ইসলামের প্রথম খলিফা যেভাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন

৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তেকালের পর মদীনার আকাশে শোকের কালো ছায়া নেমে আসে।প্রিয়তম নেতাকে হারানোর শোকে সাহাবায়ে কেরাম এতটাই বিমূঢ় হয়ে পড়েছিলেন যে, হযরত উমর (রাঃ)-এর মতো পাহাড়সম দৃঢ় ব্যক্তিত্বও আবেগাপ্লুত হয়ে তলোয়ার উঁচিয়ে বলেছিলেন,  যে বলবে নবীজি মারা গেছেন, আমি তার শিরশ্ছেদ করব। এমন চরম সংকটময় মুহূর্তে ইসলামের ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন হযরত আবু বকর (রা.)। তিনি অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে পবিত্র কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করে সাহাবীদের বুঝিয়ে দেন যে, নবীজি সা. একজন মানুষ হিসেবে নশ্বর ছিলেন, কিন্তু তাঁর আদর্শ ও দ্বীন অবিনশ্বর। নবীজির দাফনকার্য সম্পন্ন হওয়ার আগেই মুসলিম উম্মাহর ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে এক জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মদীনার আনসার সাহাবীরা ‘সাকিফা বনু সায়েদাহ’ নামক স্থানে একত্রিত হয়ে নিজেদের মধ্য থেকে নেতা নির্বাচনের উদ্যোগ নেন। খবর পেয়ে আবু বকর (রা.), উমর (রা.) ও আবু উবায়দা (রা.) সেখানে উপস্থিত হন। সেখানে আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা ও যুক্তি-তর্ক হয়। আনসাররা আরবের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ইসলামে তাদের ত্যাগের কথা বিবেচনা করে নেতৃত্বের দাবি তুললেও, আবু বকর (রা.) অত্যন্ত প্রজ্ঞার সাথে বুঝিয়ে বলেন যে, আরবের সামগ্রিক ঐক্যের স্বার্থে কুরাইশদের নেতৃত্বই সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। তর্কবিতর্কের এক পর্যায়ে আবু বকর (রা.) নিজেই হযরত উমর (রা.) ও আবু উবায়দা (রা.)-এর নাম প্রস্তাব করেন। কিন্তু উমর (রা.) কালক্ষেপণ না করে ইসলামের প্রতি আবু বকর (রা.)-এর আজীবন ত্যাগ, নবীজির গুহাসঙ্গী হওয়া এবং তার অসুস্থকালীন সময়ে নামাজের ইমামতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আবু বকর (রা.)-এর হাতেই প্রথম বায়আত বা আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেন। এরপর উপস্থিত সকল আনসার ও মুহাজির সাহাবী স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাকে নেতা হিসেবে মেনে নেন। আরও পড়ুন: সেহরি না খেয়ে কি রোজা রাখা যাবে? পরদিন মসজিদে নববীতে সাধারণ মুসলমানদের উপস্থিতিতে এই নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি মেলে। খলিফা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি এক কালজয়ী বক্তব্যে স্পষ্ট করে দেন যে, ইসলামে নেতৃত্ব কোনো রাজতন্ত্র বা একনায়কতন্ত্র নয়, বরং এটি একটি পবিত্র আমানত ও জবাবদিহিতার জায়গা। তিনি নিজেকে সাধারণ মানুষের ঊর্ধ্বে মনে না করে ভুল করলে সংশোধন করে দেওয়ার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। আবু বকর (রা.)-এর এই খিলাফত লাভ ছিল ইসলামের ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণ। কোনো বংশীয় উত্তরাধিকার নয়, বরং পরামর্শ বা শূরার ভিত্তিতে যোগ্যতম ব্যক্তিকে নির্বাচনের যে দৃষ্টান্ত সেদিন স্থাপিত হয়েছিল, তা পরবর্তীকালের ইসলামী শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁর এই সময়োচিত নেতৃত্ব উম্মাহকে গৃহযুদ্ধ ও বিভক্তি থেকে রক্ষা করে এক শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ পথের দিশা দেয়।