পটুয়াখালীতে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ও সহিংস ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। উপকূলীয় এই জেলায় চলতি মাসেই সংঘটিত হয়েছে পাঁচটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড। পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, গত এক বছরে জেলায় খুন ও অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে সাড়ে তিনশোরও বেশি। সাম্প্রতিক এসব ঘটনায় জননিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সামনে জাতীয় নির্বাচন থাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় পটুয়াখালী শহরের পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের সামনে নির্মাণাধীন একটি ভবনের নিচে নাহিদ নামের এক তরুণকে প্রকাশ্যে মারধর করা হয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সাত থেকে আটজন যুবক ক্রিকেট ব্যাট ও স্ট্যাম্প দিয়ে তাঁকে বেধড়ক পেটাচ্ছেন। পরে রিকশায় তুলে তাঁকে অন্যত্র নিয়ে গিয়ে দ্বিতীয় দফায় মারধর করা হয়। মুমূর্ষু অবস্থায় ফেলে রেখে চলে যান হামলাকারীরা। দুদিন পর ২ জানুয়ারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান নাহিদ।এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ৪ জানুয়ারি রাঙ্গাবালী উপজেলার মাঝনেতা গ্রামে নিজ বাড়ির রান্নাঘরের বারান্দা থেকে স্কুলছাত্রী আয়েশা মনির বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ জানায়, শ্বাসরোধে হত্যার পর মরদেহ গুম করতে বস্তাবন্দি করে রাখা হয়েছিল।এর পরদিন, ৫ জানুয়ারি, পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটার একটি ভাড়া বাসা থেকে আরিফা আক্তার নামের এক গৃহবধূর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার হয়। পরপর দুই দিনের এই দুটি হত্যাকাণ্ডে পুরো জেলাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।৮ জানুয়ারি রাতে পটুয়াখালী সদর উপজেলার বদরপুর ইউনিয়নের গাবুয়া এলাকায় বাজার করে বাড়ি ফেরার পথে মো. বশির শরীফ নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। হত্যার পর মরদেহ সড়কে ফেলে রেখে যায় তারা। সবশেষ ১১ জানুয়ারি দুপুরে কলাপাড়া উপজেলার মিঠাগঞ্জ ইউনিয়নের সাপুড়িয়া খালের পাড় থেকে ফেরদৌস মুন্সী নামের এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। হত্যার পর মরদেহ মাটিতে পুঁতে রাখা হয়েছিল বলে জানায় পুলিশ। এর দুই দিন আগে অসুস্থ বাবাকে দেখতে গিয়ে তিনি নিখোঁজ হয়েছিলেন।হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি পটুয়াখালীতে ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও প্রকাশ্যে মারধরের ঘটনাও বাড়ছে। এতে করে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা আরও গভীর হয়েছে। অনেকেই সন্ধ্যার পর চলাচলে সতর্কতা অবলম্বন করছেন।আরও পড়ুন: ভবঘুরের আড়ালে ভয়ংকর এক খুনি, ছদ্মবেশে ‘ছয় হত্যা’সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) পটুয়াখালী জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট শহিদুর রহমান বলেন, জেলার সাম্প্রতিক খুন ও সহিংসতার ধারাবাহিকতা উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্তের পাশাপাশি বিচার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে এবং সহিংসতার প্রবণতা বাড়তেই থাকবে। তার মতে, এমন পরিস্থিতি আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনেও সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হলে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য বড় হুমকি। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার ওপর তিনি জোর দেন।পটুয়াখালী ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আন নাহিয়ান বলেন, জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে জেলায় এ ধরনের সহিংসতা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও ভয় সৃষ্টি করছে। তাঁর মতে, প্রকাশ্যে সংঘটিত অপরাধের ঘটনায় যদি দ্রুত অপরাধীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে। এতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং নির্বাচনী পরিবেশও প্রশ্নের মুখে পড়বে। তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি প্রশাসনের সমন্বিত ও দৃশ্যমান উদ্যোগের দাবি জানান, যাতে জনগণের আস্থা ফিরে আসে।এ বিষয়ে পটুয়াখালীর পুলিশ সুপার মো. আবু ইউসুফ জানান, সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে এবং জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও যৌথ বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।৩ হাজার ২২১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই জেলায় বিস্তীর্ণ জনপদ, চরাঞ্চল ও পর্যটন এলাকা রয়েছে। এত বড় এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা প্রশাসনের জন্য চ্যালেঞ্জ হলেও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, নিরাপদ জীবন ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করা।