বয়স বাড়লে রোজায় বাড়তি যত্ন কেন জরুরি?

রোজা মানেই সংযম, ধৈর্য ও আধ্যাত্মিক অনুশীলনের সময়। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের ভেতরের কার্যপ্রণালিতে স্বাভাবিকভাবেই কিছু পরিবর্তন আসে। তাই তরুণ বয়সে রোজা রাখা সহজ হলেও প্রবীণ বয়সে তা একই রকম নাও হতে পারে। আর সেজন্যই বয়স্কদের রোজায় বাড়তি যত্নের প্রয়োজর হয়। চলুন জেনে নেই বয়স বাড়লে শরীরে কী পরিবর্তন ঘটে, রোজার সময় কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে এবং কীভাবে সচেতন প্রস্তুতির মাধ্যমে নিরাপদে রোজা পালন করা যায়। বয়স বাড়লে শরীরে কী পরিবর্তন ঘটে? বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে যায় পেশির শক্তি কমে পানিশূন্যতার ঝুঁকি বাড়ে হরমোনের ভারসাম্যে পরিবর্তন আসে দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় বিশেষ করে ৬০ বছরের পর শরীরের পানি ধারণক্ষমতা কমে যায়। ফলে দীর্ঘ সময় না খেয়ে বা পানি না পান করলে পানিশূন্যতা দ্রুত দেখা দিতে পারে। দীর্ঘসময় না খেয়ে থাকলে কী সমস্যা হতে পারে? পানিশূন্যতা (ডিহাইড্রেশন): প্রবীণদের ক্ষেত্রে তৃষ্ণাবোধ অনেক সময় কম থাকে। ফলে শরীরে পানি কমে গেলেও তারা তা বুঝতে পারেন না। এতে মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, রক্তচাপ কমে যাওয়া এমনকি পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। রক্তে শর্করার ওঠানামা: ডায়াবেটিস থাকলে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা বিপজ্জনক হতে পারে। রক্তে শর্করা হঠাৎ কমে (হাইপোগ্লাইসেমিয়া) বা বেড়ে যেতে পারে। এ অবস্থায় ঝিমুনি, ঘাম, কাঁপুনি বা অজ্ঞান হওয়ার ঝুঁকি থাকে। উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগ: যাদের উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগ রয়েছে, তাদের ওষুধের সময়সূচি পরিবর্তন হলে জটিলতা তৈরি হতে পারে। রোজার সময় সঠিকভাবে ওষুধ গ্রহণ না করলে রক্তচাপ অস্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে। কিডনি সমস্যা: কিডনি রোগে আক্রান্ত প্রবীণদের জন্য দীর্ঘসময় পানি না পান করা ঝুঁকিপূর্ণ। এতে কিডনির ওপর চাপ বাড়ে। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার দৃষ্টিভঙ্গি ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশন দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাস ও ওষুধের নিয়ম মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দেয়। এছাড়া ব্রিটিশ নিউট্রিশন ফাউন্ডেশন রমজানে প্রবীণ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পরামর্শ দেয়। মায়ো ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, বয়স বাড়লে ডিহাইড্রেশন ও রক্তচাপজনিত সমস্যা দ্রুত জটিল আকার নিতে পারে। আরও পড়ুন:  রোজায় শক্তি ধরে রাখতে চাই সঠিক পুষ্টি আর্থ্রাইটিস নিয়ন্ত্রণে জরুরি নিয়মিত যত্ন দীর্ঘসময় না খেয়ে সুস্থ থাকবেন যেভাবে কেন বাড়তি যত্ন জরুরি? তরুণদের মতো দ্রুত শক্তি পুনরুদ্ধার করতে পারেন না প্রবীণরা। তাই দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে ক্লান্তি বেশি অনুভূত হয়। প্রবীণদের মধ্যে অনেক সময় ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগ একসঙ্গে থাকে। রোজার সময় এই রোগগুলোর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা জরুরি। অনেক প্রবীণ দিনে একাধিকবার ওষুধ সেবন করেন। রোজার সময় সেই সময়সূচি পরিবর্তন করতে হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন। বয়স বাড়লে ক্ষুধা কমে যায়। ফলে ইফতার ও সেহরিতে পর্যাপ্ত পুষ্টি গ্রহণ না করলে শরীরে দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। প্রবীণদের জন্য প্রস্তুতির করণীয় রোজা শুরুর আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো ভালো। বিশেষ করে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা কিডনি সমস্যা থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত। সেহরিতে সুষম খাবার খাওয়া। যেমন- জটিল কার্বোহাইড্রেট (লাল আটা রুটি, ওটস), প্রোটিন (ডিম, ডাল, মাছ) ও পর্যাপ্ত পানি। ইফতারে ধীরে ধীরে খাবার শুরু। খেজুর ও পানি দিয়ে শুরু করে কিছু সময় বিরতি দিয়ে মূল খাবার গ্রহণ করা ভালো। পর্যাপ্ত পানি পান করুন। ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি। তবে একসঙ্গে বেশি না খেয়ে ভাগ করে পান করা ভালো। অতিরিক্ত পরিশ্রম এড়িয়ে চলা উচিত। হালকা হাঁটা শরীরের জন্য উপকারী। কখন রোজা ভাঙা উচিত? ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী অসুস্থ ব্যক্তির জন্য ছাড় রয়েছে। যদি দেখা যায় মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত দুর্বলতা, রক্তচাপ অস্বাভাবিক, রক্তে শর্করা বিপজ্জনক মাত্রায় নেমে যায় তাহলে স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে রোজা ভেঙে ফেলা উচিত। জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা সর্বাগ্রে গুরুত্বপূর্ণ। বয়স বাড়লে রোজা রাখা অসম্ভব নয়, তবে তা সচেতন পরিকল্পনা ও বাড়তি যত্ন দাবি করে। শরীরের পরিবর্তন, দীর্ঘমেয়াদি রোগ ও ওষুধের বিষয় বিবেচনায় না নিলে ছোট সমস্যা বড় জটিলতায় রূপ নিতে পারে। তথ্যসূত্র: ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশন/ব্রিটিশ নিউট্রিশন ফাউন্ডেশন জেএস/