আশায় আশায় আমি তবু চেয়ে থাকি

কিছু দিন আগেও বাংলাদেশের উন্নয়নকে বলা হতো উন্নয়ন ধাঁধা বা ডেভেলপমেন্ট প্যারাডক্স। বিগত দশকগুলোতে চোখ ধাঁধানো উন্নয়ন না হয়ে থাকলেও যতটুকু অর্জিত হয়েছে তা চোখে ধাঁধা লাগাবার মতোই বলা যেতে পারে। কার কাছে? নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে যারা, জেনে বা না জেনে, বাংলাদেশের সম্ভাবনা নিয়ে শঙ্কিত ছিল; তারা ভাবতেও পারেনি যে, কোনো এক সময় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন পৃথিবীতে ‘খবর’ হয়ে উঠবে, সাড়া জাগাবে। কোনো দ্বিধাগ্রস্ত না হয়েই এক সময় বাংলাদেশের বিখ্যাত অর্থনীতিবিদগণ, কেউ বর্তমান উপদেষ্টা পরিষদে আছেন, বাংলাদেশের রোল মডেল হয়ে বিখ্যাত হবার বয়ান দিতেন। দুই.বাংলাদেশের উন্নয়নকে তুলনামূলক হিসাবে ন্যস্ত করা যায় প্রতিবেশীদের সাথে। বিশেষ করে জানতে ইচ্ছা হয়, ‘সেই পাকিস্তানের ‘ তুলনায় বাংলাদেশ ভালো না খারাপ আছে? এমনকি প্রতিবেশী বিশাল দেশ ভারতের চেয়ে? পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যাপারগুলু পরিষ্কার করা যাক। ধরুন, নব্বই দশকের শুরুতে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিএনআই পাকিস্তানের মাথাপিছু জি এনআইয়ের ৫৫ ভাগ ছিল অথচ ২০১০ দশকের শেষের দিকে পাকিস্তানের চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি বাংলাদেশের মাথাপিছু জিএনআই। অন্যদিকে, নব্বই দশকের শুরুতে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিএনআই ছিল ভারতের ৮৭ শতাংশ, পার্থক্যটা বৃদ্ধি পেয়ে ২০০০ দশকে দাঁড়ায় ৭৪ শতাংশ কিন্তু ২০১০ শেষ দিকে হ্রাস পেয়ে ৮২ শতাংশ- ‘ক্যাচিং আপ’ ইন্ডিয়া সিন্ড্রোম! তিন.সব আশাব্যঞ্জক গল্পের একটা অন্ধকার দিক থাকে। আশা এবং নিরাশার দোলাচলে আমরা প্রতিনিয়ত দোল খাই। বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রা তেমনি এক আলোআঁধারির খেলা হিসাবে বোধ করি ভুল হবে না। একদিকে উন্নয়নের ফলে দারিদ্র্য হ্রাস পেয়েছে অথচ, অন্যদিকে, ধনী –গরীব বৈষম্য ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থনীতিবিদ হারসম্যান ও রথচাইল্ড বলেছেন টানেল প্রভাবের কথাঃ বিদ্যমান কাঠামোতে আয়- বৈষম্যের প্রতি যদি সহনশীলতা কম থাকে, তা হলে ‘আগে বাড়া, পরে বিতরণ’ এমন তত্ত্ব বিপজ্জনক হতে পারে। বাংলাদেশের বিদ্যমান বৈষম্য –সহগ (গিনি সহগ) বিপদ সীমার কাছাকাছি। বৈষম্য বেশি হলে দারিদ্র্য নিরসনে প্রবৃদ্ধির প্রভাব খাটো থাকে অর্থাৎ একই প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে কম বৈষম্যের সমাজে দারিদ্র্য হ্রাসের হার বেশী হবে বেশি বৈষম্যের সমাজের চেয়ে। অন্যদিকে, আশা ছিল কুজনেটস –এর চুইয়ে পড়া প্রভাব তত্ত্ব (বা ট্রিকল ডাউন ইফেক্ট থিওরি) কাজ দেবে কিন্তু সে আশায় যেন গুড়ে বালি। ট্রিকল ডাউন ইফেক্ট বলতে চায়, প্রবৃদ্ধির প্রারম্ভিক স্তরে বৈষম্য বৃদ্ধি পায়, কিন্তু পরবর্তীতে চুইয়ে পড়া সুফলে বৈষম্য হ্রাস পায়। সেটা খুব একটা কাজ করছে বলে মনে হয় না কিংবা ভবিষ্যতে করবে এমন ইঙ্গিত আপাতত নেই বলে মনে হয়। আর যদি ঘটেও থাকে তা যে খুবই দুর্বল সে কথা বলা বাহুল্য। এদিকে আবার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটছে ঠিকই কিন্তু তা কাম্য স্তরে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারছে না; ব্যক্তি বিনিয়োগ ঠায় দাঁড়িয়ে আছে এক জায়গায়। গেল চার দশকের বেশি সময় ধরে ‘অবিশ্বাস্য’ তথা অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধাঁধার আড়াল –আবডালে অভাবনীয় উত্থান ঘটেছে কালো এক অর্থনীতির (আন্ডার গ্রাউনড ইকোনমি)। মূলত প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে ‘অর্থনৈতিক শয়তানের’ অভাবনীয় আবির্ভাব ঘটেছে। অন্ধকারে থাকা এই অর্থনীতি সরকারকে রাজস্ব থেকে বঞ্চিত রাখছে, রাজনীতিকে কলুষিত করছে, বিকৃত ভোগবাদী সমাজ সৃষ্টিতে জ্বালানি জোগাচ্ছে, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটাচ্ছে। লেখাপড়ার উদ্দেশ্য এখন দু হাতে টাকা কামাই করা। মোটা দাগে, এটা একটা টেকসই উন্নয়নের পথে প্রধান প্রতিবন্ধক হিসাবে কাজ করছে। ক্ষেত্র বিশেষে এর ভেতরে অথবা পাশাপাশি অবস্থান নিয়েছে সর্বব্যাপী চরম দুর্নীতি। যদিও এ দেশে দুর্নীতির ইতিহাস বেশ দীর্ঘ, তারপরও বিগত দশকগুলোতে, রাষ্ট্রীয় আনুকল্যে পুঁজিবাদ প্রসারণে, উত্থান ঘটেছে এক শ্রেণির দাপুটে, ক্ষমতাবান দুর্নীতিবাজদের। বলা যায়, সমাজের অভিভাবক এখন তারাই। দুর্নীতি প্রতিবছর জিডিপির ২ শতাংশের মতো গিলে খায়। তা ছাড়া, প্রতিবছর দেশ থেকে নাকি অবৈধ পথে পাচার হতো গড়ে ৭০০-৮০০ কোটি ডলার; ২০০৬ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত নাকি ৬০০০ কোটি ডলার পাচার হয়েছে বলা হচ্ছে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও গেল এক বছরে দুর্নীতির মচ্ছবের সংবাদ পত্রিকার পাতায় কিংবা মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচারিত। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নে এই কালো অর্থের প্রভাব অনেক। ভাতের হাঁড়ির কটা ভাত টিপলেই যেমন বোঝা যায় ভাত সেদ্ধ হয়েছে কিনা, তেমনি চলমান অভিযানের ক্ষুদ্র নমুনা থেকে অনুমান করা যায়, দেশব্যাপী অবৈধ সম্পদের পরিমাণ কত হতে পারে। শুধু বিদেশে নয় দেশের ভেতরেও আরও অনেক কর্মকাণ্ডে অবৈধ ও অনৈতিক লেনদেন হয় যা উইপোকার মতো উন্নয়নকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। আর একটা কথা, বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটছে ঠিকই কিন্তু তাকে টেকসই করবার লক্ষ্যে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্কার তেমন হচ্ছেনা বিধায় চায়ের কাপ আর ঠোঁটের মধ্যকার ব্যবধান থেকেই যাচ্ছে। সারা অঙ্গে ব্যথা, ঔষধ দেব কোথায়। এখন এমন কি রক্ষণশীল হিসাবেও ঋণ খেলাপির পরিমাণ তিন থেকে চার লক্ষ কোটি টাকা। এদের একটা অংশ বিদ্যমান আইনের ফাঁকফোকরে ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপি। শেয়ার বাজার লুট করে উত্থান ঘটেছে এক শ্রেণির ধনী মানুষের অথচ সেই কলঙ্কিত বাজার এখনও তাই আছে। দিনে-দুপুরে ব্যাংক ডাকাতির কথা আপাতত না হয় থাক। তবে বলতেই হবে যে, ঋণ খেলাপি, অর্থ পাচারকারী কিংবা ব্যাংক ডাকাতদের বেশিরভাগ, দেশে অথবা বিদেশে, দাপটে ও সুখে আছেন। অবৈধ অর্থ আর সম্পদের জোরে তারা কিনে নিয়েছে রাজনৈতিক নেতা এমনকি মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবীদের- এখনও অব্যাহত সেই পুরোনো সুর, পুরোনো গান। অথচ নিয়তির নির্মম পরিহাস এই যে, তাদের কেউ এই দশ-বিশ বছর আগেও হিমশিম খেত সংসার চালাতে; কেউ ছিল পিয়ন, কেউ দিনমজুর। অনুক্রমিক সরকারগুলোর রাজনৈতিক পৃষ্টপোষকতায় এমনকি তথাকথিত নিরপেক্ষ সরকারের, এরা হয়ে উঠেছে দানব; সমাজটাকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়ে তারা আজ আলোকিত, আলোচিত এমনকি মাঠে ময়দানে অভিভাবক হিসাবে অভিভূত করে অভিভাষণে। অর্থনীতির গ্রেসামস ল’ অনুযায়ী, মন্দ টাকা ভালো টাকাকে বাজারছাড়া করে, তেমনি আজ এই সমাজে মন্দ লোক ভালো লোককে কোণঠাসা করে রাখছে। রাজনীতি কলুষিত হয়েছে কালোটাকায়; এদের অস্ত্রের ভাষা কেড়ে নিয়েছে আমজনতার ভাষার অস্ত্র। মানুষ বুঝে গেছে অর্থই সকল সুখের মূল - মূল্যবোধ আঁকড়ে থাকা দুর্বলের ধর্ম। উন্নয়নের রোল মডেলের গায়ে এসব কলঙ্কের দাগ মানায়? চার.দুর্নীতির কালো থাবায় সমাজটা যখন ক্ষত–বিক্ষত, দেয়ালে যখন পিঠ ঠেকে গেছে বলতে হয়, ঠিক তখন অন্তর্বর্তী সরকারের সরাসরি নির্দেশে চলছে অর্থপাচারের বিরুদ্ধে অভিযানের মতো একটা মহতী পদক্ষেপ। অভিনন্দন– ব্যাটার লেট দেন নেভার। উক্ত অভিযানের ফলে কালো অর্থনীতির নায়কদের অভাবনীয় উত্থানের সম্যক নমুনা জাতির সামনে আজ উপস্থিত। পত্রিকার পাতা ওলটালে অবৈধ উপায়ে অর্জিত ধন-সম্পদ সম্পর্কে কিঞ্চিৎ ধারণা পাওয়া যায়। কারো কাছে শত শত কোটি টাকার এফডিআর, কোটি কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালেন্স, দশ –বারোটি ফ্ল্যাট, পাচার করা অর্থ দিয়ে বিদেশে আলিশান বাড়ি–গাড়ি, মোটা অঙ্কের ব্যাংক ব্যালেন্স ইত্যাদি। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নে এই কালো অর্থের প্রভাব অনেক। ভাতের হাঁড়ির কটা ভাত টিপলেই যেমন বোঝা যায় ভাত সেদ্ধ হয়েছে কিনা, তেমনি চলমান অভিযানের ক্ষুদ্র নমুনা থেকে অনুমান করা যায়, দেশব্যাপী অবৈধ সম্পদের পরিমাণ কত হতে পারে। শুধু বিদেশে নয় দেশের ভেতরেও আরও অনেক কর্মকাণ্ডে অবৈধ ও অনৈতিক লেনদেন হয় যা উইপোকার মতো উন্নয়নকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। আর একটা কথা, বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটছে ঠিকই কিন্তু তাকে টেকসই করবার লক্ষ্যে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্কার তেমন হচ্ছেনা বিধায় চায়ের কাপ আর ঠোঁটের মধ্যকার ব্যবধান থেকেই যাচ্ছে। পাঁচ.চলমান অভিযানের জন্য দেশের মানুষ কিছুটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে বটে, তবে এই অভিযানের ফলে সংশয়মুক্ত হতে পারছে না কেউই। এর কারণ অতীতের অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নয়। দুর্নীতির ও কালো অর্থনীতির শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিস্তৃত বিশেষত বর্তমান ও অতীতের ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী, এমপি, এবং সামরিক ও বেসামরিক আমলারাও এ ক্ষেত্রে কম যায়নি বলে অভিযোগ আছে। প্রধান উপদেষ্টার সকল আন্তরিকতা সত্ত্বেও এত বড় একটা ‘সাদা বিপ্লব’ ঘটবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকতেই পারে যদি তার নিজের লোকেরা দুর্নীতিমুক্ত না হয়। তবে এ কথাও ঠিক যে একটা নিরপেক্ষ সরকার ব্যতীত অন্য কারও পক্ষে ঝুঁকিপূর্ণ অথচ এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য দরকার ‘সাদা বিপ্লব’ ঘটানো সম্ভব নয়। আমরা, আম-জনতা, কায়মনোবাক্যে দুর্নীতি ও কালো অর্থনীতির বিরুদ্ধে পরিচালিত এই অভিযানের সাফল্য কামনা করি। তার প্রধান কারণ আমরা একটা ‘সাদা সমাজ’ চাই যেখানে মেধাবী আর ভালো মানুষেরা রাষ্ট্র পরিচালনা করবে; অর্থ, সম্পদ ও প্রতিপত্তি যেখানে প্রভু না হয়ে চাকর থাকবে। আমরা বর্তমান অবস্থার তথা অমানিশার দ্রুত অবসান চাই। আশায় আশায় তবু চেয়ে থাকি...। “অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ,যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা;যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই- প্রীতি নেই- করুণারআলোড়ন নেইপৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।যাদের গভীর আস্থা আছে আজও মানুষের প্রতিএখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিক্ষা অথবা সাধনাশকুন ও শেয়ালের খাদ্য তাদের হৃদয়।”(কবি জীবনানন্দ দাশ) লেখক: অর্থনীতিবিদ, কলামিস্ট। সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। এইচআর/এমএস