অন্তত তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটিতে সংশ্লিষ্ট এমপিকে চেয়ারম্যান করা, এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ, আগের মতো প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগসহ ১৩ দফা দাবি জানিয়েছেন বিএনপিপন্থি শিক্ষক নেতারা। শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান ও বিএনপির গণশিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক নব-নির্বাচিত সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মো. সেলিম ভূঁইয়ার নেতৃত্বে রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এসব দাবি জানিয়েছেন তারা। ১. শিক্ষা কারিকুলাম: শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হচ্ছে একটি উন্নত কারিকুলাম। তাই আমাদের দাবি, সর্বাগ্রে একটি যুগোপযোগী কারিকুলাম প্রণয়ন করতে হবে। ২. শিক্ষক কর্মচারীদের চাকরি জাতীয়করণ: মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষক কর্মচারীরা নানাভাবে বঞ্চনা ও নির্যাতনের শিকার। তাদের চাকরির নিরাপত্তা, আর্থিক নিশ্চয়তা, সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে না পারলে কোনোভাবেই শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ২০১০ সালের ১২ এপ্রিল শিক্ষক কর্মচারীদের চাকরি জাতীয়করণের ঘোষণা দেন। আমাদের দাবি, অনতিবিলম্বে শিক্ষক কর্মচারীদের চাকরি জাতীয়করণ করতে হবে। ৩. অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্ট গতিশীল করা: শিক্ষক কর্মচারীরা জাতি গঠনের কারিগর। শিক্ষক কর্মচারীরা নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে স্বল্প বেতনে চাকরি করে অবসর গ্রহণ করতেন। বেগম খালেদা জিয়া জনগণের ভোটে সরকার গঠনের পর ২০০১ সালে শিক্ষক কর্মচারীদের অবসর সুবিধা দেন এবং কল্যাণ ট্রাস্ট গতিশীল করেন। অবসর সুবিধা তহবিল ও কল্যাণ ট্রাস্ট তহবিলে পর্যাপ্ত পরিমাণ অর্থ দেন, ফলে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকরা দ্রুত তাদের প্রাপ্য টাকা পেয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে ন্যূনতম জীবন ধারনের অবলম্বন খুঁজে পেতেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় বিগত ১৭ বছরে ফ্যাসিস্ট সরকার এই দুটি তহবিলে কোনো অর্থায়ন করেনি উপরন্তু গচ্ছিত তহবিল নানাভাবে তছরূপ করেছেন। বর্তমানে প্রায় ৮০-৯০ হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অবসরের টাকা না পেয়ে মানবেতর জীবন যাপন করেছেন। অনেকে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করেছেন। এমতাবস্থায় তাদের দাবি (১) সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দুর্নীতিবাজদের বিচারের মুখোমুখি করা এবং (২) পর্যাপ্ত তহবিল বরাদ্দ দিয়ে অবিলম্বে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের দুঃখ দুর্দশা লাঘবে পদক্ষেপ গ্রহণ করা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট সরকার গঠনের পর অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের কমিটির দুর্নীতিবাজরা পলায়ণ করেন। পরিতাপের বিষয় অদ্যাবধি কমিটি গঠন না করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নানারূপ টালবাহানা করে। শিক্ষকদের প্রাপ্য অর্থ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। আমরা আরও অবগত হয়েছি যে, বেসরকারি শিক্ষকদের দ্বারা বোর্ড গঠনের পরিবর্তে সরকারি শিক্ষকদের মাধ্যমে অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের কমিটি গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করার পাঁয়তারা করছেন। এ ধরনের উদ্যোগ কোনোভাবেই শিক্ষক সমাজ মেনে নেবে না। অনতিবিলম্বে তাদের সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের কমিটি গঠনের জোর দাবি জানাচ্ছি। ৪. ম্যানেজিং কমিটি: শিক্ষার পরিবেশ সুষ্ঠু রক্ষার স্বার্থে ম্যানেজিং কমিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যেমন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের দ্বরা কমিটি গঠন করলে কমিটির দক্ষতা ও শিক্ষার মান বৃদ্ধি পাবে। অবিলম্বে ম্যানেজিং কমিটি গঠনের নীতিমালা প্রণয়নের জোর দাবি জানাচ্ছি। ৫. শিক্ষক কর্মচারীদের জন্য পৃথক বেতন স্কেল চালু করা: শিক্ষার মান বৃদ্ধি করতে হলে মেধাসম্পন্ন শিক্ষকের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু বর্তমানে একজন শিক্ষকের স্কেল ১২ হাজার ৫০০ টাকা, যা অত্যন্ত নগন্য নয়, বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে একজন শিক্ষককে পরিহাস করার শামিল। তাই অবিলম্বে শিক্ষক কর্মচারীদের জন্য পৃথক বেতন স্কেল চালু করতে হবে। ৬. বাড়িভাড়া, উৎসব ভাতা, চিকিৎসা ভাতা ও প্রাপ্তি বিনোদন ভাতা: বর্তমানে শিক্ষকদের মাত্র ৭ শতাংশ বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়। এই সামান্য অর্থ কোনোভাবেই বাড়িভাড়া পাওয়া সম্ভব না। এছাড়া শিক্ষক কর্মচারীদের চিকিৎসা ভাতা মাত্র ৫০০ টাকা। এত কম টাকায় কোনো ডাক্তার পাওয়া যায় না। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ২০০৪ সালে শিক্ষকদের জন্য ২৫ শতাংশ এবং কর্মচারীদের জন্য ৫০ শতাংশ উৎসব ভাতা দিয়েছিলেন। ফ্যাসিস্ট সরকার ১ শতাংশও বৃদ্ধি করেনি। অবশেষে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শিক্ষকদের জন্য ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি করেন। কিন্তু কর্মচারীদের জন্য কোনো বৃদ্ধি করা হয়নি। শিক্ষক কর্মচারীদের সরকারি নিয়মে বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা, পূর্ণাঙ্গ উৎসব ভাতা ও শান্তি বিনোদন ভাতা দেওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি। ৭. এনটিআরসিএর নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছকরণ: অনাগত শিক্ষকদের গুণগত মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে এনটিআরসিএ প্রতিষ্ঠা ছিল বিএনপি সরকারের একটি অনন্য উদ্যোগ। কিন্তু সেই এনটিআরসিএ-কে একটি দুর্নীতির আখড়া হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। নিয়োগ বাণিজ্য, নিয়োগ অনিয়ম, সনদ প্রদানে অনিয়মসহ নানাবিধ দুর্নীতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে অকার্যকর করে তোলা। সম্প্রতি বেশি বাণিজ্য করার জন্য প্রিন্সিপাল, ভাইস প্রিন্সিপাল, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ লাভের ক্ষমতা কব্জা করে নিয়েছে। ১-১২তম নিবন্ধনধারীদের নানা অপকৌশলে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়োগ দান না করে জাল সনদের মাধ্যমে অনেককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অবিলম্বে ১-১২তম ব্যাচের যোগ্যতা সম্পন্নদের নিয়োগ দেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি। ৮. দক্ষ শিক্ষা প্রশাসন গড়ে তোলা: বিগত সময়ে ফ্যাসিষ্ট সরকার, অসৎ অযোগ্য ও দুর্নীতিবাজদের নিয়োগের মাধমে শিক্ষা প্রশাসনকে সম্পূর্ণ দলীয়করণ ও অদক্ষ করে তোলা হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থায় গুণগত মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ও বেসরকারি শিক্ষকদের সমন্বয়ে দক্ষ শিক্ষা প্রশাসন গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছি। ৯. চাকরিচ্যুত শিক্ষকদের পুনর্বহাল ও আর্থিক ক্ষতিপূরণ: বিগত ফ্যাসিবাদ সরকারের দলীয়করণে কিংবা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার ফলে স্কুল, কলেজ, মাদরাসার ও কারিগরি অসংখ্য শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে। সকল চাকরিচ্যুতদের পুনর্বহাল ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য জোর দাবি জানাচ্ছি। ১০. স্বীকৃতি প্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা: বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার দলীয় বিবেচনায় বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করলেও যোগ্যতাসম্পন্ন বহু প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করা হয়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এমপিও ভুক্ত করার একটি উদ্যোগ নিলেও তা সফল হয়নি। বিএনপিজোট সরকারের সময়ে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে এমপিও থেকে বঞ্চিত হয়েছে, অথচ শেখ পরিবারের নামে গড়ে উঠা নাম সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি হয়েছে। এমতাবস্থায় দ্রুত নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার জোর দাবি জানাচ্ছি। ১১. কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নে পদক্ষেপ নেওয়া: দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হলে কারিগরি শিক্ষার ওপর অধিকতর গুরুত্বারোপ করতে হবে। কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নে আশু করণীয়গুলো হলো- ১) এইচএসসি (বিএম কোর্স খোলা); ২) ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং এর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এমপিওভুক্ত করা; ৩) কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা এবং ৪) কারিগরি শিক্ষকদের দেশে/বিদেশে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা। ১২. প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা: শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ১৩. কিন্ডারগার্টেনগুলোকে রেজিস্ট্রেশনের আওতাভুক্ত করা: বর্তমানে দেশে অজস্র কিন্ডারগার্টেন ব্যাঙের ছাতার ন্যায় গড়ে উঠেছে। সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আনতে হবে। এএএইচ/এমআরএম