জকসুতেও ছাত্রদলের ভরাডুবির কারণ কী?

দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ধারাবাহিকভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ছাত্র ও হল সংসদ নির্বাচন। গেলো ৬ জানুয়ারি নির্বাচন হলো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (জকসু)। সবশেষ নির্বাচনেও ইসলামী ছাত্রশিবিরের জয়জয়কার। অন্যদিকে, ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের অনুপস্থিতিতেও ভরাডুবি হয়েছে ছাত্রদলের। ছাত্রদলের এই ভরাডুবির কারণ কী সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও হল সংসদ নির্বাচনে অধিকাংশ পদেই জয় পায় ইসলামী ছাত্রশিবির। জকসুর প্রথম নির্বাচনেও অধিকাংশ পদে জয় পেলো তারা। অপরদিকে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) নির্বাচন দীর্ঘদিন পর ছাত্র রাজনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল। এই নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফল অর্জন করতে পারেনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। ২১টি পদের মধ্যে ছাত্রদল-সমর্থিত প্যানেলের মাত্র চারজন প্রার্থী জয়লাভ করেছেন। ভিপি, জিএস ও এজিএসসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে হেরেছেন তারা। এছাড়া হল সংসদের ১৩টি পদের মধ্যে মাত্র দুটিতে জয় পেয়েছে ছাত্রদল। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল ১৬ হাজার ৪৪৫ জন। এর মধ্যে ভোট দিয়েছেন ১০ হাজার ৮৩৭ জন। প্রায় সব শীর্ষ পদেই ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’ প্যানেলের কাছে পরাজিত হয় ছাত্রদল-সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান’ প্যানেল। সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে ছাত্রশিবিরের প্রার্থী পেয়েছেন ৫ হাজার ৫৫৮ ভোট, আর ছাত্রদলের প্রার্থী পেয়েছেন ৪ হাজার ৬৮৮ ভোট। সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে ছাত্রশিবির পেয়েছে ৫ হাজার ৪৭৫ ভোট, বিপরীতে ছাত্রদল পেয়েছে ২ হাজার ২২৩ ভোট। সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে ছাত্রশিবিরের প্রার্থী পেয়েছেন ৫ হাজার ২০ ভোট, আর ছাত্রদলের প্রার্থী পেয়েছেন ৪ হাজার ২২ ভোট। আরও পড়ুন:জকসু নির্বাচন: শিবির-সমর্থিত প্যানেলের বড় জয়জকসু নির্বাচনে ৬৫ শতাংশ ভোট পড়েছেবসার জায়গা নেই জকসু নেতাদের সম্পাদকীয় অধিকাংশ পদেও ছাত্রদল পিছিয়ে পড়েছে। শিক্ষা ও গবেষণা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ, আইন ও মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক পদগুলোতে ভোটের ব্যবধান তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। তবে সাহিত্য ও সংস্কৃতি, পরিবহন এবং পাঠাগার ও সেমিনার সম্পাদক পদে জয় পেয়েছে ছাত্রদল। নির্বাহী সদস্যের সাতটি পদের মধ্যে পাঁচটিতেই জয় পেয়েছেন ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্রার্থীরা। নির্বাচনি ফলাফল ও সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মী এবং শিক্ষার্থীদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই পরাজয়ের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রার্থী বাছাই নিয়ে প্রশ্ন ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের একটি অংশের ভাষ্য অনুযায়ী, প্যানেল গঠনের সময় প্রার্থী বাছাই নিয়ে সংগঠনের ভেতরেই অসন্তোষ ছিল। তাদের মতে, কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রার্থীদের ক্যাম্পাসে পরিচিতি, সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা ও ভোট টানার সক্ষমতা যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে ছাত্রদলের বাইরে থেকে প্রার্থী এনে প্যানেল ঘোষণায় একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাত্রদলের এক নেতা বলেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন এবং সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় ছিলেন, তাদের অনেককে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে নির্বাচনকে ঘিরে দলীয় কর্মীদের মধ্যে উদ্দীপনার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। গ্রুপিং ও সমন্বয়ের অভাব নির্বাচনের সময় ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। দলটির ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় অংশের বিভাজন এবং একাধিক গ্রুপের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব নির্বাচনি প্রস্তুতিতে প্রভাব ফেলেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এর প্রমাণও মিলেছে কিছু ঘটনায়। ছাত্রদল-সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থী ঘোষণার দিনই একটি অংশ প্যানেলবিরোধী স্লোগান দেয়। ছাত্রদল নেতাদের একটি অংশ আলাদা একটি প্যানেল করে মনোনয়ন ফরম তোলে, যদিও শেষ পর্যন্ত তারা প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাত্রদলের এক নেতা বলেন, দলের ভেতরে সমন্বয়ের অভাব ছিল। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো সময়মতো এবং সবার সঙ্গে আলোচনা করে নেওয়া গেলে হয়তো মাঠের পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারতো। ছাত্রদলের এই অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বি প্যানেল একটি বিস্তৃত ও সমন্বিত কৌশল নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়। সংগঠিত প্রচারণা, বিভিন্ন সামাজিক ও আন্দোলনভিত্তিক পরিচিত মুখদের অন্তর্ভুক্তি এবং ধারাবাহিক মাঠপর্যায়ের কাজ ভোটারদের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব ও জোট রাজনীতি ভিপি প্রার্থী নির্বাচনসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব এবং শেষ মুহূর্তে জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্তও নির্বাচনি ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন সংগঠনের একাধিক নেতাকর্মী। তাদের মতে, এতে সংগঠনের স্বতন্ত্র অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরা কঠিন হয়ে পড়ে। ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, আমার মনে হয় ছাত্রদলের প্যানেলটি পরিপূর্ণ ছিল না। এখানে অনেক যোগ্য প্রার্থী থাকলেও বেশিরভাগই সংশ্লিষ্ট পদের জন্য উপযুক্ত ছিলেন না। অন্য কয়েকটি ছাত্রসংগঠন থেকে কিছু প্রার্থী অন্তর্ভুক্ত করাও একটি কারণ হতে পারে। আরও পড়ুন:জবি শিবিরের নেতৃত্বে জকসুর নতুন ভিপি রিয়াজ, জিএস আরিফ২০ জানুয়ারিতেই হবে শাকসু নির্বাচন, অনুমতি দিয়ে ইসির প্রজ্ঞাপন একই বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ছাত্রদলের কিছু পদে শক্তিশালী প্রার্থী ছিল, কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বি হিসেবে একাধিক যোগ্য প্রার্থী থাকায় শিক্ষার্থীরা আস্থার বিষয়টি বিবেচনা করে ভোট দিয়েছেন। যদি ওই প্রার্থীরা আলাদা আলাদা পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন, তাহলে হয়তো ছাত্রদল আরও কিছু পদ পেতে পারতো। অন্যান্য ছাত্রসংসদের ফলাফলের প্রভাব শিক্ষার্থীদের মতে, ডাকসু, রাকসু, জাকসু ও চাকসু নির্বাচনে শিবির-সমর্থিত প্যানেলগুলোর ধারাবাহিক সাফল্য জকসু নির্বাচনেও প্রভাব ফেলেছে। পাশাপাশি আত্মপ্রকাশের পর থেকেই ছাত্রশিবিরের কল্যাণমূলক কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করে। বিপরীতে ছাত্রদলও কল্যাণমূলক কাজ করলেও তা শিক্ষার্থীদের মধ্যে তেমন ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীরা। টিএইচকিউ/এসএনআর/এমএস