কখনো ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট না খুলেও প্রতারক চক্রের অভিনব প্রতারণার ফাঁদে পড়ে কারাভোগ করতে হয়েছে কুড়িগ্রামের অসহায় বৃদ্ধ আনছার আলীকে। প্রতারণার শিকার হয়ে আজ ঋণ, মামলা ও অনিশ্চয়তায় দিশাহারা তার পরিবার। আনছার আলী কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার পাঁচগাছী ইউনিয়নের ধরলা আবাসনের বাসিন্দা। জানা গেছে, ষাটোর্ধ্ব আনছার আলী কৃষিকাজ ও অটোরিকশা চালিয়ে স্ত্রী-সন্তানসহ পাঁচ সদস্যের সংসার চালান। তিনি ২০১৯ সালে ঢাকার রাস্তায় অসুস্থ স্ত্রী ফরিদা বেগমের মাথায় পানি ঢালার দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর আলোচনায় আসেন। এর আগে ২০১৬ সালে নদীভাঙনে ভিটেমাটি ও তিন বিঘা জমি হারিয়ে ঢাকায় আশ্রয় নেন। পরে তৎকালীন জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তাদের কুড়িগ্রামে পুনর্বাসন করা হয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি একটি প্রতারক চক্র আনছার আলীর জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে কুড়িগ্রামের পূবালী ব্যাংকে তার নামে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলে। এরপর কুড়িগ্রাম কলেজ মোড়ের ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে ‘আনছার আলী এয়ার ইন্টারন্যাশনাল’ নামে একটি ভুয়া রিক্রুটিং এজেন্সি খোলা হয়। ওই এজেন্সির নামে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওমরাহ পালনের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। বিজ্ঞাপনে দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করেন রাজবাড়ী সদর উপজেলার শিক্ষক আবুল হাসান। সৌদি আরবে যাতায়াতের বিমান ভাড়া বাবদ আটজনের জন্য জনপ্রতি ৭৩ হাজার ৫০০ টাকা করে মোট পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার টাকার চুক্তি হয়। পরে গত ৯ অক্টোবর আবুল হাসান রাজবাড়ী ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে কুড়িগ্রামের পূবালী ব্যাংকের ওই অ্যাকাউন্টে দুই লাখ ২০ হাজার টাকা পাঠান। পরে প্রতারক চক্র টাকা তুলে নেয় এবং দেখানো বিমান টিকিট বাতিল হয়ে যায়। প্রতারিত হয়ে ভুক্তভোগী আবুল হাসান গত বছরের ২০ অক্টোবর রাজবাড়ী আদালতে ব্যাংক অ্যাকাউন্টধারীর বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা করেন। মামলায় দেওয়া তথ্য অনুযায়ী অ্যাকাউন্টটি আনছার আলীর নামে হওয়ায় তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট জারি হয়। গত নভেম্বর মাসে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে এবং এক সপ্তাহ কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পান তিনি। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সময় আনছার আলীর প্রতিবেশী শিরিনা বেগমকে নমিনি দেখানো হলেও তিনি বিষয়টি সম্পর্কে কিছুই জানতেন না বলে দাবি তার। নমিনি শিরিনা বেগম জানান, আনছার আলীর পরিবারের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। অথচ তাকে নমিনী দেখানো হয়েছে। স্বামীকে জামিনে ছাড়াতে পরিবারকে ঋণ করতে হয়েছে বলে জানান আনছার আলীর স্ত্রী ফরিদা বেগম। তিনি বলেন, ‘স্বামীকে ছাড়াতে এক বোনের গরু বিক্রি করে ৫০ হাজার টাকা এবং আরেকজনের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা ধার করতে হয়েছে। এখন ঋণ শোধ আর মামলার হাজিরা সব মিলিয়ে আমরা সর্বস্বান্ত।’ আনছার আলী বলেন, আমি কোনোদিন পূবালী ব্যাংকে যাইনি, কোনো অ্যাকাউন্টও খুলিনি। আমার ভোটার আইডি কিভাবে ব্যবহার করা হয়েছে আমি জানি না। আমরা খেয়ে না খেয়ে দিন চালাই, ব্যাংক অাকাউন্ট খোলার সামর্থ্যই নেই। ভুক্তভোগী শিক্ষক আবুল হাসান বলেন, ‘বিজ্ঞাপনে দেওয়া নম্বরে কথা হলে তারা আমাকে বিমানের টিকিট দেখায়। পরে টিকিট বাতিল হয়ে গেলে বুঝতে পারি প্রতারণার শিকার হয়েছি। তাই বাধ্য হয়ে মামলা করেছি।’ বাদীর আইনজীবী রঞ্জু বিশ্বাস জানান, ‘রাজবাড়ী জেলা দায়রা জজ আদালতে সিআর-১২৮৫/২৫ নম্বর মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।’ এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম পূবালী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল অফিসার এএইচএম আলমগীর কবির বলেন, ‘আনছার আলীর নামে অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা চলছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠিকে প্রলোভন দেখিয়ে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে প্রতারণা করা হচ্ছে, এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’ রোকনুজ্জামান মানু/এফএ/এমএস