চশমাদের কর্মবিরতি

ঘুম থেকে উঠে দেখি চশমা দিয়ে কিছু দেখা যাচ্ছে না। কী বিপদ! চশমা ছাড়া আমি সেমি অচল। চোখটা একটু ঘঁষে আবার চোখে লাগালাম। ওপরে বড় করে লেখা, তিন দফা দাবিতে কর্মবিরতি। কী কাণ্ড! ভালো করে চশমাটা মুছে আবার চোখে দিলাম। তাই তো। ভালো করে পড়ে দেখি, তিন দফা দাবিতে চশমাদের কমবিরতি। প্রতিদিন বারো ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন নয়; সেলফি তোলার সময় সানগ্লাস নিষিদ্ধ; ধুলা থেকে সুরক্ষা দিতে হবে। চশমা ছাড়া তো আমি অচল। পাশের রুমে গেলাম ছোটভাই শফিকুলের কাছে। দেখি সে তো রীতিমতো চশমার সাথে ঝগড়া করছে। হচ্ছেটা কীরে ভাই? শফিকুল একাডেমিকভাবে ছোটভাই হলেও আসলে বন্ধু। তুই-তোকারি সম্পর্ক। শফিকুল তো দেখি আরও চিন্তিত। ভার্সিটির প্রেজেন্টেশন আছে। যা না দিলেই নয়। সে চশমা ছাড়াই ভার্সিটি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। আমার অতটা জরুরি না হলেও ভাবলাম শফিকুলের সাথে যাই। দুজন বের হলাম। সিঁড়ি দিয়ে ধীরে ধীরে নামলাম। কাঁচি গেট পেরিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে দেখি একটা গুমোট পরিবেশ। প্রথমেই বিপত্তিটা দেখলাম, এক মাকে নিয়ে। বাচ্চা রীতিমতো কাঁদছে। মাকে বলছে, ‌‘আমি তো দেখছি না।’মা বলছে, ‘স্কুল না যাওয়ার কত ধান্দা।’ কথা বলতে বলতেই একটু হোঁচট খেলো ছেলেটা। মা বলল, ‘স্কুলে চলো। আর নাটক করতে হবে না।’ ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছি। একটা মুদি দোকানদারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক বয়স্ক লোক টাকা চোখের সামনে নিয়ে গুনছে। বলছেন, ‘বুুড়া বয়সে মানুষ চোখে সরষের ফুল দেখে কিন্তু আমার তো মনে হয় ভ্রম হয়েছে।’ ভার্সিটিতে আমরা হেঁটেই যাই প্রতিদিন। আজ ভাবলাম এভাবে চশমা ছাড়া হাঁটলে মাথা ব্যথা করবে। চশমা দিয়ে যে কিছুই দেখা যায় না। চারদিক কালো আর মাঝখানে তিনটি দাবি। রিকশায় উঠলাম। একটু পর সামনে এগোতেই দেখি, এক ভাই সাইকেল থেকে পড়ে গেছে। যদিও আবছা দেখছিলাম। রিকশাওয়ালা বলল, ‘আরে ফাঁকা রাস্তায় উষ্টা খেয়ে পড়ে গেলো।’ এরপর আরও কয়েকটা কথা বলল। সেদিকে কান দিলাম না। পড়ে যাওয়ায় রাস্তায় একটু ভিড় হয়েছে। পার হওয়ার সময় শুনলাম, ‘চশমটার কী যে হলো?’ রিকশা থেকে নামলাম। শফিকুল আর আমার চশমা হাত-পায়ের মতো জরুরি। এখানে একটা চশমার দোকান আছে। ভাবলাম একটু খোঁজ নিই। কী কাণ্ড। দোকানের সামনে কয়েকশ লোক। দোকান ভাঙচুরের অবস্থা। শুনলাম, দোকানের মালিক নাকি হালকা উত্তম-মধ্যম খেয়ে দোকানের শাটার অফ করে কোনোরকমে পালিয়ে গেছে। সেখানে থাকা লোকেরাও জানেন না কী হয়েছে? ভার্সিটিতে গেলাম। সবারই টেনশন চশমা নিয়ে। আমি আর ক্লাসে গেলাম না। শফিকুল জোর করেই তার সঙ্গে নিয়ে গেল। চশমা ছাড়াদের সহযোগিতায় স্লাইড অন করেছে শফিকুল। সে ইন্ট্রোডাকশনকে বলে ইনস্টিটিউশন। কিছুটা হাস্যকর ও বিরক্তিভরা বাজে প্রেজেন্টেশন শেষ হলো শফিকুলের। স্যারও আছে বিপদে। স্যারেরও যে চশমাই ভরসা। প্রেজেন্টেশন শেষে স্যার কিছু একটা বোর্ডে লেখার চেষ্টা করলেন। কিন্তু তিনি নিজেই পড়তে পারলেন না। বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘দ্যাটস অল ফল টুডে।’ বলে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেলেন। আমি ক্লাসের দিকে যাবো ভাবলাম। শফিকুল বলে, ‘বন্ধু চলো যাই। ভালো লাগছে না। মাথা ব্যথা করছে।’ সকাল থেকে পেটে কিছু পড়েনি। ক্যান্টিনে একটু ঢুকলাম। ক্যান্টিনের ভাইটি বলছে, ‘আমি চাইলাম শিঙাড়া, তুমি আনলাটা কী?’ এ নিয়ে উচ্চবাচ্য। দুুই বন্ধু মেসে ফিরলাম। ভাত খেয়ে একটু বিছানায় শুয়েছি। হঠাৎ দেখি চশমারা সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে। ব্যানারে লেখা, ‘আমরা চোখের দাস না, সহযোগী।’ দাবি মানা না হলে আমরা সবাই আত্মহত্যা করবো। তবুও কাজে যোগ দেবো না। তারা দাবি ও দাবির প্রেক্ষিতে যুক্তিসহ একটি লিফলেট ধরিয়ে দিলো। আমি চোখের কাছে কাগজ নিয়ে পড়লাম। অনেক ভেবে-চিন্তে তাদের উত্তর দিলাম।প্রথম দাবি ‘প্রতিদিন ১২ ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন নয়’। এর প্রেক্ষিতে জবাব দিলাম, ‘এটি এখন থেকেই মেনে নেওয়া হবে। প্রয়োজনে ফোনে টাইমার ব্যবহার করা হবে।’দ্বিতীয় দাবি ‘সেলফি তোলার সময় সানগ্লাস নিষিদ্ধ’। আমি বললাম, ‘ডান। প্রয়োজনে এটি একটা নতুন প্যাকেটে ভরে চশমাহীন কাউকে দান বা গিফট করা হবে।’তৃতীয় দাবি ‘ধুলা থেকে সুরক্ষা দিতে হবে।’ এর প্রেক্ষিতে বললাম, ‘এটা আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারবো না। তবে যথেষ্ট পরিমাণে সচেষ্ট ও ধুলাবালি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করবো।’ হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। চশমাটা চোখে দিতেই দেখি, সব পরিষ্কার। চশমারা নীরবে কাজে ফিরে গেছে। শফিকুল পাশ থেকে বলল, ‘বন্ধু, মনে হয় চশমারা জয়ী হয়েছে।’আমি বললাম, ‘জয়ী তো ওরাই হবে, আমরা তো হারার জন্যই জন্মাইছি।’ মোবাইল হাতে নিলাম। স্বাভাবিকভাবেই স্ক্রিন অন হয়ে গেল। চোখে একটু ঝিলিক লাগল। মাথার ভেতর আবার সেই পুরোনো ব্যথাটা শুরু হলো। চশমা ঠিক আছে কিন্তু চোখটা যেন ক্লান্ত। বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিচে তাকালাম। সকালবেলার সেই মা আর বাচ্চাটা নেই। মুদি দোকানের বুড়ো লোকটা আবার টাকা গুনছেন। সবকিছু আগের জায়গায় ফিরেছে। চশমাটা খুলে টেবিলে রাখলাম। মনে হলো, ও যেন ফিসফিস করে বলছে, দেখিস কিন্তু...। আমি হেসে বললাম, ‘যাও বাবা, যাও। মধ্যবিত্তের জীবনে কর্মবিরতি বলে কিছু নেই।’ চশমা আবার চোখে দিলাম। কারণ কাল সকালে ভার্সিটি আছে। আরও রম্যগল্প পড়ুনবোতল-বালিশ ও মশার এগ্রিমেন্ট  এসইউ