চর্চার অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে শেরপুরের ১৬টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি

নিয়মিত চর্চার অভাব আর পাঠ্যবইয়ের সংকটে হারিয়ে যেতে বসেছে শেরপুর জেলার সীমান্তঘেঁষা গারো পাহাড় সংলগ্ন ১৬টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নিজস্ব মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি। এক সময়ের সমৃদ্ধ এই জনপদ এখন নিজের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পর্যুদস্ত। পরিবারে চর্চা কমে যাওয়া এবং নিজস্ব ভাষায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ না থাকায় নতুন প্রজন্মের কাছে এখন ‘অচেনা’ হয়ে উঠছে তাদেরই হাজার বছরের ঐতিহ্য।শেরপুরের পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে বাস করা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুরা স্কুলগুলোতে বাংলা ভাষায় শিক্ষা গ্রহণ করতে গিয়ে অজান্তেই ভুলে যাচ্ছে নিজেদের মায়ের ভাষা। যদিও আধুনিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে কেউ অস্বীকার করছেন না, তবে সমাজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে সার্বক্ষণিক চর্চার অভাব এবং বিশেষায়িত শিক্ষকের অভাবে তারা বাঙালি সংস্কৃতির সাথে একীভূত হয়ে যাচ্ছে।পাহাড়-জঙ্গলে বাস করা মানুষগুলো বাপ-দাদার জাতিগত ঐতিহ্যকে কিছুটা ধরে রাখলেও আধুনিক শিক্ষার প্রভাবে হারিয়ে যাচ্ছে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি। শেরপুরের পাহাড়ি অঞ্চলে গারোদের নিজস্ব ভাষায় তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যবই থাকলেও পাঠদানে নেই শিক্ষক। ফলে শিশুরা বাধ্য হয়ে বাংলা ভাষা রপ্ত করে, করছে বাঙালি সংস্কৃতিকেই লালন। তাই এই মানুষগুলোর মায়ের ভাষা ও সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিজস্ব ভাষার পাঠ্যবই, শিক্ষক নিয়োগসহ কালচারাল একাডেমি গড়ে তোলার দাবি জানান।ঝিনাইগাতী উপজেলার সীমান্তঘেঁষা নকশী গ্রামের বাসিন্দা প্রদিপ সাংমা বলেন, আমরা পরিবারের সবার সাথে নিজেদের ভাষায় কথা বলি। কিন্তু সমাজের বাঙালিদের সাথে কথা বলতে গেলে আমাদের বাংলা ভাষাতেই কথা বলতে হয়। ফলে আমাদের ভাষার সাথে বাংলা ভাষারও সংমিশ্রণ হয়ে গেছে। ছোট্ট শিশুরা পরিবার থেকে আমাদের নিজস্ব ভাষা রপ্ত করলেও প্রতিবেশী শিশুদের সাথে মেলামেশা করতে গিয়ে বাংলা ভাষাও রপ্ত করার কারণে নিজস্ব ভাষা চর্চা করতে গিয়ে কিছুটা মিশ্রণও হচ্ছে।রাংটিয়া এলাকার চিপেন্দ্র নাথ কোচ আক্ষেপ করে জানান, আমাদের কোচ জাতী প্রায় বিলুপ্তির পথে। আমাদের কোচ ভাষায় কোন পাঠ্যবই নাই, বিদ্যালয়ে পাঠদানের কোন ব্যবস্থা নাই। তাই এই ভাষা ধীরে ধীরে বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সরকার যদি আমাদের ভাষায় বর্ণ পরিচয় এবং বিদ্যালয়ের পাঠ্য বই এর ব্যবস্থা করতো তাহলে, আমাদের ভাষাটা টিকে যেতো।কোচ কালচারাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়োশনের প্রতিষ্ঠাতা যোগল কিশোর কোচ জানান, আমাদের মাতৃভাষা এখন প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে। একটা সময় কোচ সম্প্রদায়ের লোকজন নিজস্ব ভাষায় ভাব আদান-প্রদান করতো, নিজস্ব ভাষায় গান গাইতো এবং নিজস্ব সংস্কৃতিতে মনের আনন্দ উৎসব পালন করতো। কিন্তু এখন এসব কিছুই বিলুপ্তপ্রায়। কোন ভাষার লিখিত রূপ না থাবলে সেটা একটা সময় বিলুপ্ত হবেই। তাই আমাদের পাহাড়ি সবগুলো সম্প্রদায়ের ভাষা ও সংস্কৃতিকে লিখিত আকারে সংরক্ষণ করার জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ করছি। নয়তো একটা সময় ইতিহাস থাকবে, কিন্তু ভাষা আর থাকবে না।আদিবাসী সক্ষমতা উন্নয়ন প্রকল্প (আইইডি) এর ফেলো সুমন্ত বর্মণ বলেন, আমরা চাই প্রত্যেক ভাষাভাসী মানুষ তার নিজস্ব ভাষায় কথা বলুক, নিজস্ব সংস্কৃতিতে আনন্দ উদযাপন করুক, নিজস্ব ভঙ্গিতে চলাফেরা করুক। কিন্তু শেরপুরের ১৬ টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জাতির মধ্যে মাত্র তিনটি সম্প্রদার তাদের নিজস্ব ভাষায় কথা বলে। তাদের নিজস্ব ভাষায় পাঠ্যপুস্তক না থাকায়, ভাষা চর্চাটা সঠিকভাবে হচ্ছে না। শেরপুরের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে একটি কালচারাল একাডেমি এবং একটি ভাষা চর্চাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার করার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি করছি।আরও পড়ুন: শেরপুরের সাত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হারিয়ে ফেলছে মাতৃভাষা ও সংস্কৃতিশেরপুরের জেলা প্রশাসক তরফদার মাহমুদুর রহমান সময় সংবাদকে বলেন, সীমান্ত অঞ্চলসহ জেলাজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষগুলোর নিজস্ব ভাষা এবং সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যেই এই জেলায় একটি কালচারাল একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা হবে বলেও আশ্বাস আশ্বাস দেন তিনি।বেসরকারি সংস্থা আদিবাসী সক্ষমতা উন্নয়ন প্রকল্পের (আইইডি) তথ্যমতে, শেরপুর জেলার সীমান্তজুড়ে সাতটি সম্প্রদায়ের ৬০ হাজারের বেশি মানুষের বসবাস। এরমধ্যে গারো, বর্মণ, কোচ ও হদি’র সংখ্যা বেশি।তাদের মধ্যে গারো সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছে ২৬ হাজার, বর্মণ রয়েছে ২২ হাজার, কোচ রয়েছে ৪ হাজার, হাজং সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার, হদি সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৫০০, ডালু রয়েছে ১ হাজার ৫০০, বানাই সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা ১৫০ জন।