হাদিসশাস্ত্রে ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর অবদান

তাবেয়ি যুগে হাদিস সংরক্ষণ, শিক্ষা ও বিশ্লেষণে এক অনন্য নাম। সাহাবায়ে কিরামের পর হাদিসশাস্ত্রে যারা বিশেষ অবদান রেখেছেন, তারা হলেন তাবেয়িগণ। হিজরি প্রথম শতক থেকে দ্বিতীয় শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত দীর্ঘ এই সময়ে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল ও শহরে হাদিস প্রচার ও প্রসারে তাবেয়িদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।এই গৌরবোজ্জ্বল কাফেলার একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন ইমাম আবু হানিফা রহ.। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ৮০ হিজরিতে, যে সময় বহু সাহাবায়ে কিরাম জীবিত ছিলেন। ইমাম আবু হানিফা রহ. কতজন সাহাবিকে দেখেছেনইমাম আবু হানিফা রহ.কতজন সাহাবির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন, এ বিষয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ রয়েছে। ১.আল্লামা ইবনু হাজর মাক্কি রহ. বলেন, তিনি আটজন সাহাবির সাক্ষাৎ লাভ করেছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, (আল-মানাকিব:১ /২৪) ২.আবদুল্লাহ ইবন আবু আওফা রা., আনাস ইবনু মালিক রা., সাহল ইবন সাদ এবং আবু তুফাইল রা.। (আল-খাইরাতুল হাসান:২২;১/২৪)।৩. আল্লামা আলাউদ্দিন রহ.বলেন, ইমাম আবু হানিফা রহ. জীবনে প্রায় ২০ জন সাহাবিকে পেয়েছেন (হাশিয়াতু রদ্দুল মুহতার:১/৫৯)।৪.মুনিয়াতুল মুফতি গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, ইমাম আবু হানিফা রহ. সাতজন সাহাবির কাছ থেকে সরাসরি হাদিস শ্রবণ করেছেন (হাশিয়াতু রদ্দুল মুহতার:১/৫৯)।ইমাম জাহবি ও হাফেজ ইবনু হাজর আসকালানি রহ. দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, ইমাম আবু হানিফা রহ. একজন তাবেয়ি ছিলেন (সিয়ারু আলামিন নুবালা:৬/৩৯০–৩৯১; তাহজিবুত তাহজিব:১০/৪৫৯; লিসানুল মিজান:৬/৪০১)। ইবনু সাদ রহ. বলেন, তিনি আনাস ইবনু মালিক রা.-কে দেখেছেন, যিনি ৯১ হিজরিতে বসরায় ইন্তেকাল করেন। ইলমুল হাদিস শ্রবণ ও শিক্ষালাভ যখন ইমাম আবু হানিফা রহ. ইলমে হাদিস শিক্ষার দিকে মনোনিবেশ করেন, তখন সমগ্র মুসলিম জাহান হাদিসচর্চায় মুখরিত ছিল। প্রতিটি শহর ও জনপদে গড়ে উঠেছিল হাদিস শিক্ষার কেন্দ্র। অসংখ্য সাহাবি ও তাবেয়ি তখন হাদিস বর্ণনায় সক্রিয় ছিলেন। (সিয়ারু আলামিন নুবালা, ইমাম জাহবি:৬/৩৯০)  আরও পড়ুন: সৃষ্টিজীবের মাঝেই স্রষ্টার সন্ধান তিনি প্রথমে কুফার প্রখ্যাত তাবেয়ি মুহাদ্দিসদের কাছ থেকে হাদিস শিক্ষা গ্রহণ করেন। (তাজকিরাতুল হুফফাজ, ইমাম জাহবি:/১৬৮) ইমাম শাফেয়ি রহ. বলেন, ইমাম আবু হানিফা রহ. কুফার ৯৩ জন মুহাদ্দিসের কাছে হাদিস শিক্ষা লাভ করেছেন। (মানাকিবুল ইমামিল আজম, ইমাম মুওয়াফফাক ইবনু আহমদ আল-মাক্কি: ১/২৭)  ইমাম জাহবি রহ.-এর বর্ণনা অনুযায়ী, ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর হাদিসের শিক্ষক ছিলেন কমপক্ষে ২৯ জন, যাদের অধিকাংশই ছিলেন বড় তাবেয়ি। (সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৬/৩৯১) তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, ইমাম শাবি, সালমা ইবনু কুহাইল, মুহারিব ইবনু দিসার, আবু ইসহাক সাবিঈ, সামাক ইবনু হারব, আমর ইবনু মুররা, মনসুর ইবনু মুতামির, আমাশ প্রমুখ। (তাজকিরাতুল হুফফাজ:১/১৬৮; সিয়ারু আলামিন নুবালা:৬/৩৯০–৩৯৩)হাদিস শিক্ষার উদ্দেশ্যে সফরইলমে হাদিস অর্জনের তীব্র আকাঙ্ক্ষায় ইমাম আবু হানিফা রহ. বসরা, মক্কা ও মদিনা সফর করেন।(সিয়ারু আলামিন নুবালা, ইমাম জাহবি:খ. ৬/৩৯০–৩৯১) বসরায় তখন ইমাম হাসান বসরি, শুবা ও কাতাদার মতো প্রখ্যাত মুহাদ্দিসদের মাধ্যমে হাদিসচর্চা ব্যাপকভাবে বিস্তৃত ছিল।(তাজকিরাতুল হুফফাজ, ইমাম জাহবি:১/১৬৯; সিয়ারু আলামিন নুবালা:৬/৩৯১)  মক্কা ও মদিনায় তিনি আতাউ ইবনু আবু রিবাহ, ইকরিমা প্রমুখ বিখ্যাত তাবেয়িদের সংস্পর্শ লাভ করেন।(সিয়ারু আলামিন নুবালা:৬/৩৯১; মানাকিবুল ইমামিল আজম, মুওয়াফফাক ইবনু আহমদ আল-মাক্কি:১/২৮) ইমাম জাহবি রহ.তাজকিরাতুল হুফফাজ গ্রন্থে তার শিক্ষকদের নাম উল্লেখ করে লিখেছেন, অর্থাৎ, এ ছাড়াও অসংখ্য মুহাদ্দিস তার শিক্ষক ছিলেন। (তাজকিরাতুল হুফফাজ:১/১৬৮) হাদিসশাস্ত্রে বিশেষ অবদান ও মুহাদ্দিসদের মূল্যায়ন হাফেজ মুহাম্মদ ইউসুফ সালেহি শাফেয়ি রহ. বলেন, ইমাম আবু হানিফা রহ. ছিলেন হাফিজুল হাদিসের একজন।হাদিসে গভীর দখল না থাকলে তার পক্ষে ফিকহের সূক্ষ্ম মাসআলা নির্ণয় সম্ভব হতো না। (তাবাকাতুল হুফফাজ, হাফেজ মুহাম্মদ ইউসুফ সালেহি শাফেয়ি:২৪৮; আল-হাদিস ওয়াল মুহাদ্দিসুন:২৮৪)  মুহাদ্দিস ইয়াহিয়া ইবন মুঈন রহ. বলেন, তিনি ছিলেন নির্ভরযোগ্য, বিশ্বস্ত ও ভুলভ্রান্তিমুক্ত। হাদিসের ক্ষেত্রে তাকে দুর্বল বলা হয়েছে,এমন কথা আমি শুনিনি। (উমদাতুল কারি, আল্লামা বদরুদ্দিন আইনি:২১২) ইয়াজিদ ইবন হারুন রহ. বলেন, তিনি ছিলেন মুত্তাকি, সত্যবাদী ও সমসাময়িকদের মধ্যে হাদিসের বড় হাফেজ। (মানাকিবে আবি হানিফা, মুহাম্মদ ইবন জারিরি / মুহাম্মদ জামিরি:৭৬) হাফেজ আবু নঈম ইসফাহানি রহ. বলেন, আমি তাকে এমন এক ঘরে পেয়েছি, যা সম্পূর্ণভাবে হাদিসের কিতাবে পরিপূর্ণ ছিল। (উকুদুল জাওয়াহিরিল হানিফা:১/২৩) মাসআলা নির্ণয়ে ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর নীতি ইমাম আবু হানিফা রহ. কেবল কিয়াস ও যুক্তির ওপর নির্ভর করতেন,এ অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। (মানাকিবুল ইমামিল আজম, মুওয়াফফাক ইবন আহমদ আল-মাক্কি:১/২৯–৩০) তিনি নিজেই বলেছেন, প্রথমে আল্লাহর কিতাব (কুরআন) গ্রহণ করি। সেখানে না পেলে নির্ভরযোগ্য হাদিস গ্রহণ করি। তাতেও না পেলে সাহাবায়ে কিরামের বক্তব্য অনুসরণ করি। (আল-ইন্তিকা ফি ফাদাইলিল আইম্মাতিস সালাসা: ইবন আবদিল বার:১৪৫; মানাকিবুল ইমামিল আজম:১/৩০) হাদিস গ্রহণ ও বর্ণনায় তার কঠোর শর্ত জাল হাদিসের বিস্তার রোধে তিনি কঠোর নীতি অনুসরণ করতেন।(তাবাকাতুল হুফফাজ, হাফেজ জাহাবি:১/১৬৭; মানাকিবুল ইমামিল আজম, মুওয়াফফাক ইবনু আহমদ আল-মাক্কি:১/৩৩) ১. যে বর্ণনাকারী পরে হাদিস ভুলে গেছে,তার হাদিস গ্রহণ করতেন না। (উমদাতুল কারি, আল্লামা বদরুদ্দীন আইনি:২/১২) ২. মুখস্থ ও নিশ্চিত স্মৃতিভিত্তিক হাদিস ছাড়া গ্রহণ করতেন না। (উমদাতুল কারি:২/১২; আল-ইন্তিকা, ইবনু আবদিল বার:১৪৬) ৩. উস্তাদের কাছ থেকে সরাসরি না শোনা হাদিস বর্ণনা গ্রহণ করতেন না। (মানাকিবুল ইমামিল আজম:১/৩৪; সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৬/ ৩৯২) এই সতর্কতার কারণেই তিনি তুলনামূলকভাবে কম হাদিস বর্ণনা করেছেন। তার সংকলিত গ্রন্থের মধ্যে মুসনাদে আবি হানিফা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইমাম আবু হানিফা রহ. কেবল একজন ফকিহ নন, বরং তিনি ছিলেন একজন সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো মুহাদ্দিস ও তাবেয়ি। তার সম্পর্কে যারা বিরূপ ধারণা পোষণ করেন, তাদের উচিত নিরপেক্ষভাবে ইতিহাস ও মুহাদ্দিসদের বক্তব্য অধ্যয়ন করা। প্রকৃত জ্ঞান অনুসন্ধান করলে তার মর্যাদা ও অবদান আপনাতেই সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে।