স্বল্পমেয়াদি শাসনামলেই জিয়াউর রহমানের চমক, দেশকে এগিয়ে নেন স্বনির্ভরতার পথে

খাল, সেচ, ফসল আর আয়; এই অর্থনৈতিক দর্শনে বাংলাদেশকে স্বনির্ভরতার পথে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তার সময়েই খাদ্য ঘাটতি কাটিয়ে দেশ খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে অগ্রসর হয়, পাশাপাশি তৈরি পোশাক শিল্প ও রেমিট্যান্সভিত্তিক অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে ওঠে।সেনানিবাস থেকে রণাঙ্গন, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা থেকে রাজনীতি; সবকিছুকে তিনি গেঁথেছেন অর্থনীতির বুননে। দেশের খাল, সেচ, ফসল আর আয়ে ঘেরা তার 'সবুজ বিপ্লব' কেবল স্লোগান ধ্বনিতেই অনুপ্রাণিত করেনি প্রাণ; বাস্তবমুখী পরিকল্পনায় এনে দিয়েছে সফল রূপান্তর, সফলতার জোগান। উন্নয়ন হবে গ্রাম থেকে এই দর্শনে কৃষি ভর্তুকি, উন্নত বীজ ব্যবহারের ওপর জোর দিয়ে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে দেশকে এগিয়ে নেন তিনি। স্বল্পমেয়াদি শাসনামলে জিয়াউর রহমানের কীভাবে চমক দেখিয়ে ছিলেন সে বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী বলেন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভূমিকা বাংলাদেশকে গড়তে কতটুকু সাহায্য করেছে সেইভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় জিয়াউর রহমানের একটা বিশাল ভূমিকা ছিল অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে। ১৯৭৫-৭৬ সালে খাদ্যশস্য উৎপাদন ছিল প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ টন; উর্বর জমিন আর তার কৃষি দর্শন মিলে ১৯৮০-৮১ সালে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টনে। ড. শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী বলেন, কীভাবে চাষযোগ্য জমি চাষযোগ্য করা যায় এবং চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কীভাবে বৃদ্ধি করা যায়, তাতে খাল খনন কর্মসূচি ছিল একটা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। আরও পড়ুন: ৯০তম জন্মবার্ষিকী / কমল থেকে সফল রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান উন্মুক্ত বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের হিস্যা বাড়াতে ১৯৭৬ সালে গঠন করেন জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো। ওই বছরই ৬০৮৭ জন বাংলাদেশি যান কুয়েতে, উন্মুক্ত হয় প্রবাসী শ্রমবাজার। ১৯৮১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫৫ হাজারে। ১৯৭৮ সালে 'দেশ গার্মেন্টস' প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রফতানিমুখী পোশাক শিল্পের যাত্রা। তখন মাত্র কয়েকটি কারখানার লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল, আজ তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজারের বেশি। সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে বেরিয়ে বেসরকারি খাতকে অগ্রাধিকার দেন তিনি। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রায় ২৫০টির বেশি শিল্প ইউনিট ও কল-কারখানা বেসরকারি খাতে হস্তান্তর করা হয় তার শাসনামলে। বেসরকারি খাতে ব্যাংক ও বীমা কোম্পানি খোলার অনুমতি দিয়ে আর্থিক খাতকে উন্মুক্ত করেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙা করতে ১৯৭৭ সালে গঠিত হয় পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গ্রামীণ জনপদে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়ার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হয়। নিজ কর্ম, দর্শন ও স্বপ্নের মধ্য দিয়ে অমর হওয়া সাবেক এই রাষ্ট্রনায়কের আজ ৯০তম জন্মবার্ষিকী। ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়ার বাগবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রবর্তক জিয়াউর রহমান। দেশপ্রেমের অন্যতম কবিতা জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে নিজের সফল পথচলার পাদটিকা এঁকে দিয়েছিলেন সেই ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ। ওইদিন রাতে চট্টগ্রামের ক্যান্টনমেন্ট থেকে যখন বাংলাদেশি সৈনিকদের বের করে দিয়ে সাধারণ মানুষ হত্যায় মেতে উঠেছিল পাকিস্তানি সেনারা। সে সময় মেজর জিয়া পরিষ্কারভাবে বলেছিলেন ‘উই রিভোল্ট!’। তার সেই সাহসী, সময়োপযোগী ও বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্তই বার্তা দিয়েছিল বাংলাদেশের জনগণ আর কখনও মাথা নত করে থাকবে না। চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে দেয়া স্বাধীনতার ঘোষণায় তিনি বলেছিলেন, ‘আমি, মেজর জিয়া, বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর প্রাদেশিক কমান্ডার-ইন-চিফ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের সরকার জোট-নিরপেক্ষ নীতি মেনে চলতে বদ্ধপরিকর। এ রাষ্ট্র সব জাতির সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে এবং বিশ্ব শান্তির জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে। আমি সব দেশের সরকারকে তাদের নিজ নিজ দেশে বাংলাদেশে নৃশংস গণহত্যার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছি।’ সেই ভাষণ আজও আমাদের মধ্যে প্রবাহিত হয়। দেশকে সামনে এগিয়ে নেয়ার শক্তি হিসেবে কাজ করে। সাহসী জিয়াউর রহমান শুধু ঘোষণাতেই ক্ষান্ত ছিলেন না। আড়ইশ’র মতো সৈন্য নিয়ে তিনি দুই-তিন দিন চট্টগ্রামের দখল ধরে রেখেছিলেন। স্বাধীনতার পর জিয়াউর রহমানকে কুমিল্লায় সেনাবাহিনীর ৪৪তম ব্রিগেডের কমান্ডার নিয়োগ করা হয়, যে ব্রিগেডের সদস্যরা তারই অধীনে ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন। ১৯৭২-এর জুন মাসে তিনি কর্নেল পদে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপ-সেনাপ্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৭৩ সালের মাঝামাঝি তিনি ব্রিগেডিয়ার পদে এবং ওই বছরের শেষের দিকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি লাভ করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান নিযুক্ত করা হয়। পরে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। আরও পড়ুন: জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা: আধিপত্যবাদের বিপরীতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রেরণা তবে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিতে জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে শুরু হয় নানা ষড়যন্ত্র। বিপদের সমূহ সম্ভাবনা জেনেও জিয়াউর রহমান তার কাজ করে যাচ্ছিলেন। ১৯৮১ সালের মে মাসে স্থানীয় বিএনপির একটি সাংগঠনিক কাজে চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন তিনি। ২৯ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে অবস্থান করেন। ওইদিন গভীর রাতে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে প্রাণ হারান তিনি। তবে গণমানুষের ভালোবাসায় সবসময় ছিলেন তিনি। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার জানাজায় সেই ভালোবাসারই প্রকাশ ঘটে। বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ জনসমাগম ঘটে তার জানাজায়, যেখানে প্রায় ২০ লাখের বেশি মানুষ অংশ নেন।