তিস্তা নদীর উত্তাল স্রোত আর ভাঙন যেন প্রতিদিনের সঙ্গী। নাগরিক সুবিধার অপেক্ষাকৃত বঞ্চনা, দারিদ্র্য আর সুযোগের সীমাবদ্ধতা নিয়ে বেড়ে ওঠা চরাঞ্চলের শিশুদের জীবন। কিন্তু এক তরুণের অদম্য স্বপ্ন আর অসাধারণ কর্মপ্রয়াস সেই জীবনপথের গতিপথই পাল্টে দিচ্ছে। শিক্ষার আলো সবাই পাক সবাই নিজেকে গড়ে তুলুক। এমন আশা থেকেই শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে - লালমনিরহাটের মো. নাঈম রহমান গড়ে তুলেছেন ‘লালমনি বিদ্যাপীঠ’ একটি অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা কেন্দ্র, যার আলোয় উদ্ভাসিত হচ্ছে তিস্তার চরের শত শত শিশু ও তরুণের ভবিষ্যৎ।লালমনিরহাট শহর থেকে দূরের তিস্তার বিস্তৃত চরাঞ্চলের মেধাবী কিন্তু সুযোগবঞ্চিত শিশুদের জীবনচিত্র ছোটবেলা থেকেই নাঈম রহমানকে নাড়া দিত। পড়াশোনার পাশাপাশি ২০১৬ সাল থেকে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তিনি দেখেন, অনেক শিশু স্কুলে ভর্তি হলেও দিকনির্দেশনা ও সচেতনতার অভাবে ধীরে ধীরে ঝরে পড়ছে। ‘চরাঞ্চলের শিশুরা মেধায় পিছিয়ে নয়, পিছিয়ে সুযোগের অভাবে,’ বলেন নাঈম।মো. নাঈম রহমান, যিনি শুধু ‘লালমনি বিদ্যাপীঠ’ প্রতিষ্ঠা করেই ক্ষান্ত হননি, বরং জেলা ও জাতীয় পর্যায়ের একাধিক সামাজিক সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়ে যুবসমাজকে সংগঠিত করছেন। স্কুলজীবনে স্কাউটিংয়ের মাধ্যমে যে সামাজিক দায়িত্ববোধবোধের বীজ রোপিত হয়েছিল, তা আজ বিশাল বটবৃক্ষে রূপ নিয়েছে।নাঈম রহমানের সামাজিক কর্মের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল স্কুলবেলা থেকেই। তিনি লালমনিরহাট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্কাউটিংয়ের সাথে যুক্ত হন এবং দশম শ্রেণি পর্যন্ত এই কার্যক্রম চালিয়ে যান। এই সময়েই তিনি সমাজসেবার প্রাথমিক পাঠ গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে একই বিদ্যালয়ে তিনি স্টুডেন্ট কেবিনেট নির্বাচনে নির্বাচিত হয়ে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন, যা তার নেতৃত্বগুণ ও সংগঠন ক্ষমতার প্রথম প্রকাশ।করোনা মহামারীকালেও ঘরে বসে থাকেননি নাঈম রহমান ‘শ্বাস নিবে লালমনিরহাট’ স্লোগান নিয়ে জীবনবাজি রেখে কাজ করেছেন। তার নেতৃত্বে যুবকেরা বিনামূল্যে অক্সিজেন সেবা প্রদান, মাস্ক ও সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করে জেলাবাসীর প্রাণরক্ষায় অনন্য ভূমিকা পালন করেন।অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে নাঈম রহমানের নেতৃত্বে গত কয়েক বছরে লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের বন্যাদুর্গত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ, মাসব্যাপী ফ্রি ইফতার বুথ পরিচালনা, ৬৯ দিনব্যাপী দীর্ঘতম মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজন এবং লালমনি বই বিনিময় উৎসবসহ অর্ধশতাধিক সামাজিক কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছে।আরও পড়ুন: কে ভোট দিয়েছে আর কে দেয়নি, সেটি এখন বিবেচ্য নয়: দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রী২০২১ সাল থেকে সরকারি অনুমোদন ও জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সামাজিক সংগঠন স্বপ্নযাত্রী ফাউন্ডেশনের লালমনিরহাট জেলা শাখার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এর সাথে যুক্ত রয়েছেন নাঈম রহমান। তিনি প্রথমে শাখাটির সদস্য সচিব এবং পরবর্তীতে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে সংগঠনটির কার্যক্রম সফলভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তার এই নেতৃত্বে ফাউন্ডেশনটি জেলায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দুর্যোগ সহায়তামূলক ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে।নাঈম রহমানের সংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় মেলে বিভিন্ন পর্যায়ে। তিনি বসুন্ধরা গ্রুপের সামাজিক সংগঠন বসুন্ধরা শুভ সংঘের লালমনিরহাট সরকারি কলেজ শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি এই সংগঠনের লালমনিরহাট জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেন এবং সাম্প্রতিক সময়ে পুনরায় একই পদে নির্বাচিত হয়ে জেলাজুড়ে সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।তাঁর দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে লালমনিরহাট জেলার অর্ধশতাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নিয়ে গঠিত সম্মিলিত স্বেচ্ছাসেবী পরিষদের তিনি সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যা জেলার সামাজিক কার্যক্রমের সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।লালমনি বিদ্যাপীঠ: একটি বৈপ্লবিক শিক্ষা আন্দোলন ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে প্রতিষ্ঠিত 'লালমনি বিদ্যাপীঠ' নাঈম রহমানের স্বপ্নের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রকাশ। তিস্তার চরাঞ্চলের সুযোগবঞ্চিত শিশুদের জন্য গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠান প্রচলিত শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে সামাজিক সচেতনতা, মানবিক মূল্যবোধ, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এখানে বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও মাদক প্রতিরোধ থেকে শুরু করে প্রযুক্তি শিক্ষার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়।নাঈমের নেতৃত্বে লালমনি বিদ্যাপীঠ ইতিমধ্যে ৮০০-এর বেশি নিম্নআয় পরিবারকে বাল্যবিবাহ না দেওয়ার অঙ্গীকার করাতে সক্ষম হয়েছে। পরিচালিত হয়েছে অর্ধশতাধিক সচেতনতা ক্যাম্পেইন। স্কুল থেকে ঝরে পড়া শিশুকেই ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।এ নিয়ে একজন অভিভাবক ফাতেমা আক্তার বলেন, ‘লালমনি বিদ্যাপীঠ শুধু আমাদের সন্তানকে পড়ায় না, তাকে মানুষ হওয়ার পথ দেখায়। এখানে আসার পর আমার মেয়ের মধ্যে আশা আর স্বপ্ন দেখার সাহস তৈরি হয়েছে।’ এরকম অসংখ্য গল্প এখন তিস্তার চরে মুখরিত।লালমনি বিদ্যাপীঠের এই সফলতা শুধু একটি স্থানীয় উদ্যোগের গল্প নয়; এটি একটি প্রমাণ যে দেশের প্রত্যন্ত ও অবহেলিত অঞ্চলেও তরুণদের নেতৃত্ব ও উদ্ভাবনী চিন্তা কীভাবে টেকসই সামাজিক পরিবর্তন আনতে পারে। নাঈম রহমান ও তার বিদ্যাপীঠের এই প্রচেষ্টা বাংলাদেশের শিক্ষা ও সমাজ উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।আরও পড়ুন: একে একে ছেড়ে গেলেন ৩ স্ত্রী, দুধ দিয়ে গোসল করে ‘ব্যাচেলর’ থাকার ঘোষণা আনোয়ারের!নাঈম রহমানের লক্ষ্য লালমনি বিদ্যাপীঠের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করে তিস্তা চরের প্রতিটি শিশুর কাছে পৌঁছানো। তিনি বলেন, ‘স্কুল পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের মানবিক কাজের চর্চায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। আমি স্বপ্ন দেখি, দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তরুণরা একযোগে সামাজিক দায়বদ্ধতার সাথে এগিয়ে আসবে।’