতে দূরে যেতে হয় না তিনি আছেন, আমাদের শ্বাসে,আমাদের বিবেকে,প্রতিটি জীবের অস্তিত্বে সৃষ্ট জীবের মাঝেই স্রষ্টার সন্ধান,এটি কেবল সাহিত্য নয়, এটি কোরআনের বাস্তব আহ্বান। فَأَيْنَمَا تُوَلُّوا فَثَمَّ وَجْهُ اللَّهِ তোমরা যেদিকেই মুখ ফেরাও, সেদিকেই আল্লাহর সত্তা বিদ্যমান। (সুরা বাকারা:১১৫) আল্লাহ আমাদের এমন অন্তর দান করুন, যা সৃষ্টির আয়নায় স্রষ্টাকে চিনতে পারে। আমিন।