মালদহে মোদির আক্রমণ, বহরমপুরে দাঁড়িয়ে অভিষেকের পাল্টা অভিযোগ

পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা ভোটের আগে নির্দিষ্ট ভোটারদের মন জয় করতে মাঠে নেমেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা নরেন্দ্র মোদি। একই সঙ্গে রাজ্য জুড়ে উন্নয়নের পাল্টা প্রচার ও রাজনৈতিক মোকাবিলায় শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতারাও বিরোধীদের বিরুদ্ধে তীর ছুড়ছেন।শনিবার (১৭ জানুয়ারি) এমনই ছবি দেখা গেল পশ্চিমবঙ্গের দুই জেলায়। প্রধানমন্ত্রী মালদহে রাজনৈতিক সভার মঞ্চ থেকে তৃণমূল কংগ্রেসকে ঝাঁঝালো ভাষায় আক্রমণ করেন। আবার মোদির সভাস্থল থেকে মাত্র ১০০ কিলোমিটারের মধ্যেই বহরমপুরে দাঁড়িয়ে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপির বিরুদ্ধে ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতির অভিযোগ তোলেন। মালদহের সাহাপুর মালদহ বাইপাস সংলগ্ন মাঠে বিজেপির আয়োজিত ‘পরিবর্তন সংকল্প জনসভা’ থেকে নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘যেখানে বিজেপির নামে মিথ্যা বলা হয়েছে, মিথ্যা প্রচার হয়েছে, সেখানেই বিজেপি জয়ী হয়েছে। আজ মানুষের যে উৎসাহ দেখছি, তাতে নিশ্চিত এবার বাংলার মানুষ বড় ব্যবধানে বিজেপিকে জিতিয়ে সরকার গড়বে।’ তার দাবি, এই মালদহ থেকেই বাংলার ‘আসল পরিবর্তন’ শুরু হবে এবং বিজেপি ক্ষমতায় এলে রাজ্যে সুশাসন কায়েম হবে, উন্নয়নের জোয়ার বইবে। মালদহের মঞ্চ থেকেই প্রধানমন্ত্রী মোদি তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও দুঃশাসনের অভিযোগ তোলেন। আরও পড়ুন: মালদার জনসভায় মোদি / অনুপ্রবেশ বড় চ্যালেঞ্জ, চাই বিজেপি সরকার কেন্দ্রীয় সরকারের একাধিক প্রকল্প রাজ্যে বাস্তবায়িত হতে দেয়া হয়নি বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, আয়ুষ্মান ভারত বা বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের মতো প্রকল্প চালু করতে দেয়নি রাজ্য সরকার। বরং কেন্দ্রের দেয়া অর্থ নয়ছয় হয়েছে এবং গরিবদের কেন্দ্রীয় সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। সাংবাদিকদের উপর হামলার প্রসঙ্গ তুলে মোদি বলেন, তৃণমূলের গুন্ডাগিরি আর বেশিদিন চলবে না। এবিপি আনন্দের এক সাংবাদিক ও এক চিত্রগ্রাহক আক্রান্ত হওয়ার ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে নারী ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে অনুপ্রবেশ ইস্যুতে মোদি বলেন, অনুপ্রবেশের ফলে জনসংখ্যার ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, ভাষাগত বিভাজন বাড়ছে এবং মালদহ–মুর্শিদাবাদের একাধিক এলাকায় হিংসা বেড়েছে। বিজেপি সরকার হলে অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও ঘোষণা করেন তিনি। মালদহ সফরেই প্রধানমন্ত্রী দেশের প্রথম হাওড়া–গুয়াহাটি বন্দে ভারত স্লিপার এক্সপ্রেস ট্রেনের উদ্বোধন করেন। পাশাপাশি প্রায় ৩,২৫০ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। আগামীকাল তিনি হুগলির সিঙ্গুরে টাটাকে দেয়া ঐতিহাসিক জমিতে আয়োজিত জনসভায় ভাষণ দেবেন। আরও পড়ুন: পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্র পশ্চিমবঙ্গের বেলডাঙা মোদির মালদহ সভার পাল্টা প্রতিক্রিয়া আসে বহরমপুর থেকে। সেখানে রোড শো ও সভা থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপির বিরুদ্ধে ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতির অভিযোগ তুলে বলেন, ‘যে মঞ্চ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে গাল দিচ্ছেন, সেই মঞ্চটা কে বানিয়েছে—হিন্দু না মুসলমান?’ অভিষেক আরও বলেন, ‘রাস্তায় জল কিনে খাওয়ার সময় কি দোকানদারের ধর্ম জিজ্ঞেস করি? বাড়িতে আগুন লাগলে যে দমকল বাহিনী আসে, আগুন নেভায়—তাদের ধর্ম জানতে চাই?’ তার বক্তব্যে স্পষ্ট, ধর্মের রাজনীতি দিয়ে বাংলায় কখনও জয় পাওয়া যায়নি, ভবিষ্যতেও যাবে না। বেলডাঙার সাম্প্রতিক অশান্তি নিয়েও দুই শিবিরের অবস্থান মুখোমুখি। মালদহে দাঁড়িয়ে মোদি যেখানে সরাসরি তৃণমূলের গুন্ডাদের দায়ী করেন, বহরমপুরে দাঁড়িয়ে অভিষেক বিজেপিকেই উসকানির জন্য দায়ী করেন। তবে তিনি সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, কোনও প্ররোচনায় পা না দিয়ে শান্ত থাকতে হবে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া চলবে না। আগামী এপ্রিল–মে মাসে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার কথা। তার আগেই মালদহ ও বহরমপুর—দুটি মঞ্চ থেকে উঠে আসা দুই বিপরীত রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট করে দিচ্ছে, ছাব্বিশের ভোটের আগে রাজ্যের রাজনৈতিক লড়াই আরও তীব্র ও সংঘাতমুখর হতে চলেছে।