২৬ ফেব্রুয়ারি ম্যানচেস্টারের গর্টন-ডেন্টন আসনে উপনির্বাচন। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ সংসদীয় আসনের ভোটযুদ্ধ হলেও, বর্তমান জাতীয় রাজনৈতিক সংকটে তা অনেক বড় রাজনৈতিক পরীক্ষার মঞ্চ। তিন প্রধান দলের কর্মীরা ইতোমধ্যেই ঘরে ঘরে প্রচারণা চালাচ্ছেন। কারণ এই আসন শূন্য হয়েছে সাবেক লেবার এমপি Andrew Gwynne–এর পদত্যাগে—যিনি একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে শেয়ার করা বিতর্কিত কৌতুকের জেরে দল থেকে বহিষ্কৃত হয়ে শেষ পর্যন্ত এমপি পদও ছাড়তে বাধ্য হন। একসময়ের লেবার ঘাঁটি এই এলাকা এখন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কেন্দ্রে। নতুন সীমানা পুনর্নির্ধারণের মাধ্যমে ২০২৪ সালে গঠিত গর্টন-ডেন্টন আসনটি তৈরি হয়েছে গর্টন, ডেন্টন ও রেডিশ এবং ম্যানচেস্টারের বার্নেজ, উইথিংটনের অংশ নিয়ে। অতীতে এসব এলাকায় কনজারভেটিভদের উপস্থিতি ছিল, এমনকি একসময় লিবারেল ডেমোক্র্যাটরাও জয় পেয়েছিল বার্নেজ-উইথিংটন-ডিডসবারি এলাকায়। কিন্তু এবারের নির্বাচনে টোরি প্রার্থী থাকলেও বাস্তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রবিন্দুতে নেই তারা। এই উপনির্বাচন তাই সরাসরি প্রধানমন্ত্রী Keir Starmer–এর নেতৃত্বাধীন লেবার পার্টির জন্য এক বড় পরীক্ষা। ২০২৪ সালে তারা স্বাচ্ছন্দ্যে এই আসন জিতেছিল। কিন্তু প্রাথমিক কিছু জরিপে ইঙ্গিত মিলছে—ডানপন্থি Reform UK চমক দেখাতে পারে। স্বাস্থ্যনীতি ও অভিবাসন—রাজনীতির কেন্দ্রে ব্রিটিশ রাজনীতিতে এখন যে দুটি বিষয় প্রবলভাবে আলোচিত—অভিবাসন ও জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস)। লেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, দীর্ঘদিনের সংকটে থাকা National Health Service–কে শক্তিশালী করবে, রোগীদের দীর্ঘ ওয়েটিং লিস্ট কমাবে। কিন্তু বাস্তবে সেই অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। স্বাস্থ্যখাতের দুরবস্থা অবশ্য কেবল বর্তমান সরকারের সৃষ্টি নয়; গত দুই দশক ধরেই তা অবনতিশীল। তবু প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতা লেবারের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে গ্রিন পার্টি এনএইচএস সম্পূর্ণভাবে সরকারি অনুদাননির্ভর রাখার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। পরিবেশবাদী রাজনীতির পাশাপাশি সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে তাদের স্পষ্ট অবস্থান শহুরে মধ্যবিত্ত ও তরুণ ভোটারদের আকর্ষণ করছে। অনেক ক্ষেত্রে লেবার-সমর্থকদের একাংশ গ্রিনকে বিকল্প হিসেবে ভাবতে শুরু করেছেন। লেবার এখনো শক্ত অবস্থানে, এবং রিফর্মকে ঠেকাতে কৌশলগত ভোট তাদের দিকেই যেতে পারে। কিন্তু এই নির্বাচনের ফল যাই হোক—একটি বিষয় স্পষ্ট: স্যার কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসে গেছে। কারণ উপনির্বাচনের এই ক্ষুদ্র মঞ্চেই অনেক সময় জাতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ রূপরেখা আঁকা হয়ে যায়। অভিবাসনবিরোধী ডানপন্থি ‘রিফর্ম ইউকে’ অভিবাসন ইস্যুকে সামনে এনে বলছে—অর্থনৈতিক দুর্বলতার অন্যতম কারণ অভিবাসী প্রবাহ। যদিও বাস্তবতা হলো, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি বিশ্বব্যাপী সমস্যা। ইউরোপজুড়ে অভিবাসন প্রশ্নে রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়লেও অর্থনৈতিক স্থবিরতার কারণ একমাত্র অভিবাসী—এমন যুক্তি সরলীকৃত একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার। জনমত গঠনে এই বক্তব্য কাজে লাগাচ্ছে তারা। ভৌগোলিক ও জনতাত্ত্বিক বৈপরীত্য গর্টন-ডেন্টন আসনটি দীর্ঘায়িত এবং সামাজিক-জনতাত্ত্বিকভাবে বৈচিত্র্যময়। টেমসাইডের ওয়ার্ডগুলোতে শ্বেতাঙ্গ শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী প্রধান; অন্যদিকে ম্যানচেস্টারের অংশে শিক্ষার্থী ও মুসলিম জনগোষ্ঠী এবং অভিবাসীর উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। ফলে ভোটের সমীকরণ একমুখী নয়। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এটি লেবারের জন্য সহজ জয়ের আসন। গ্রেটার ম্যানচেস্টার কার্যত লেবারের শক্ত ঘাঁটি—এখানকার পাঁচটি সংসদীয় আসনই তাদের দখলে, সিটি কাউন্সিলে প্রায় একচেটিয়া আধিপত্য, আর সাম্প্রতিক মেয়র নির্বাচনে Andy Burnham বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। তবু উপনির্বাচন সরকারপক্ষের জন্য প্রায়ই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ২০২৫ সালের মে মাসে চেশায়ারের রানকরন অ্যান্ড হেলসবি আসনে লেবার হেরে যায় রিফর্ম প্রার্থী Sarah Pochin–এর কাছে—মাত্র ছয় ভোটে। অথচ আগের নির্বাচনে সেখানে লেবারের ব্যবধান ছিল ১৪ হাজারের বেশি। ফলে গর্টন-ডেন্টনে ২০২৪ সালের ১৩ হাজার ভোটের ব্যবধানও এখন আর নিশ্চিন্ততার প্রতীক নয়। রিফর্মের উচ্চাভিলাষ Nigel Farage–এর নেতৃত্বে রিফর্ম ইউকে জাতীয় পর্যায়ে গতি অর্জন করেছে। জরিপ বলছে, কিছু ক্ষেত্রে তারা লেবারের চেয়েও এগিয়ে। সাম্প্রতিক দলবদলের মাধ্যমে তাদের সংসদীয় উপস্থিতিও বেড়েছে। গর্টন-ডেন্টনে তাদের প্রার্থী Matthew Goodwin—সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও জিবি নিউজ উপস্থাপক—ভোটারদের কাছে পরিচিত মুখ। গুডউইনের কৌশল হলো এই উপনির্বাচনকে স্টারমারের নেতৃত্বের ওপর একপ্রকার গণভোটে পরিণত করা। সাম্প্রতিক জরিপে নর্থ ইংল্যান্ডের বিপুলসংখ্যক ভোটার প্রধানমন্ত্রীর কর্মদক্ষতা নিয়ে সন্তুষ্ট নন—এই অসন্তোষকে পুঁজি করতেই রিফর্মের প্রচেষ্টা। তারা যদি এখানে জয়ী হয়, তবে সংসদে তাদের আসনসংখ্যা বেড়ে Scottish National Party–এর সমান হতে পারে—যা প্রতীকী গুরুত্ব বহন করবে। গ্রিনদের সম্ভাব্য নির্ধারক ভূমিকা ২০২৪ সালে এই আসনে গ্রিনদের ফল আশানুরূপ ছিল না, তবে জাতীয়ভাবে তারা ৭ শতাংশ ভোট পেয়েছে এবং স্থানীয় কাউন্সিলে ৮০০-র বেশি আসন দখলে রেখেছে। নতুন নেতা Zack Polanski–এর অধীনে দলটি নিজেদের কণ্ঠ আরও জোরালো করতে চায়। তাদের প্রার্থী Hannah Spencer—স্থানীয় কাউন্সিলার—এই এলাকায় পরিচিত মুখ। গ্রিনরা জয়ী না হলেও শক্তিশালী ফল করলে লেবারের ভোটভাগে প্রভাব পড়বে। ডানদিকে রিফর্ম ও বামদিকে গ্রিন—এই দ্বিমুখী চাপে লেবার মাঝখানে পড়ে যেতে পারে। নভেম্বর মাসে ওয়েলসের কেয়ারফিলির সেনেড উপনির্বাচনে লেবার তৃতীয় স্থানে নেমে যাওয়ার নজির সেই সতর্ক সংকেতই দেয়। গর্টন-ডেন্টনের উপনির্বাচন কেবল একটি আসনের লড়াই নয়; এটি উত্তর ইংল্যান্ডে বহুদলীয় রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতার সূচক। অভিবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে ব্রিটিশ রাজনীতি এখন পুনর্গঠনের জন্য সকল দলের কাছেই এক কঠোর পরীক্ষা। লেবার এখনো শক্ত অবস্থানে, এবং রিফর্মকে ঠেকাতে কৌশলগত ভোট তাদের দিকেই যেতে পারে। কিন্তু এই নির্বাচনের ফল যাই হোক—একটি বিষয় স্পষ্ট: স্যার কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসে গেছে। কারণ উপনির্বাচনের এই ক্ষুদ্র মঞ্চেই অনেক সময় জাতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ রূপরেখা আঁকা হয়ে যায়। লেখক : বৃটেনপ্রবাসী কলামিস্ট। এইচআর/জেআইএম