বাংলাদেশে ৬ ঋতুর মধ্যে বসন্তকালকে বলা হয় ঋতুরাজ। অর্থাৎ সকল ঋতুর রাজা। কারণ, এ ঋতুতে চতুর্দিক সবুজ এবং ফুলের কলি পাপড়ি মেলে ফুটে উঠে। আর তার সৌরভ দিক-বিদিক ছড়িয়ে পড়ে। ঘ্রাণের সুবাসে চতুর্দিক মৌ মৌ করে। গাছে গাছে ফুল ফুটে। ফুল থেকে ফল ধরে পাকতে শুরু করে। আর বাগানে চলার পথে নাকে ভেসে আসে সে ফলের মিষ্টি গন্ধ।বসন্ত ঋতু যেমন সুগন্ধিতে ভরপুর। তেমনি ১২ মাসের মধ্যে রমজান মাস হলো ঋতুরাজ বসন্তের মতো। এ মাস আল্লাহর রহমত, মাগফেরাত, নাজাত সহ অসংখ্য বরকত, ফজল ও করমে ভরপুর একটি মাস। হজরত আহমদ সেরহিন্দ মুজাদ্দিদে আলফে সানি রহ. বলতেন, রমজানে এত অধিক পরিমাণে রহমত বর্ষিত হয় যা বাকি এগারো মাসে অবতীর্ণ রহমতকে ম্লান করে দেয়। যেমন এক বিন্দু জল বিশাল সমুদ্রকে ম্লান করে দেয়। আমাদের বুজুর্গান ও মনীষী ব্যক্তিবর্গগণ এ মাসকে নেকি ও পুণ্য অর্জনের ভরা বসন্তই মনে করতেন। সে অনুযায়ী তারা এ মাসকে যথাযথ কাজে লাগাতেন। আমরা তাদের কিছু স্মৃতিচারণ আমাদের জন্য আমলের পাথেয় ও রাহনুমা বানাতে পারি। ১. আব্দুল কাদের রায়পুরি রহ. শাবান মাসের শেষ দিন ভক্ত-মুরিদ-মুতাআল্লিকিনদের ডেকে বলতেন, হায়াতে বেঁচে থাকলে রমজানের পর দেখা হবে। খাদেমকে একটি ছোট বস্তা দিয়ে বলতেন, যত চিঠি-পত্র আসবে এর মধ্যে ভরে রাখবে। আরও পড়ুন: সেহরি না খেয়ে কি রোজা রাখা যাবে? হায়াতে যদি বেঁচে থাকি রমজানের পর খুলে দেখব। আর বলতেন, রমজানের এই মাস আল্লাহর গোলামির পেছনে নিজেকে উৎসর্গ করলাম। এভাবে সারা মাস এতেকাফের নিয়তে মসজিদে অবস্থান করতেন। তার সাথে ভক্ত-মুরিদরাও এসে জমা হতো। এভাবে সমগ্র মসজিদ ভরে যেত লোকে লোকারণ্য থাকত সারা মাস ব্যাপী। ২. শাইখুল হাদিস যাকারিয়া রহ. বলেন, রমজানে নিজেকে শতভাগ ইবাদতে ব্যস্ত রাখতাম। প্রতিটি দিন কুরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে পার করতাম। কিছু নাওয়াফেল ও জিকির-আজকারও সময় করে আদায় করে নিতাম। আমার এক ঘনিষ্ঠ বাল্যবন্ধু একদিন আমার সাক্ষাতে এল। তাকে জোহরের পর দেখতে পাই। শুধু সালামের জবাব ছাড়া অন্য কোনো কথাই বললাম না তার সাথে। সোজা রুমে গিয়ে তেলাওয়াত শুরু করে দেই। সেও পেছনে পেছনে এসে বসে থাকে। এভাবে চলতে থাকে আসর পর্যন্ত। আছর নামাযের পরও যখন কথাবার্তা বলার সুযোগ পেল না তখন বলল, ভাই আমাদের কাছেও রমজান এসেছে, তবে তোমাদের কাছে যেভাবে এসেছে সেভাবে নয়। ৩. শাইখুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান দেওবন্দি রহ. তারাবি নামাজ দীর্ঘ করে পড়তে গিয়ে সেহরি পর্যন্ত বিলম্বিত করতেন। তার পরিবারের লোকেরা তাকে বিশ্রাম নিতে বলত। তিনি বলতেন, আগামী রমজান হায়াতে পাব কি না জানি না, এবারেরটাকেই শেষ রমজান মনে করে নিজেকে ক্লান্ত করছি। পরে তার ইমাম হজরত কারি সাহেবের মাধ্যমে তাকে বিশ্রামের জন্য বাধ্য করতে অনুরোধ করেন ঘরওয়ালীরা। কারি সাহেব নিজের উস্তাদের জন্য বিশ্রামের ব্যবস্থা করতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করবেন ভেবে সেদিন বায়না ধরলেন যে, হুজুর আজকে দীর্ঘ করে নামাজ পড়তে পারব না। আমি একটু অসুস্থ। শাইখুল হিন্দ রহ. একথা শুনে সাথে সাথে তাকে অনুমতি দিয়ে দিলেন। আর বললেন, আজকে কষ্ট করে বাসায় যাবেন না। আমার রুমেই শুয়ে থাকুন। সে মোতাবেক কারি সাহেব শুয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পর ঘুম ভাঙতেই দেখলেন, তার পা দাবিয়ে দিচ্ছেন কে যেন। উঠে দেখেন তিনি আর কেউ নন, হজরত শাইখুল হিন্দ রহ.। বললেন, হুজুর আপনি আমার পা টিপছেন? তিনি বললেন, আপনি অসুস্থ, এতটুকু খেদমত করতে দিবেন না! পরে কারি সাহেব বললেন, হুজুর চলেন এভাবে আপনি একাকী কেন রাত জাগবেন, তারচে বরং কুরআন শুনিয়েই রাত্রি পার করি। ৪. শাইখুল হিন্দের রমনীগণও প্রতি রমজানে ৭ খতম তেলাওয়াত শুনতেন তারাবিতে তার ছেলের মাধ্যমে। দৈনিক ৭ পারা হিসাবে। সে একদিন অসুস্থ হয়ে গেলে অন্য একজন কারি সাহেবকে নিয়োগ দেয়া হয়। তিনি ৪ পারা পড়েই নামাজ শেষ করে দেন। সেহরির সময় বাসায় উপস্থিত হলে রমণীদের অভিযোগের সম্মুখীন হন শাইখুল হিন্দ রহ.। কাকে আজকে পাঠালেন, তিনি তো আমাদের নামাজের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেন। পরে তিনি প্রকৃত ঘটনা জানতে পারেন। ৫. হজরত সুফিয়ান সাওরি রহ. রমযানে অন্যান্য নফল ছেড়ে দিয়ে বেশির চেয়ে বেশী কুরআন তেলাওয়াতে মশগুল থাকতেন। ৬. ইমাম আজম আবু হানিফা রহ. রমজান এলে অত্যধিক কুরআন তেলাওয়াতে মগ্ন থাকতেন। প্রতি রমজানে তিনি ৬৩ খতম কুরআন তেলাওয়াত করতেন এবং শুনতেন। রাতে ১ খতম করতেন, দিনে ১ খতম করতেন। আর তারাবিতে করতেন ৩ খতম। এভাবে মোট ৬৩ খতম তিনি পুরো রমজান জুড়ে তেলাওয়াত ও শুনতেন। ৭. ইমাম শাফেয়ী রহ.ও রমজান মাস পেলে কুরআন তেলাওয়াতের প্রতি অত্যধিক গুরুত্ব দিতেন। তিনি নিজেও রাত-দিন মিলিয়ে ২ খতম কুরআন পাঠ করতেন। এভাবে পুরো রমজানে ৬০ খতম করতেন। ৮. ইমাম বুখারি রহ. তার জীবনের প্রতি রমজানে রাত-দিনে ১ খতম করে কুরআন তেলাওয়াত করতেন। এভাবে তিনি প্রতি রমজানে ৩০ খতম কুরআন পাঠ সম্পন্ন করতেন। ৯. অনুরূপভাবে আরো বহু ইমাম ও মনীষীগণ আছেন যাদের কেউ প্রতি তিন দিনে ১ খতম, কেউ প্রতিপাঁচ দিনে ১ খতম, আবার কেউ প্রতি জুমায় তথা সাত দিনে ১ খতম কুরআন তেলাওয়াত সম্পন্ন করতেন। আরও পড়ুন: তারাবির নামাজের নিয়ম, নিয়ত ও দোয়া ১০. বর্তমানেও কিছু পীর-আওলিয়া ও মনীষী ব্যক্তিবর্গ নিজ নিজ খানকায় বা প্রতিষ্ঠানে রমজান মাস ব্যাপী সুলুক ও তাসাওউফ এবং মা’রেফতে ইলাহির জন্য কিংবা উলুম-মা'আরিফে আকাবেরে উম্মতের লক্ষ্যে ভক্ত-মুরিদ-মুতাআল্লিকিন-খোলাফাদের সমন্বয়ে উদ্যোগ গ্রহণপূর্বক আকাবিরের নকশে কদমে মেহনত চালু রেখেছেন। এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। লেখক: পরিদর্শক, বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড (বেফাক)