সংসদীয় চারটি আসন নিয়ে গঠিত উত্তরের শিল্প-বাণিজ্যে সমৃদ্ধ জেলা নীলফামারী। সৈয়দপুর বিমানবন্দর, উত্তরা ইপিজেড ও দেশের বৃহত্তর রেলওয়ে কারখানা এ জেলায় অবস্থিত। বরাবরই আসনগুলো ছিল জাতীয় পার্টির দখলে। সে কারণে নীলফামারী ‘লাঙ্গলের ঘাঁটি’ ছিল। কিন্তু এবারের নির্বাচনে নিজ দুর্গেই দুর্গতিতে পড়েছে দলটি। অন্তর্কোন্দলের কারণে পরাজয় বরণ করেছে বিএনপি। ফলে চারটি আসনেই জয় পেয়েছে জামায়াতে ইসলামী। স্থানীয় ভোটার ও বিভিন্ন দলের নেতারা বলছেন, এই জয়ের ক্ষেত্রে টার্নিং পয়েন্ট ছিল জামায়াতের আমিরের প্রতিটি সংসদীয় আসনে জনসভা। স্থানীয় নেতাকর্মীদের ভূমিকাও অনেক। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পরপরই মাঠে নামে দলটি। অনেক আগে থেকেই দলের একক প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। দল মনোনীত প্রার্থীকে সমর্থন জানিয়ে সবাই শুরু করেন নির্বাচনি কার্যক্রম। একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশী বা বিদ্রোহী প্রার্থী কোনো আসনেই দেখা যায়নি। অন্যদিকে জাতীয় পার্টিতে কোন্দল-বিভক্তি, বিতর্কিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলোতে অংশগ্রহণসহ নানা কারণে তারা আস্থার সংকটে পড়েন। এ অবস্থায় সুযোগ হাতছাড়া করেনি জামায়াত। সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দুর্গ ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে দলটি। এছাড়া বিএনপির মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল, অসহনীয় আচরণ, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে দলটি পিছিয়ে পড়েছে। সবকয়টি আসনে দ্বিতীয় স্থানে জায়গা হয়েছে তাদের। তবে বিএনপির এমন পরাজয়ের কারণ হিসেবে দলের নেতারা মনে করছেন, দলের হাইকমান্ড থেকে প্রার্থী বাছাই ভুল ছিল। নীলফামারী-১ (ডোমার-ডিমলা) আসনে প্রয়াত খালেদা জিয়ার আপন ভাগনে এবং তারেক রহমানের খালাতো ভাই সাবেক সংসদ সদস্য প্রকৌশলী শাহরিন ইসলাম তুহিন এ আসনে অনেক আগে থেকে নির্বাচনি কর্মকাণ্ডে এগিয়ে ছিলেন। তার পক্ষে এক ধরনের জোয়ারও লক্ষ্য করা গেছে। কিন্তু বিএনিপর সঙ্গে জোটের কারণে এ আসনে জমিয়েত উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দীকে প্রার্থী করা হয়। এ কারণে আসনটি হারায় বিএনপি। নীলফামারী-২ (সদর) আসনে প্রার্থী ছিলেন এসএম সাইফুল্লাহ রুবেল। একেবারে মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষদিনে তাকে পরিবর্তন করে শাহরিন ইসলাম তুহিনকে প্রার্থী করা হয়। ফলে এতে অনেকের মন ভেঙে যায়। সমর্থক ও সাধারণ ভোটাররা বিভক্ত হয়ে পড়েন। ফলে হাতছাড়া হয়েছে আসনটি। নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ) আসনে দুজন বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় বিএনপির পরাজয়ের অন্যতম কারণ। ভোটের পরিসংখ্যান বলছে, নীলফামারী-১ (ডোমার-ডিমলা) আসনে মোট আটজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এরমধ্যে বিএনপি জোটের হেভিওয়েট প্রার্থী ছিলেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশে মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দি (খেজুর গাছ)। তিনি ভোট পান এক লাখ ১৯ হাজার ৫৯। তবে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুস সাত্তার (দাঁড়িপাল্লা) এক লাখ ৫০ হাজার ৮২৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। ভোটাররা বলছেন, এই আসনটি কোনো সময়ই জামায়াতের অনুকূলে ছিল না। কিন্তু এবারই প্রথম প্রার্থী হয়ে জামায়াতের জেলা আমির আব্দুস সাত্তার বাজিমাত করেছেন। নীলফামারী-২ (সদর) আসনে মোট প্রার্থী ছিলেন ছয়জন। এর মধ্যে জীবনে প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয়ী হয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আল ফারুক আব্দুল লতিফ। তিনি এক লাখ ৪৬ হাজার ৪৩০ ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষের প্রার্থী বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের খালাতো ভাই ইঞ্জিনিয়ার শাহরিন ইসলাম চৌধুরী তুহিন। তিনি পেয়েছেন এক লাখ ৩৫ হাজার ৪১৮ ভোট। নীলফামারী-৩ (জলঢাকা) আসনে তৃতীয়, সপ্তম ও অষ্টম সংসদ নির্বাচনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপর দীর্ঘদিন পর আবার আসনটি উদ্ধার করলো দলটি। এ আসনে জামায়াত প্রার্থী মাওলানা ওবায়দুল্লাহ সালাফী এক লাখ ৯ হাজার ৬৮৬ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রার্থী ছিলেন বিএনপির সৈয়দ আলী। তিনি পেয়েছেন ৮৯ হাজার ৮০৭ ভোট। নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর, কিশোরীগঞ্জ) আসনে এবার প্রার্থী ছিলেন ৯ জন। এরমধ্যে জীবনে প্রথমবারের মতো প্রার্থী হয়ে জামায়াতের হাফেজ আব্দুল মুনতাকিম এক লাখ ২৬ হাজার ২২২ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির আব্দুল গফুর সরকার পেয়েছেন ৮২ হাজার ৮৬। এ আসনটি কোনো সময় জামায়াতের অনুকূলে ছিল না। বিগত ১২টি নির্বাচনে মাত্র দুবার প্রার্থী দেয় জামায়াত। নাগরিক কমিটির সভাপতি আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, ‘নীলফামারীর চারটি সংসদীয় আসনে জামায়াতের প্রার্থীরা জয়ী হওয়ায় এ অঞ্চলে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের বার্তা মিলছে। বিএনপির সঙ্গে লড়াইয়ে বড় ব্যবধানে জয় আর জাতীয় পার্টির আসনশূন্য অবস্থান আগামীতে এখানকার রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা জাগো নিউজকে বলেন, ‘দলের মধ্যে বিভক্তি, একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী ও জনপ্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় আমাদের পরাজয় হয়েছে। এবারের নির্বাচনের ফলাফলের পরিসংখ্যানটা আমাদের জন্য উদ্বেগের। শুধু তাই নয়, বিষয়টি কষ্টকরও। আমরা কারণ খুঁজে বের করছি। একইসঙ্গে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি।’ নীলফামারীর-৪ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য হাফেজ আব্দুল মুনতাকিমের ভাষ্য, ১৭ বছর জুলুম-নির্যাতনের পর ফ্যাসিস্টদের পতনে দেশের মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরে আসে। এই স্বস্তিকে দেশগঠনের কাজে লাগাতে জনগণ দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিয়েছে। জেলা জামায়াতের আমির ও নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে কোণঠাসা ছিলেন জামায়াতের নেতা-কর্মীরা। এতদিন তারা ভোটারদের কাছে টানার সব কৌশল প্রয়োগ করেছেন। বিএনপির অদূরদর্শিতা, অভ্যন্তরীণ কোন্দল আর জাতীয় পার্টির প্রতি ক্ষোভ থেকে ভোটাররা এবার জামায়াতকেই বেছে নিয়েছেন। আমরা তাদের ভোটের আমানতকে রক্ষা করবো।’ আমিরুল হক/এসআর/এমএস