শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলা মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের বিদ্যুৎ বিল বকেয়া প্রায় ৮ লাখ ২৮ হাজার টাকা। ৩৫ মাস ধরে জমে থাকা বিল পরিশোধ না করায় গত ৬ জানুয়ারি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো)। এতে মুসল্লিরা রমজানে তারাবির নামাজ আদায় করছেন মোমবাতি জ্বালিয়ে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৩ সালের ১৬ জানুয়ারি মসজিদটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনের পর প্রায় তিন বছর অতিক্রান্ত হলেও বিদ্যুৎ বিল পরিশোধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি মসজিদ পরিচালনা কমিটি বা ইসলামিক ফাউন্ডেশন। নিয়মিত বকেয়া বাড়তে থাকায় শেষ পর্যন্ত সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় বিদ্যুৎ বিভাগ। এদিকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার দেড় মাস পর বিষয়টি জানতে পারেন মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও নালিতাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন। আধুনিক এই মসজিদটিতে রয়েছে একাধিক নামাজের কক্ষ, দামি ঝাড়বাতি, শতশত লাইট, ফ্যান ও এসি। এছাড়া নারী-পুরুষ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য পৃথক অজুখানা ও আধুনিক টয়লেট, অটিজম কর্নার, ইসলামিক বই বিক্রয় কেন্দ্র, লাইব্রেরি, ইমাম ট্রেনিং সেন্টার, হজ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, গবেষণা কার্যক্রম, শিশু ও গণশিক্ষা ব্যবস্থা এবং দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আবাসন সুবিধাসহ মৃতদেহ গোসলের ব্যবস্থা রয়েছে। মসজিদটির দাতা সদস্য পান্না বলেন, শুরু থেকেই ৬-৭ লাখ টাকা বিদ্যুৎ বিল বকেয়া রয়েছে। প্রায় দেড় মাস আগে লাইন কেটে দেওয়া হয়েছে। এখন অন্ধকারে মোমবাতি জ্বালিয়ে নামাজ আদায় করা হচ্ছে। এলাকার যুব সমাজের উদ্যোগে একটি প্রিপেইড লাইন আনার চেষ্টা চলছে। তৃতীয় রমজান পর্যন্ত আমরা অন্ধকারেই নামাজ পড়ছি। রমজান মাসে মডেল মসজিদে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় মুসল্লিদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। মোহাম্মদ সালাম মিয়া নামের স্থানীয় এক মুসল্লি জানান, সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করে ফেলেছে কত রাঘববোয়ালরা, আর মসজিদের বিলের জন্য লাইন কেটে দিয়েছে। মোমের আলোয় নামাজ পড়তে হচ্ছে। প্রশাসনের উদ্যোগে দ্রুত এর সমাধান চাই। ইউএনও রেজওয়ানা আফরিন বলেন, আমি জানতে পেরেছি যে মসজিদের প্রায় ৭ লাখ টাকার বেশি বিদ্যুৎ বিল বকেয়া রয়েছে। পল্লী বিদ্যুতের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা জানিয়েছে জেলা পর্যায়ে কথা বলে ব্যবস্থা নেবে। যেহেতু বিপুল পরিমাণ বকেয়া, সে জন্য উচ্চপর্যায়ে আলোচনা করতে হবে। তিনি আরও বলেন, মসজিদ নির্মাণের পর থেকে কোনো বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করা হয়নি। হস্তান্তরের পর স্থানীয়ভাবে বিল পরিশোধের কথা ছিল, এর জন্য আলাদা কোনো সরকারি বরাদ্দ নেই। মসজিদটি বড় পরিসরের এবং উপজেলা সদর থেকে দূরে হওয়ায় বিষয়টি জানতে দেরি হয়েছে। এখানে এসি ও লাইটের সংখ্যা বেশি হওয়ায় বিলও বেশি আসে। আমি বিষয়টি নিয়ে কথা বলব এবং কোনো বরাদ্দ বা ব্যবস্থা করা যায় কি না তা দেখব। আশা করি, সুরাহা হবে। মসজিদের বিদ্যুতের লাইন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির নয় বলে জানান নালিতাবাড়ী উপজেলা পল্লী বিদ্যুতের এজিএম হাবিব। তিনি বলেন, মডেল মসজিদের সংযোগটি পল্লী বিদ্যুতের লাইন নয়, এটি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) আওতাধীন লাইন। নালিতাবাড়ী উপজেলার পিডিবির আবাসিক প্রকৌশলী আব্দুল মোমিন বলেন, ৮ লাখ ২৮ হাজার টাকা বকেয়া হওয়ায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এটি এসটি লাইন হওয়ায় ব্যবহার না করলেও মাসে ১৫ হাজার টাকার বেশি ডিমান্ড চার্জ আসে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সঙ্গে কথা হলেও তারা কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা এসেছে, মডেল মসজিদগুলো বিল দিতে না পারলে প্রিপেইড মিটারে সংযোগ দেওয়া হবে। সংযোগ বিচ্ছিন্নের আগে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু কোনো সাড়া না পাওয়ায় লাইন কাটা হয়েছে। আমাদের উপর অর্পিত দায়িত্বটুকু আমরা পালন করছি। উপজেলা ইসলামিক ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা যায়, নালিতাবাড়ী উপজেলার বাঘবেড় ইউনিয়নের রানীগাঁও এলাকায় নির্মিত এই মডেল মসজিদে একজন পেশ ইমাম, একজন মুয়াজ্জিন ও দুজন খাদেম কর্মরত আছেন। তাদের সম্মানী ইসলামিক ফাউন্ডেশন বহন করলেও বিদ্যুৎ বিল, পরিচ্ছন্নতা ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় মুসল্লিদের দানের অর্থ থেকেই মেটাতে হয়। শেরপুর ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক এস এম মোহাই মোনুল ইসলাম বলেন, মডেল মসজিদের নিয়ম হলো প্রতি মাসে ১০০ ইউনিট পর্যন্ত বিল সরকার বহন করবে, বাকিটা স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করতে হবে। ১০০ ইউনিটের বিল দেড় থেকে দুই হাজার টাকা হয়। কিন্তু এই মসজিদে প্রতি মাসে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা বিল আসে। এ বিষয়ে সরকারি কোনো সমাধান আসেনি। তিনি আরও বলেন, আমরা বিদ্যুৎ বিভাগকে বলেছিলাম রমজান মাস বিবেচনায় কিছুটা ছাড় দিতে বা ১০-১৫ হাজার টাকা নিয়ে সংযোগ চালু রাখতে কিন্তু তারা রাজি হয়নি। তারা মৌখিকভাবে জানিয়েছিল যে বিল না দিলে সংযোগ কেটে দেবে। আমি আমার দফতরে বিষয়টি অবগত করেছি। মো. নাঈম ইসলাম/এমএন/জেআইএম