পৃথিবী উষালগ্ন থেকে বরাবরই ইনকিলাব বা পরিবর্তনের উর্বর ভূমি। জগতের বিজয়ীরা কখনো হয়েছে দমিত। বিজিত ছিনিয়ে এনেছে কখনো জয়ের মুকুট।তবে পৃথিবীর নিরীহ মানুষের জন্য এ উত্থান-পতন কোনো সুখকর বিষয় নয়। প্রতিটি ইনকিলাবই মানব জীবনে আঁছড়ে পরেছে উত্তাল সাগরের ঢেউ হয়ে। পরিবর্তনকালীন সময় জুড়ে বিজয়ী-পরাজিত সবার জীবনেই নেমে এসেছে অমাবস্যার অন্ধকার। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে শত-সহস্র মানুষের জীবন। যাইহোক, ইনকিলাবের প্রকৃতি বিশ্লেষণ এ প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয় নয়, বরং শুধু সেই পথটুকু বাতলে দেয়াই উদ্দেশ্য যা ভিন্ন কোনো ইনকিলাবই প্রকৃত ইনকিলাব নয়। বরং শুধুই সাময়িক উত্তেজনা, আর ধূসর মরীচিকা। পৃথিবীতে সংগঠিত বা ঘটমান ইনকিলাবের সংখ্যা অপরিসীম, তবে বৃহৎ পরিবর্তন গুলো নিম্নোক্ত তিন শ্রেণির মাঝেই সীমাবদ্ধ। ক. কল্যাণ ছেড়ে অকল্যাণমুখী অভিশপ্ত ইনকিলাব। খ. একমুখী অকল্যাণ ছেড়ে আরো বিদঘুটে অকল্যাণের পথে ইনকিলাব। গ. সর্বগ্রাসী অকল্যাণ পরিহার করে নিরেট কল্যাণের পথে ইনকিলাব। আরও পড়ুন: সেহরি না খেয়ে কি রোজা রাখা যাবে? এক. প্রথমোক্ত শ্রেণির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হতে পারে ইহুদি জাতির ইতিহাস। সুদীর্ঘকাল জুড়ে তারা ইমান ও আমালে ছালেহর মহা দৌলতে ছিলো ধন্য। ক্রমাগত আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের আগমনে জাতি হিসেবে তারা ছিলো গর্বিত। ধন-দৌলত, প্রভাব-প্রতিপত্তি সর্বক্ষেত্রে তারা ছিলো অনন্য উচ্চতায়। স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাদের পরিচয় দিয়েছেন কখনো উম্মাতুন মুক্তাছিদাহ তথা সরল পথের অনুসারী বলে। আবার কখনো বলেছেন উম্মাতুন কাইমাহ তথা সঠিক পথে প্রতিষ্ঠিত উম্মাহ। কিন্তু আল্লাহ তাআলার শানে বেয়াদবি। নবীদের সাথে অসদাচরণ। কোনো কোনো নবীকে হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ। আমানতের খেয়ানত। সাম্প্রদায়িক অহমিকা সহ নানাবিধ অপকর্মের মাধ্যমে কাল পরিক্রমায় এ জাতি আল্লাহ তা'লার কাছে হয়েছে চরম ধিক্কৃত। হয়েছে তা-কেয়ামত খোদা-ই গজবের স্থায়ী অংশীদার। এরশাদ হয়েছে, المغضوب عليهم যাদের উপর পতিত হয়েছে (খোদা-ই) ক্রোধ। দুই. খ্রিস্টবাদের উত্থান থেকে পরবর্তী দীর্ঘকালের সফরনামা সামনে রাখলে সফেদ আয়নার মতো ভেসে ওঠে একমুখী অন্ধকারের আঁচল ছেড়ে আরো নিকষ কালো আঁধারের পথে মানবতার আত্মঘাতী যাত্রা। খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতকে তদানীন্তনকালের পরাক্রমশালী রোম সাম্রাজ্যের রাজ দরবারে আসন গেড়ে নেয় খ্রিষ্ট ধর্মীয় আধিপত্য। গির্জা গুলো হয়ে ওঠে ক্ষমতার ভরকেন্দ্র। পোপ মহাশয়গণই হয়ে যায় ক্ষমতার কাণ্ডারি। ষষ্ঠ শতক পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও সপ্তম শতাব্দী থেকে যখন প্রাচ্যের বুকে ইসলাম মাথা তুলে দাঁড়ায়। ইবনে সিনা, ইবনে রুশদ, ইবনে খালদুনদের মতো হাজারো মুসলিম মনীষীর হাত ধরে শুরু হয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের নব-জোয়ার। প্রাচ্য পেরিয়ে এ আওয়াজ ছড়িয়ে যায় পাশ্চাত্যের পাড়ায় পাড়ায়। ব্রিটেন থেকে বসনিয়া সর্বত্র গুঞ্জরিত হয় ইসলামের জয়ধ্বনি। এ সময় সত্যের সাগরে অবগাহন করার সুবর্ণ সুযোগ পরিত্যাগ করে খ্রিষ্ট ধর্মযাজকরা হয়ে উঠে স্বৈরাচার। নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির লোভে ধরাবাঁধা সময়ের ও নির্দিষ্ট জনপদের একটি জীবন ব্যবস্থাকে সর্বকালের ধর্মের লেবাস দেওয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়। সত্যান্বেষীদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয় অন্ধত্বের কালিমা। জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় বসানো হয় হরেকরকম নিষেধাজ্ঞা। স্বাধীনচেতা মানুষের উপর নেমে আসে নির্যাতনের স্টিম রোলার। রাষ্ট্র ও ধর্মের যৌথ প্রচেষ্টায় খ্রিষ্ট জাতিকে প্রায় হাজার বছর পর্যন্ত এভাবেই সত্য পথের ইনকিলাব থেকে বঞ্চিত রাখা হয়। এই অন্যায়ের অনিবার্য প্রতিক্রিয়া স্বরূপ সতেরোশ শতকের শিল্প বিপ্লবের সময় এসে খ্রিষ্ট জাতি ধর্ম থেকেই হাত ধুয়ে নেয়। রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে ধর্মকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ঘরের কোনায়। তারা ভাবতে বাধ্য হয়, ধর্মই আমাদের উন্নতি-অগ্রগতির পথে বাধা। ধর্মকে পুরোপুরি সংকুচিত করে ফেলার মাঝেই আমাদের মুক্তি। কাল মার্কস, লেনিন কিংবা অ্যাডাম স্মিথদের মতো তথাকথিত দার্শনিকদের মুখরোচক বয়ানের মোহে পড়ে যায় খ্রিষ্ট সমাজ। সেক্যুলারিজমের পাল্লায় পড়ে ধর্মদ্রোহীতার পথে এগিয়ে যায় আরো এক ধাপ। যা তাদেরকে চূড়ান্তভাবে খোদা থেকে জুদা করে দেয়। তিন. কোরআন-সুন্নাহ ও ইতিহাসের দর্পণে কল্যাণমুখী ইনকিলাবের সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের অনুসৃত পথ ও পন্থা। তাদের প্রত্যেকের পরিবর্তনের যাত্রা শুরু হয়েছে আত্মসংশোধনের মাধ্যমে। কল্যাণমুখী পরিবর্তনের এ ধারায় সর্বাগ্রে থাকবে মুহাম্মদী ইনকিলাব। যখন আরবীয় সভ্যতা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিলো। মানবতা লজ্জায় মুখ লুকাবার পথ খুঁজছিল। সাম্প্রদায়িক অহমিকা আরব ভূখণ্ডকে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলো। সে সময় হাদিয়ে আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম 'রাহমাতুল্লিল আলামিন হয়ে আগমন করলেন। প্রাথমিক অবস্থায় সমাজ কিংবা রাষ্ট্র সংস্কারে মনোনিবেশ না করে আত্মসংস্কারে ব্রতী হলেন। তাঁর কর্মপন্থার প্রতিটি পড়তে পড়তে জীবন্ত হয়ে উঠল কোরআনি ফরমান, اِن الله لا يغير ما بقوم حتى يغيروا ما بأنفسهم অর্থ : আল্লাহ কোনো সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যে পর্যন্ত না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। (সুরা রা'দ, আয়াত-১১) সর্বকালের মুসলিম জাতিসত্তার সকল সংকট থেকে উত্তরণের এটাই কুরআনি ফরমুলা। মুহাম্মদী ইনকিলাব'র অভূতপূর্ব সফলতার এটাই মূলমন্ত্র। ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে প্রিয় মাতৃভূমির আকাশে বাতাসে সর্বাধিক ধ্বনিত স্লোগান হলো "ইনকিলাব"। পরিবর্তনের হাওয়ায় ভাসছে পুরো দেশ।সত্যিকারার্থে একটি আমূল পরিবর্তনের স্বপ্ন থেকেই অকাতরে প্রাণ দিয়েছিলো শহীদ আবরার ফাহাদ থেকে শরীফ উসমান। স্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করেছিল ঈমান দীপ্ত তারুণ্যের বিশাল কাফেলা। নিকট অতীতের ইসলামি রাজনীতির প্রাণপুরুষ মাওলানা মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ. এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে জাতিগত তাওবার ডাক দেয়ার সময়। তৈরি হয়েছিল জাহেলিয়াতের সূতিকাগার সকল প্রতীক-পতাকার বাইনারি ভেদ করে তাওহিদের পতাকা নিয়ে মুক্তির মিছিলে কোটি জনতার সংঘবদ্ধ হওয়ার অপার সম্ভাবনা। অথচ পরিতাপের সাথে লক্ষ্য করলাম, সবাই মিলে তন্ত্র মন্ত্রের ফেরিওয়ালা প্রতারকদের শেখানো বুলি 'সমাজ-রাষ্ট্র' সংস্কারের ধুঁয়া তুলছে। প্রতীক প্রীতির নেশায় পড়ে ভাতৃ-ঘাতী সংঘাতে লিপ্ত হচ্ছে। ঐতিহাসিক বাস্তবতা হলো, ব্যাক্তি বা আত্মসংস্কারহীন রাষ্ট্র বা সমাজ সংস্কার উপরে ফিটফাট ভিতরে সদরঘাট বৈ কিছুই নয়।আল্লাহ তাআলার স্পস্ট বার্তা, কোনো জনপদ এবং তথাকার জনগণ আত্মসংশোধনের মাধ্যমে ঈমান ও তাকওয়ার শপথে বলীয়ান হওয়া ছাড়া কখনোই উন্নত হতে পারে না। ইরশাদ হচ্ছে, ولو اَنّ أهل القرى آمنوا واتقوا لفتحنا عليهم بركات من الأسماء والأرض অর্থ: যদি কোনো জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনে ও পরহেজগারি অবলম্বন করে, তবে আমি তাদের জন্য অবশ্যই উন্মুক্ত করে দিবো আসমান ও যমীনের বরকত সমূহ। (সুরা আরাফ, আয়াত-৯৬) বাস্তবিক পক্ষে আমরা যদি পরিবর্তন প্রত্যাশী হই। শোষণ মুক্ত, ইনসাফপূর্ণ একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি। খোদা-ই বরকতে ভরে তুলতে চাই দেশমাতৃকার ইঞ্চি ইঞ্চি মাটি। তাহলে দেশ-রাষ্ট্র সংস্কারের লোক ভোলানো বক্তব্য পরিহার করতে হবে। উপরিউক্ত আয়াতের মর্ম বুকে ধারণ করে প্রথমে ব্যক্তিজীবন তারপর সমাজ ও রাষ্ট্র সর্বত্র ঈমান ও তাকওয়ার চর্চা ব্যাপকতর করতে হবে। আরও পড়ুন: তারাবির নামাজের নিয়ম, নিয়ত ও দোয়াতাহলেই কেবল দেশ, সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নতির সকল দুয়ার আরশে আজিম'র অধিপতি, মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ নিজেই উন্মুক্ত করে দিবেন। 'ইনকিলাব' নিছক মোহনীয় স্লোগান থেকে হয়ে উঠবে একটি জীবন্ত বাস্তবতা। প্রতিষ্ঠিত হবে একটি বাস্তব সম্মত নয়া বন্দোবস্ত। اِنّ الله لا يخلف الميعاد অর্থ : নিশ্চয়ই আল্লাহ স্বীয় ওয়াদার বরখেলাপ করেন না। (সুরা আলে-ইমরান, আয়াত-০৯) আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওফিক দান করুন, আমিন! লেখক: আলেম, ইমাম, লেখক ও শিক্ষক