১০ ও ৩০ কাউন্ট সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের নির্দেশ

দেশীয় স্পিনিং শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষা, রপ্তানি খাতে মূল্য সংযোজন বাড়ানো এবং এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পে ব্যবহৃত ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে সরকার। পাশাপাশি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে বিল অব এন্ট্রিতে কটন ইয়ার্নের কাউন্ট স্পষ্টভাবে উল্লেখ নিশ্চিত করতে এবং এইচএস কোডের অপব্যবহার রোধে কঠোর নজরদারির নির্দেশনা দিয়েছে। মন্ত্রণালয় মনে করে, এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে দেশীয় টেক্সটাইল শিল্প সুরক্ষিত হবে এবং এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী হবে। গত ১২ জানুয়ারি স্বাক্ষরিত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিবউটিও সেল-২ থেকে এক চিঠিতে এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের সুপারিশ এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) আহ্বানের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, যেখানে শিল্পের সুরক্ষা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, কাস্টমস ট্যারিফের এইচএস হেডিং ৫২.০৫, ৫২.০৬ ও ৫২.০৭-এর আওতায় ১০ ও ৩০ কাউন্টের সুতায় বন্ড সুবিধা থাকায় গত কয়েক বছরে আমদানি অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে এসব এইচএস হেডিংয়ের আওতায় সুতা আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৬ হাজার মেট্রিক টন, যার মূল্য ছিল প্রায় ১ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমদানি বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪১ হাজার মেট্রিক টনে এবং মূল্য ছাড়িয়ে যায় প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম দিকের প্রবণতাও ঊর্ধ্বমুখী, যেখানে আমদানির পরিমাণ ও মূল্য দুটিই উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বন্ড সুবিধা বন্ধের ব্যাখ্যায় চিঠিতে বলা হয়েছে, বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্ত বা স্বল্প শুল্কে আমদানিকৃত নিম্ন কাউন্টের সুতা দেশীয় বাজারে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হচ্ছে, ফলে স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। বর্তমানে দেশীয় স্পিনিং মিলগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে তারা মাত্র ৬০ শতাংশ সক্ষমতা ব্যবহার করে উৎপাদন চালাচ্ছে, যা শিল্পটির আর্থিক টেকসই অবস্থানকে দুর্বল করে দিচ্ছে। অন্যদিকে, সুতা আমদানির এই প্রবণতার কারণে দেশীয় উৎপাদিত সুতার বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, এরই মধ্যে প্রায় ৫০টি স্পিনিং মিল বন্ধ হয়ে গেছে এবং আরও অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসানের মুখে পড়েছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আরও মিল বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ উভয়ের জন্যই নেতিবাচক। এছাড়া সুতা আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের গার্মেন্টস খাতকে ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভর করে তুলছে। এতে দেশের টেক্সটাইল ভ্যালু চেইনের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ দুর্বল হচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে শিল্প কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী বাস্তবতার কথা তুলে বলেছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ ঘটালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের মতো প্রধান রপ্তানি বাজারে বিদ্যমান শুল্কমুক্ত সুবিধা অনেকাংশে হারাতে হবে। তখন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, সেপা ও জিএসপি প্লাস সুবিধা পেতে হলে রপ্তানি পণ্যে ৪০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত স্থানীয় মূল্য সংযোজন এবং ডাবল স্টেজ ট্রান্সফরমেশন নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক হবে। আমদানি করা সুতার ওপর নির্ভরতা থাকলে এসব শর্ত পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে জানানো হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রনালয়, মনে করে বন্ড সুবিধা অব্যাহত থাকলে দেশীয় শিল্পে নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে এবং উৎপাদন ব্যয় ও লিড টাইম বেড়ে যাওয়ার কারণে রপ্তানি খাতের সামগ্রিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হ্রাস পাবে। বিপরীতে, নিম্ন কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার করা হলে দেশীয় স্পিনিং শিল্পে ভারসাম্য ফিরে আসবে, স্থানীয় উৎপাদন বাড়বে এবং কর্মসংস্থান সুরক্ষিত হবে। আইএইচও/এসএনআর/এমএস