হ্যাঁ, আমি কথা বলতে চাই বর্তমান বাংলাদেশের সংকট নিয়ে। সংকট তো একটা নয় ভাই, আপনি কোন সংকটের কথা বলবেন? এই প্রশ্ন দিয়েই শুরু হয়েছিল আমার আর এক বন্ধুর কথোপকথন। বন্ধু দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাইরে। ভারতের কলকাতায় আত্মগোপনে। হঠাৎ একদিন ফোন করলো। কণ্ঠ শুনে চিনতে পারিনি। চিনবই বা কী করে। শেষ কবে কথা হয়েছিল, তার কোনো হিসাব নেই। অথচ ১৯৭১ সালে তার বাবার সঙ্গে আমি যুদ্ধ করেছি পাক সেনাদের বিরুদ্ধে। যুদ্ধ করেছি বললে অনেকে অবাক হবে। তখন আমার বয়স বড়জোর আট কিংবা দশ। আমার হাতে রাইফেল ছিল না, কিন্তু দায়িত্ব ছিল। আমাকে পাঠানো হতো মিলিটারি ক্যাম্পের আশপাশে। পাক সেনারা কোথায় আছে, কী করছে, কখন নড়াচড়া করছে এসব খবর জোগাড় করাই ছিল কাজ। কখনো খাবার নিয়ে যেতে হয়েছে মাঠে, জঙ্গলে, কিংবা গ্রামের গোপন আশ্রয়ে। কারো সন্ধান পেলে সেই খবর সঠিক জায়গায় পৌঁছে দেওয়া ছিল আরেকটি দায়িত্ব। তখন আমি সবচেয়ে বেশি পাশে ছিলাম আমার মায়ের। আমাদের পরিবার বড়। বাবা, মা, তিন বড় ভাই, তারপর আমি, তারপর পাঁচজন ছোট ভাইবোন। বাবা আর বড় ভাইয়েরা ছিল রণক্ষেত্রে। ঘরের ভেতর মায়ের ভরসা ছিলাম আমি। যুদ্ধের নয় মাস মাগুরা আর নড়াইলের এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে শরণার্থীর মতো হেঁটে বেড়িয়েছি। মাথায় বোঝা, কাঁধে ব্যাগ, কখনো কোলে শিশু। কখনো আবার বেদে সম্প্রদায়ের মতো নৌকায় চড়ে দূরের গ্রামে, যেখানে তখনো পাক হানাদার বাহিনী পৌঁছায়নি। একবার দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের বাড়িতে প্রায় এক মাস ছিলাম। সেখানে আমার এক সহপাঠী ছিল, সমবয়সী। আমরা একসঙ্গে মাঠে গরু চরাতাম, বিলে মাছ ধরতাম। ভয়হীন এক শৈশব, অথচ চারপাশে যুদ্ধ। সেই সময়টুকু আজও মনে হলে বুকের ভেতর কেমন করে ওঠে। এই দীর্ঘ সময় আমি ছোটখাটো অস্ত্রও চালিয়েছি মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে থেকে। ভয় বলে কিছু ছিল না। বন্ধুর বাবা ছিলেন মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার। অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী, জমিদার পরিবারের মানুষ। সম্পর্কে তিনি ছিলেন আমার মায়ের ফুফা। দেশ স্বাধীন করার পেছনে তার অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। আমি তখন মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ছিলাম। কিন্তু সঙ্গী ছিলাম না। আমার সঙ্গে ছিল আমার মা আর আমার ছোট ভাইবোনেরা। সময় গড়িয়েছে। সেই বাল্যবন্ধুর বাবা পরে বড় রাজনৈতিক নেতৃত্বে উঠে এসেছেন। তিনি আওয়ামী লীগের নেতা ছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সঙ্গী। পরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বেও ছিলেন। তারপর আমার সেই বাল্যবন্ধু তার বাবার পথ অনুসরণ করে চলেছেন। তিনি পাঁচ আগস্ট পর্যন্ত দেশেই ছিলেন। এখন তিনি ভারতে আছেন। জিজ্ঞেস করলাম ভবিষ্যতেও কি ভারতেই থাকবেন। উত্তরে বললেন না, দেশে ফিরবেন। শুধু সময়ের অপেক্ষায়। বন্ধুর ব্যক্তিগত ইতিহাসে আমি আর যাচ্ছি না। আমি বন্ধুর সঙ্গে ছিলাম তখন, যখন আমরা একসঙ্গে মাছ ধরতাম, গরু চরাতাম। কিন্তু এখন আমি না তার সঙ্গে, না তার সঙ্গী। আমি বরং এখন কথা বলতে চাই আরেকটি বাস্তবতা নিয়ে। যারা আজীবন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল, যারা এই রাজনীতির সঙ্গী ছিল, তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে। বছরের পর বছর যদি একটি বড় রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীরা আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হয়, তাহলে তাদের পরিবার কীভাবে বাঁচবে। তাদের সন্তানদের মনমানসিকতা কীভাবে গড়ে উঠবে। প্রশ্ন উঠতেই পারে, একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে অন্যায় হয়েছে। বিচার হতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে আমি একমত। কিন্তু বিচার করবে কে। কারা করবে। বাংলাদেশে কি এমন কোনো সংগঠন বা আইন আছে, যেখানে অন্যায়, অনিয়ম, দুর্নীতি নেই। যারা আজ ক্ষমতায় আছে, যারা দেশের দায়িত্ব নিতে এগিয়ে এসেছে, তাদের চরিত্র দেখুন। দেশে কীভাবে জুলুমের শাসন চলছে, তা কি চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে হবে। পঞ্চান্ন বছরের যে বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তার দায় শুধু আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং অরাজকতা বাড়বে। অন্যায় আর অত্যাচার আরও তীব্র হবে। বিচার হবে না। সব দোষ চাপিয়ে দিয়ে লুটপাট চলতেই থাকবে। যেমনটি চলছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও। যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, লুটপাট, খুন, গুমের অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন। কিন্তু যারা এসবের সঙ্গে জড়িত নয়, তাদের মামলা মোকদ্দমা সরিয়ে সাধারণ জীবনযাপনের অধিকার ফিরিয়ে দিন। দেশটা কারো বাপের না। এই কথা আজও সমানভাবে প্রযোজ্য। ভুলে গেলে চলবে না। আমি দূর প্রবাসে থাকি। তাই বাংলাদেশের সব মানুষের সঙ্গে আমি সরাসরি থাকতে পারি না। ছোটবেলায় অনেকের সঙ্গে চলাফেরা করেছি। কিন্তু কোনো দুর্নীতির সঙ্গী কখনো হইনি। আজ এই আবদার নিয়েই কথা বলছি। কেউ কোনো দলকে সমর্থন করলে তাকে অপরাধী বানাবেন না। প্রকৃত অপরাধী যে, বিচার হোক কেবল তারই। আমি যুদ্ধের সময় বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে ছিলাম। আমি কৈশোরে দেশে ছিলাম, কিন্তু অন্যায়ের সঙ্গী ছিলাম না কোনোদিন। আজ আমি না আছি সরাসরি সঙ্গে, না আছি সঙ্গী হয়ে দেশের মাটিতে। তবুও আমার অবদান অস্বীকার করা যাবে না। রয়েছে আমার অনুপ্রেরণা, অনুভূতি, নাগরিক অধিকার ও দায়িত্ব। রয়েছে সেই বিশাল সম্পদ, যা আমার অনুপস্থিতিতেও দেশের মানুষ ভোগ করছে। এই সম্পর্ক কোনো কাগজে লেখা চুক্তি নয়। এটি ইতিহাসে গাঁথা। আজ যারা দেশে রাজনীতি করছে, একবার ভেবে দেখুন তারা আসলে দেশের কী উপকার করেছে। রাজনীতি কি কেবল লুটপাটের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়নি। সৎ পথে চলার সুযোগ কি নিজেরাই নষ্ট করেনি। না করলে বলতে হবে, এত মানুষ কেন ভারতে পালিয়ে গেল। আর যারা ভারতের বাইরে পালিয়েছে, তারা তো আমার আপনার সম্পদ আত্মসাৎ করেই পালিয়েছে। পারলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন। কিন্তু সেটা করবেন না। কারণ যারা আজ রাজনীতি করছেন, তাদের অনেকেই ঠিক একই কাজ করছেন। ক্ষমতার মোহে নীতি বিসর্জন দিচ্ছেন, আর জনগণের চোখে ধুলো দিচ্ছেন। এই ধান্দাবাজি বন্ধ করুন। লোক দেখানো রাজনীতি ছেড়ে সত্যিকার কাজ করুন। দেখবেন, দেশ আপনাআপনি উন্নতির পথে হাঁটবে। আমি আজও দেশের সঙ্গে আছি, তবে সঙ্গী হতে পারব না অন্যায়ের। এই পার্থক্যটাই আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয় সত্য কথা বলতে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে। রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেনrahman.mridha@gmail.com এমআরএম/এমএস