স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে তখন চরম বিশৃঙ্খলা। মানুষের খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানের ব্যবস্থা নেই, অর্থনীতিরও ভঙ্গুর অবস্থা। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের বাকশাল কায়েম রাজনৈতিক অধিকারের মূলে করেছে কুঠারাঘাত। এসবের মধ্যে শেখ মুজিব নিহত হওয়ার পর দেশে তালগোল অবস্থা। সেই অবস্থার উত্তরণে ধীরে ধীরে বাংলাদেশের মানুষের সামনে মুক্তির দিশা হয়ে ওঠেন জিয়াউর রহমান। তার হাত ধরে বাংলাদেশ ফিরে পায় বহুদলীয় গণতন্ত্র, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথ।১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি জনতার বিপ্লবের মধ্যদিয়ে স্বাধীনতার ঘোষক ও তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিতে আবারও প্রাণ ফেরানোর লড়াইয়ে নামেন তিনি। ১৯৭৬ সালে কলম্বোতে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন সম্মেলনে যোগদান করেন এবং বাংলাদেশ সাত জাতি গ্রুপের চেয়ারম্যান পদে পদোন্নতি লাভ করেন। সে বছরেই তিনি উলশি যদুনাথপুর থেকে স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন উদ্বোধন করেন। ১৯৭৭ সালের ২২ এপ্রিল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়ে জাতির উদ্দেশে বেতার ও টেলিভিশনে দেয়া ভাষণে গণভোটের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এ ধারাবাহিকতায় ৩০ এপ্রিল ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন তিনি। বিএনপি বা যেকোনো রাজনৈতিক দল যদি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে, তাহলে জাতীয় জীবনের বেশিরভাগ সমস্য সমাধান হওয়া সম্ভব। জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা ১. সর্বোতভাবে দেশের স্বাধীনতা, অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা।২. শাসনতন্ত্রের চারটি মূলনীতি অর্থাৎ সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস ও আস্থা, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের সমাজতন্ত্র জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে প্রতিফলন করা।৩. সর্ব উপায়ে নিজেদেরকে একটি আত্বনির্ভরশীল জাতি হিসেবে গড়ে তোলা।৪. প্রশাসনের সর্বস্তরে, উন্নয়ন কার্যক্রম এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়ে জনসাধারণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।৫. সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামীণ তথা জাতীয় অর্থনীতিকে জোরদার করা।৬. দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা এবং কেউ যেন অভুক্ত না থাকে তার ব্যবস্থা করা।৭. দেশে কাপড়ের উৎপাদন বাড়িয়ে সকলের জন্য অন্তত মোটা কাপড় সরবরাহ নিশ্চিত করা। ছবি: সংগৃহীত ৮. কোনো নাগরিক গৃহহীন না থাকে তার যথাসম্ভব ব্যবস্থা করা।৯. দেশকে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করা।১০. সকল দেশবাসীর জন্য ন্যূনতম চিকিৎসার বন্দোবস্ত করা।১১. সমাজে নারীর যথাযোগ্য মর্যাদা প্রতষ্ঠা করা এবং যুব সমাজকে সুসংহত করে জাতি গঠনে উদ্বুদ্ধ করা।১২. দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেসরকারি খাতে প্রয়োজনীয় উৎসাহ দান।১৩. শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতি সাধন এবং উৎপাদন বৃদ্ধির স্বার্থে সুস্থ শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক গড়ে তোলা।১৪. সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে জনসেবা ও দেশ গঠনের মনোবৃত্তিতে উৎসাহিত করা এবং তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন করা।১৫. জনসংখ্যা বিস্ফোরণ রোধ করা।১৬. সকল বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা এবং মুসলিম দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক জোরদার করা।১৭. প্রশাসন এবং উন্নয়ন ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা।১৮. দুর্নীতিমুক্ত ন্যায়-নীতিভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করা।১৯. ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সকল নাগরিকের অধিকার পূর্ণ সংরক্ষণ করা এবং জাতীয় ঐক্য এবং সংহতি সুদৃঢ় করা। পরে এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে ও তার নেয়া নীতি পরিকল্পনার সমর্থনে বাংলাদেশে প্রথম গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৭৭ সালের ৩০ মে। ওই গণভোটে মোট ভোটের ৯৮.৯ শতাংশ হ্যাঁ ভোট পড়েছিল। গণভোটের পর জিয়াউর রহমান দেশকে আবারও গণতন্ত্রের পথে আনার উদ্যোগ নেন। তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র চালুর সিদ্ধান্ত নেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা করে যে শূন্যতার সৃষ্টি করা হয়, তা পূরণে ইতিহাসের দাবি, দেশবাসীর আকাঙ্ক্ষায় বিএনপির অভ্যুদয় ঘটে। ঢাকার রমনা বটমূলের খোলা চত্ত্বরে ১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮ ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবদী দল (বিএনপি)’ নামে নতুন রাজনৈতিক দলের ঘোষণা দেন তিনি। আরও পড়ুন: ৯০তম জন্মবার্ষিকী / কমল থেকে সফল রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান বিএনপির ঘোষণাপত্রে বলা হয় বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ইস্পাত কঠিন গণঐক্য, ব্যাপক জনভিত্তিক গণতন্ত্র ও রাজনীতি প্রতিষ্ঠা, ঐক্যবদ্ধ ও সুসংগঠিত জনগণের অক্লান্ত প্রয়াসের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনৈতিক মুক্তি, আত্মনির্ভরশীলতা ও প্রগতি অর্জন এবং সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ, নয়া উপনিবেশবাদ অধিপত্যবাদের বিভীষিকা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে বিএনপি গঠিত হয়েছে। ১৯৭৮-এর ৩০ নভেম্বর সরকার ১৯৭৯ সালের ২৭ জানুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণা দেন। তবে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের দাবিতে দু’দফায় পিছিয়ে পরবর্তী ১৮ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে প্রথম সকল রাজনৈতিক দল ও জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বিএনপি ২০৭টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে এবং ৩৯টি আসন পেয়ে আওয়ামী লীগ (মালেক) প্রধান বিরোধী দল হয়। ওই সময় প্রেসিডেন্ট জিয়া বলেছিলেন, ‘বিএনপির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হচ্ছে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে আনা।’ জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা নিয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. একেএম মতিনুর রহমান তার এক লেখায় উল্লেখ করেছেন, ভূ-রাজনৈতিক কারণেই দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় তার স্বাধীনতা, অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব এবং সীমান্তে নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনা করে প্রথম দফায় তার সুস্পষ্ট উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশকে মুসলিম বিশ্বের সমর্থন, সহযোগিতা এবং আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে শাসনতন্ত্রের মূলনীতিতে মৌলিক পরিবর্তন জরুরি ছিল। এছাড়া বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। তাই নারীদের শিক্ষিত করে জাতি গঠনের উদ্বুদ্ধ করার মাধ্যমে সমাজের প্রতিটি স্তরে যথাযোগ্য মর্যাদা সুনিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। জিয়াউর রহমান তৈরি পোশাকশিল্প প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। সরকারি চাকরিজীবীদের আর্থিক সচ্ছলতা আনা এবং প্রজাতন্ত্রের সেবক হিসাবে নিয়োজিত থেকে দুর্নীতিমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখতে উৎসাহিত করেন। জাতীয় ঐক্য এবং জাতীয় সংহতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশে বসবাসকারী সব জাতিসত্তা ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীকে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ দর্শনে পরিচিত করে তোলেন তিনি। আরও পড়ুন: শহীদ জিয়ার ৯০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ২ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা অপচয়প্রবণ, দুর্নীতিপরায়ণ, লুটেরা অর্থনীতিতে প্রেসিডেন্ট জিয়া বেসরকারি ব্যক্তি উদ্যোগ উৎসাহিত করেন, পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে গ্রহণ করেন যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তিনি বিশ্বাস করতেন, সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত এবং সামগ্রিক দিক থেকে বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে একটি নির্দিষ্ট বলয়ে আবদ্ধ রেখে বৈদেশিক সম্পর্ক স্থাপন করলে উন্নত এবং সমৃদ্ধ দেশ গড়া সম্ভব নয়। তাই তিনি ইন্দো-সোভিয়েত বলয় থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করে বিশ্বের সব দেশের সফলতার সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। তিনি চীনের সঙ্গে সখ্যভাব স্থাপন করেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নতুন বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে, অর্থনৈতিক পরাশক্তি জাপানের সাথে হৃদ্যতা স্থাপন করে সৃষ্টি করেন নতুন অধ্যায়। ইঙ্গ-মার্কিন অর্থনীতির সাথে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সংশ্লিষ্ট করে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে তৈরি পোশাক শিল্প প্রবেশ করিয়ে এবং রেমিট্যান্স উপার্জনে মধ্যপ্রাচ্যে দক্ষ জনশক্তি রফতানির মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের সাথে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ১৯ দফাকে আজও খুব বেশি প্রাসঙ্গিক মনে করেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আ ফ ম জাকারিয়া। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যখন দায়িত্ব নিয়েছিলেন তখন দেশে বিপ্লব ও আন্দোলন চলছে। কঠিন একটা সময়ে বাংলাদেশকে তিনি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। আর এরজন্য তিনি সবচেয়ে বেশি নির্ভর করেছিলেন জনগণের ওপর। কারণ জনগণের সমর্থন ও সহযোগিতা ছাড়া কোনোভাবে দেশকে তিনি এগিয়ে নিতে পারতেন না। দেশ গঠনে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিতে জিয়াউর রহমান ক্ষমতার চেয়ার ছেড়ে দেশের কাদামাটিতে নেমে এসেছিলেন উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, জিয়াউর রহমান বলেছিলেন রাজনীতিকে তিনি রাজনীতিবিদদের জন্য কঠিন করবেন। আসলে তিনি রাজনীতিবিদদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন। তিনি ক্ষমতার চেয়ার থেকে নেমে জনগণের কল্যাণে রাজনীতিবিদদের কাজ করতে উৎসাহিত করেছেন। জিয়াউর রহমান জনগণের কাতারে এসে মাইলের পর মাইল পথ হেঁটেছেন। মানুষের কষ্টের কথা শুনেছেন। সমস্যার মাধানে কাজ করেছেন। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের উৎপাদন বাড়ানোর অংশ হিসেবে তিনি নিজে খাল খনন কর্মসূচিতে মাটি কেটেছেন। এসবের মধ্যদিয়ে তিনি সত্যিকারের রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে জনগণের মনে অবস্থান তৈরি করেছেন। আরও পড়ুন: জিয়াউর রহমান ও সন্তানদের সঙ্গে খালেদা জিয়ার দুর্লভ কিছু ছবি আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং নিজেদের শক্তিশালী হয়ে ওঠার পাশাপাশি বন্ধুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিতেও জিয়াউর রহমান চমক দেখিয়েছেন উল্লেখ করে অধ্যাপক জাকারিয়া বলেন, কল্যাণমুখী রাষ্ট্র ব্যবস্থা, সরকার ও জনগণের মধ্যে অংশীদারিত্বমূলক সম্পর্কোন্নয়ন এবং আধিপত্যবাদের বিপরীতে নিজেদের শক্তিশালী হয়ে ওঠার পথে হাঁটছিলেন শহীদ জিয়াউর রহমান। তিনি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ নিয়ে কথা বলেছেন। এই তত্ত্বের আলোকে তিনি দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। তবে তিনি তার কাজ শেষ করে যেতে পারেননি। যে কারণে গত ১৭ বছর আমরা আধিপত্যবাদের শিকার হয়েছি, নিজেদের মধ্যে বিভেদ বেড়েছে। তবে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান আবারও সেই বাংলাদেশপন্থি অবস্থান তৈরিতে কাজ করছেন উল্লেখ করে নৃবিজ্ঞানের এ অধ্যাপক বলেন, আমরা এখন দেখছি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানে দেশকে এগিয়ে নিতে মাঠে নেমেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি যদি বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করেন এবং বাংলাদেশপন্থি অবস্থান তৈরি করতে পারেন, সেটাই হবে আমাদের এগিয়ে যাওয়ার সোপান। এক্ষেত্রে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা খুব বেশি প্রাসঙ্গিক।