মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের ভূখণ্ড সম্প্রসারণ নিয়ে মন্তব্য করে আরব ও মুসলিম দেশগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন ইসরাইলে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি।শুক্রবার মার্কিন সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার টাকার কার্লসন-এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ইসরাইলের সীমান্ত বিস্তার নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেন হাকাবি। সাক্ষাৎকারে কার্লসন বাইবেল অনুযায়ী ইউফ্রেটিস নদী (ইরাক) থেকে নীলনদ (মিশর) পর্যন্ত বিস্তৃত ভূমি ইব্রাহিমের বংশধরদের জন্য প্রতিশ্রুত—এই ধারণা নিয়ে হাকাবির অবস্থান জানতে চান। জবাবে হাকাবি বলেন, ‘ওরা সবটাই নিলে তাতেও সমস্যা নেই।’ তার এই বক্তব্য বাস্তবে বর্তমান লেবানন, সিরিয়া, জর্ডান ও সৌদি আরবের কিছু অংশকে অন্তর্ভুক্ত করে এমন একটি বিশাল ভূখণ্ড দখলের ইঙ্গিত দেয়। তবে পরক্ষণেই হাকাবি বলেন, তার মন্তব্য কিছুটা অতিরঞ্জিত। তিনি দাবি করেন, ইসরাইল বর্তমানে যে ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণে রেখেছে, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অধিকার রাখে, তবে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেই। বিশ্লেষকরা বলছেন, এমন মন্তব্য আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বিপজ্জনক বার্তা বহন করে। হাকাবির এই বক্তব্যে স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন আরব ও মুসলিম দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাও। আরও পড়ুন: ইসরাইল পুরো মধ্যপ্রাচ্য দখল করলেও ‘সমস্যা নেই’: মার্কিন রাষ্ট্রদূত মিশর ও জর্ডান, সৌদি আরব, ইসলামিক কোঅপারেশন সংস্থা এবং আরব লীগ পৃথক পৃথক বিবৃতিতে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এই মন্তব্যকে ‘চরমপন্থী’, ‘উস্কানিমূলক’ এবং ‘ওয়াশিংটনের সরকারি অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হাকাবির মন্তব্যকে ‘চরমপন্থি বক্তব্য’ ও ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছে। সেই সঙ্গে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি স্পষ্ট করার আহ্বান জানিয়েছে। মিশরীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মন্তব্যগুলোকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন’ হিসেবে অভিহিত করেছে এবং যোগ করেছে, ‘দখলকৃত ফিলিস্তিন বা অন্যান্য আরব ভূখণ্ডে ইসরাইলের কোনো সার্বভৌম অধিকার নেই।’ জর্ডানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, মন্তব্যগুলো ‘অসঙ্গত ও উস্কানিমূলক’, কূটনৈতিক নিয়মের লঙ্ঘন এবং ‘এই অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ’। আরব রাষ্ট্র লীগের বক্তব্য, ‘এ ধরনের বক্তব্য — চরমপন্থি ও ভিত্তিহীন — এ ধরনের বক্তব্য কেবল উসকানি সৃষ্টি করে এবং ধর্মীয় ও জাতীয় আবেগকে উত্তেজিত করে।’ আরও পড়ুন: গ্রিনল্যান্ডে কেন ভাসমান হাসপাতাল পাঠানোর ঘোষণা ট্রাম্পের? হাকাবিকে ২০২৪ সালে ইসরাইলে মার্কিণ রাষ্ট্রদূত হিসেবে মনোনীত করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এই কূটনীতিক দীর্ঘদিন ধরে ইসরাইল-প্যালেস্টাইন দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের বিরোধী। তিনি পশ্চিম তীরের অবৈধ দখলকেও অস্বীকার করেছেন এবং ২০০৮ সালে প্যালেস্টাইনের পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক বিচারালয় রায় দেয়, ইসরাইলের প্যালেস্টাইনি ভূখণ্ড দখল অবৈধ এবং তা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। তবে ইসরাইলের আইনে দেশটির সীমানা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা নেই। তারা সিরিয়ার গোলান হাইটসও অবৈধভাবে দখল করে এবং ১৯৮১ সালে তা নিজেদের দেশের সঙ্গে একীভূত করে। যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র দেশ যারা ২০১৯ সালে গোলান হাইটসে ইসরাইলি দখলের স্বীকৃতি দিয়েছে। ২০২৪ সালে হেজবোল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধের পর ইসরাইল লেবাননের পাঁচটি স্থানে সামরিক স্থাপনা গঠন করেছে। কিছু ইসরাইলি রাজনীতিবিদ, যার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও রয়েছেন, ‘গ্রেটার ইসরাইল’ অর্থাৎ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বারবার সীমান্ত সম্প্রসারণের কথা বলছেন।