ভাষা শহীদ আব্দুল জব্বারের স্মৃতি জাদুঘরে নেই কোনো স্মৃতি, খোঁজ রাখে না কেউ

ভাষার জন্য জীবন দেয়া এক অমর শহীদের স্মৃতি ধরে রাখতে গড়ে উঠেছে একটি জাদুঘর। কিন্তু সেখানে নেই ইতিহাসের সংরক্ষণ, কোনো স্মারক বা প্রামাণ্য দলিল। ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার পাঁচুয়া গ্রামে ভাষা শহীদ আব্দুল জব্বারের স্মৃতি জাদুঘর এখন কেবল নামেই জাদুঘর। দেড় যুগ পেরিয়ে গেলেও পূর্ণতা পায়নি প্রতিষ্ঠানটি।ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার পাঁচুয়া গ্রামে জন্ম ভাষা শহীদ আব্দুল জব্বারের। সবুজে ঘেরা এ জনপদেই বেড়ে উঠেছিলেন তিনি। সাধারণ জীবনযাপন করলেও ইতিহাসের এক অসাধারণ অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার নাম। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে রাজপথে নেমে মাতৃভাষার অধিকারের দাবিতে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেন তিনি। সেই আত্মত্যাগ তাকে স্থান দিয়েছে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের কাতারে। যে গ্রামে জন্ম নিয়েছেন এমন এক বীর সন্তান, সেই পাঁচুয়া গ্রামটির নামকরণ করা হয়েছে 'ভাষাশহীদ আব্দুল জব্বার নগর'। তার স্মৃতিকে ধরে রাখতে ২০০৮ সালে নির্মাণ করা হয় ভাষা শহীদ আব্দুল জব্বার গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর। কিন্তু দেড় যুগ পেরিয়ে গেলেও এখনও পূর্ণতা পায়নি প্রতিষ্ঠানটি। স্থানীয়রা জানান, প্রতিবছর মাতৃভাষা দিবসের আগমুহূর্তে জাদুঘরটি ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করা হয়। কিন্তু সারা বছর তেমন কোনো কর্মকাণ্ড থাকে না। প্রায় ১ হাজার ৪৬০ বর্গফুট আয়তনের গ্রন্থাগার ও জাদুঘরটিতে ৪ হাজারের বেশি বই থাকলেও নেই পাঠকের আনাগোনা। জাদুঘরে শহীদ জব্বারের ছবি, ব্যবহৃত জিনিসপত্র বা উল্লেখযোগ্য কোনো স্মারকও নেই। আরও পড়ুন: মাতৃভাষা দিবসে বাংলায় শুভেচ্ছা জানালেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ২০ ফেব্রুয়ারি সকালে জাদুঘর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, জাদুঘরের আশপাশ ও শহীদ মিনার এলাকা নারীরা পরিষ্কার করছিলেন। এ কাজ তত্ত্বাবধান করছিলেন ভাষা সৈনিক আবদুল জব্বার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এ কে এম হাবিবুর রহমান। জাদুঘরের সামনেই তৈরি করা হয়েছে মঞ্চ ও প্যান্ডেল। চলছে মেলার প্রস্তুতিও। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে উপজেলা প্রশাসনের কেন্দ্রীয় অনুষ্ঠান হবে এ চত্বরেই। সে জন্য চলছে শেষ মুহুর্তের প্রস্তুতি। এ কে এম হাবিবুর রহমান বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলে হওয়ার কারণে জাদুঘরে জনসমাগম কম হয়। এখানে আগে রাস্তা খারাপ থাকলেও এখন রাস্তা কিছুটা ভালো হয়েছে তাই মানুষের উপস্থিতিও বাড়ছে। এটিকে কেন্দ্র করে একটি মিনি পার্ক, স্থানীয় মঞ্চ, কারিগরি কলেজ গড়ে উঠলে লোকসমাগম আরও বাড়বে এবং গ্রন্থাগারটি আরও উদ্দিপনা পাবে। তিনি আরও বলেন, এখানে কারা বই পড়বে সেই বার্তাটি অনেকের কাছে নেই এ কারণেও পাঠক কম। শিশু থেকে সব বয়সী মানুষের জন্যই এখানে বই রয়েছে। শুক্র ও শনিবার সরকারি ছুটির দিন জাদুঘর বন্ধ থাকে। ছুটির দিনেও পরদিনের অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি দেখতে আসেন ভাষা শহীদ আবদুল জব্বার গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরের গ্রন্থাগারিক মো. কায়সারুজ্জামান। তিনি তালা জাদুঘরের কার্যালয়ের তালা খোলার পর অনেকে তা ঘুরে দেখেন। গ্রন্থাগারের ভেতরে ১১টি আলমারিতে ইতিহাস, বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলন, দর্শন, সাহিত্য, ধর্ম, কবিতা, উপন্যাস ও গল্পের বই ছাড়াও বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনী নিয়ে অসংখ্য বই দেখা যায়। কিন্তু সে গুলোর পাঠক এ গ্রামে খুম কম। জাদুঘরের জন্য আলাদা কোনো কক্ষ নেই। গ্রন্থাগারের ভেতরে একটি দেয়ালে আবদুল জব্বারের মৃত্যুর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস শ্বেতপাথরে লেখা রয়েছে। অবশ্য বাইরের দেয়ালে একটি ছবি রয়েছে। ভাষা শহীদ আবদুল জব্বার গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরের গ্রন্থাগারিক মো. কায়সারুজ্জামান বলেন, সরকারি ছুটির দিন ব্যাতিত সবার জন্য সকাল ৯ টা থেকে বিকেল ৫ টা পর্যন্ত উন্মুক্ত থাকে। এখানে দূর দূরান্ত থেকে মানুষ আসে। পাঠাগারে বিভিন্ন ধরণের ৪ হাজার ১৭৫ টি বই রয়েছে।  যে কেউ এসে পাঠাগারের বই পড়তে পারে। জাদুঘরে আসা দর্শনার্থীদের নানা প্রশ্নের সমুক্ষীন হতে হয় আমাদের। ভাষা শহীদ আবদুল জব্বারের ব্যবহার্য জিনিসপত্র দেখতে চায়। ব্যবহার্য জিনিসপত্র থাকলে মানুষ তৃপ্তি পেতো। কিন্তু আমাদের সংরক্ষণে না থাকায় আমরা তা প্রদর্শন করতে পারি না। ভাষা সৈনিক আবদুল জব্বারের চাচাতো ভাই জয়নাল সরকার বলেন, এখানে ফেব্রুয়ারি আসলেই লোকজন আসে, এছাড়া কেউ খোঁজ-খবর রাখে না। এখানে ছুটিরদিন ছাড়া লোকজন কম আসে। কিন্তু শুক্র ও শনিবার বন্ধ থাকায় গ্রন্থাগারের ভেতরে মানুষ দেখতে পারে না। মানুষ যদি সব সময় দেখতে পারতো, একটি অডিটরিয়াম থাকতো তখন লোকজন আসতো। এখানে একটি কলেজ করার কথা ছিলো, কিন্তু সেটি হয়নি। তিনি আরও বলেন, আবদুল জব্বারের ব্যবহার্য জিনিসপত্র থাকলে মানুষ আকৃষ্ট হতো, মানুষ আসতো। জাদুঘরে বেড়াতে এসে স্থানীয় বাসিন্দা তোফায়েল আহমেদ বলেন, প্রায় ১৮ বছর পূর্বে স্থাপিত জাদুঘরটিতে একটি লাইব্রেরি ও বই থাকলেও এখানে ভাষা শহীদের একটি ছবি ছাড়া ব্যবহৃত কোনো স্মৃতি কিছু নেই। এটি আরও কীভাবে প্রাণবন্ত করা যায়, জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো যায় তা নিয়ে কাজ করা উচিত। এটি নামেই স্মৃতি জাদুঘর কিন্তু কোনো স্মৃতিচিহ্ন নেই। আরও পড়ুন: মাতৃভাষা দিবসের স্মারক ডাকটিকিট অবমুক্ত করলেন প্রধানমন্ত্রী উপজেলা প্রশাসন বলছে, জব্বার নগরের সরকারি গেজেট, সড়ক সংস্কার, ভাষা শহীদের নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাসহ দর্শনার্থী বাড়াতে নেয়া হচ্ছে বিভিন্ন পরিকল্পনা। গফরগাঁও উপজেলা নির্বাহী অফিসার এন. এম. আবদুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, এটি উপজেলা সদর ও হাইওয়ে থেকে দূরে প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত। আশাপাশে কোনো গ্রোথ সেন্টার নেই। পাবলিক ট্রান্সপোর্টের সমস্যা, জায়গার সমস্যা, বই ছাড়া অন্য কোনো আকর্ষণ নেই। তথ্য প্রযুক্তির কারণে মানুষের মধ্যে পাঠ অভ্যাস স্বাভাবিকভাবেই কমে গিয়েছে। এছাড়া লোকবলের অভাব থাকায় একজন লাইব্রেরিয়ান এখানে দায়িত্ব পালন করেন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য জাদুঘরটিকে বই পত্র, তথ্যচিত্র দিয়ে আরও সমৃদ্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে ভাষা শহীদ আবদুল জব্বার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে স্লিপার, দোলনা, ব্যালেন্স, ঝুলানোর জন্য রিং স্থাপন করা হয়েছে।  জায়গা সমস্যার সমাধানে পাশ্ববর্তী জমির মালিকদের সাথে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। শহিদ মিনারটিকে পুননির্মাণ ও একটি স্থায়ী মঞ্চ নির্মাণে পরিকল্পনা রয়েছে।শিক্ষামূলক বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত করা হবে। গফরগাঁও উপজেলার রাওনা ইউনিয়নের পাঁচুয়া গ্রামে আবদুল জব্বার ১৯১৯ সালের ১০ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম হাছেন আলী এবং মায়ের নাম সাফাতুন নেছা। তিনি ধোপাঘাট কৃষিবাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন শুরু করেন। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর পড়াশোনা ছেড়ে দেন। এরপর জব্বার তার বাবাকে কিছুদিন কৃষিকাজে সাহায্য করেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল এলাকায় সংগ্রামী জনতার সমাবেশে যোগ দেন আবদুল জব্বার। সমাবেশের পর মিছিলেও ছিলেন তিনি। মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে আবদুল জব্বার মারা যান।