যমুনা অয়েল কোম্পানির নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ডিপোতে সোয়া লাখ লিটার ডিজেল উধাও হয়ে যায়। বিপিসির তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রায় দুই মাস আগে প্রতিবেদন জমা দিলেও বিপিসি কিংবা যমুনা অয়েল কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেয়নি। প্রতিবেদনে ক্যালিব্রেশন কোম্পানির মিথ্যা ক্যালিব্রেশন রিপোর্ট দিয়ে তেল চুরির আগাম চেষ্টা, যমুনা অয়েলের সিবিএ নেতার দৌরাত্ম্য, সিডিপিএল প্রকল্পে অটোমেশন প্রক্রিয়ায় জটিলতা, কর্মকর্তাদের গাফিলতি চিত্র এসেছে। এ নিয়ে জাগো নিউজের নিজস্ব প্রতিবেদক ইকবাল হোসেনের তিন পর্বের ধারাবাহিকের প্রথম পর্ব। চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে পাইপলাইন ফুটো করে তেল চুরি হয় কয়েক মাস আগে। তদন্ত প্রতিবেদনে জানা যায়, প্রকল্পের অটোমেশন পদ্ধতি অকার্যকর ছিল। যমুনা অয়েল কোম্পানির ফতুল্লা ডিপোতে সোয়া লাখ লিটার তেল উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনায়ও সিস্টেম অটোমেশন অকার্যকর থাকার বিষয়টি উঠে আসে। ঘটনা দুটি আলাদা হলেও দুটিই চট্টগ্রাম-ঢাকা জ্বালানি পাইপলাইন প্রকল্প সংশ্লিষ্ট। ফতুল্লা ডিপোতে অটোমেশন অকার্যকর থাকায় ট্যাংকে তেল রেখে চুরির আগাম চেষ্টার বিষয়টি পরিষ্কার হয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে। এ নিয়ে ক্যালিব্রেশন সেবা দেওয়া বেসরকারি ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয় প্রতিবেদনে। বিপিসি সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ১ কোটি ৮ লাখ ১৫ হাজার ৬০৮ লিটার তেল পতেঙ্গার প্রধান ডিপো থেকে পাইপলাইনে ফতুল্লায় পাঠানো হয়। ওই চালানে ফতুল্লা ডিপোতে সিডিপিএলের রিসিভিং ট্যাংক ক্যালিব্রেশন করে ১ লাখ ১২ হাজার ৫৬১ লিটার ডিজেল কম পাওয়া যায়। এ ঘটনায় ২ অক্টোবর বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (বণ্টন ও বিপণন) মোহাম্মদ জাহিদ হোসাইনকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত ১১ ডিসেম্বর বিপিসি চেয়ারম্যান বরাবর প্রতিবেদন জমা দেয়। বিপিসির তদন্তে উঠে আসে অটোমেশন অকার্যকরসহ ফতুল্লা ডিপোর নানান অনিয়মের তথ্য। আরও পড়ুন পেট্রোলিয়াম রিফাইনারি বেসরকারিতে দেওয়ার তোড়জোড় ইআরএল-২ প্রকল্পের ব্যয় কমলো ১২ হাজার কোটি টাকা একীভূত হচ্ছে মেঘনা-যমুনা, ইআরএলে যাচ্ছে ইএলবিএল-এসএওসিএল জাহাজ থেকে ট্যাংকে যেতেই উধাও ১৪ কোটি টাকার জ্বালানি তেল পদ্মা, মেঘনার চেয়ে যমুনার ডিপোতে বেশি লস জাগো নিউজের হাতে আসা প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, গত ১২ অক্টোবর তদন্ত কমিটি ফতুল্লা ডিপো পরিদর্শন করে। প্রতিবেদনে যুক্ত সিডিপিএল নিয়োজিত সার্ভেয়ার মেসার্স ট্রাইস্টার সার্ভে লিমিটেডের প্রস্তুত করা সারসংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের ২৩ জুন চট্টগ্রামের পতেঙ্গা ডেসপাস টার্মিনাল (ডিটি) থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে কুমিল্লা ও নারায়গঞ্জে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা অয়েলের ডিপোতে তেল পাঠানো শুরু হয়। ২৩ জুন থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মেঘনা অয়েলে ছয়টি পার্সেলে ৩ কোটি ২৩ লাখ ৬৮ হাজার ৭৭৯ লিটার ডিজেল পাঠানো হয়। কিন্তু রিসিভিং ট্যাংকে (আরটি) তেল পাওয়া যায় ৩ কোটি ২২ লাখ ১৭ হাজার ৫৬৮ লিটার। এতে ১ লাখ ৫১ হাজার ২১১ লিটার হিসেবে শূন্য দশমিক ৪৭ শতাংশ কম পাওয়া যায়। একইভাবে ৪ জুলাই থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পদ্মা অয়েলের ছয়টি পার্সেলে পাঠানো ৩ কোটি ৪৪ হাজার ৫৬১ লিটারের মধ্যে আরটিতে পাওয়া যায় ২ কোটি ৯৯ লাখ ২৫ হাজার ৬৮৫ লিটার। এতে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮৭৬ লিটার হিসেবে শূন্য দশমিক ৪০ শতাংশ তেল কম পাওয়া যায়। কিন্তু যমুনা অয়েলে ২৫ জুন থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাঠানো ৩ পার্সেলে ২ কোটি ৫৩ লাখ ২ হাজার ১৭৫ লিটারের মধ্যে আরটিতে পাওয়া যায় ২ কোটি ৪৮ লাখ ৯৩ হাজার ৫৬ লিটার। এতে ৪ লাখ ৯ হাজার ১১৯ লিটার হিসেবে ১ দশমিক ৬২ শতাংশ কম পাওয়া যায়। অটোমেশন অকার্যকর, হচ্ছে না সঠিক পরিমাপ তদন্ত কমিটির কাছে দেওয়া বক্তব্যে পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন কোম্পানির (পিটিসিপিএলসি) ব্যবস্থাপক (সিডিপিএল) মো. আল জায়েদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘সিডিপিএলের পাইপলাইনে তেল পরিবাহিত করা হলেও তাতে ডিজেলের পরিমাণ নিরূপণে ডিটি ও আরটিতে মাস-ফ্লো মিটার স্থাপন করা হলেও তার ক্যালিব্রেশন এখন পর্যন্ত সম্পন্ন হয়নি। এ কারণে বর্তমানে সার্ভেয়ার ম্যানুয়াল ডিপ গ্রহণের মাধ্যমে গৃহীত ডিজেলের পরিমাণ চূড়ান্ত করেছে।’ তিনি পাইপলাইনে ক্যাভিটেশন (শূন্যস্থান) পূরণ হওয়াকে ডিজেল কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তবে সিডিপিএলের বিভিন্ন পার্সেলে সংগঠিত লসের কারণ হিসেবে ফ্লো মিটার ও ফ্লো কম্পিউটারের সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। পাইপলাইন পুরোদমে চালুর জন্য পাইপলাইনের লিক ডিটেকশন সিস্টেমসহ (এলডিএস) এর আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি, প্রেসার ট্রান্সমিটার (পিটি), টেম্পারেচার ট্রান্সমিটারের (টিটি) ক্যালিব্রেশন ও পর্যাপ্ত লাইন প্রেসার নিশ্চিত করার প্রতি জোর দেন আল জায়েদ। সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত সাম্প ট্যাংকসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতির রিডিং স্কাডায় যথাযথভাবে প্রদর্শিত হচ্ছে না এবং এলডিএস সিস্টেমে ত্রুটির কারণে পাইপলাইনের বিভিন্ন অংশে লাইনপ্যাক পরিমাণের সঠিক হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না বলে তিনি জানান। যমুনা অয়েলের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (কন্ট্রোলার অব ডিপো) শেখ জাহিদ আহমেদ তদন্ত কমিটিকে দেওয়া বক্তব্যে সিডিপিএল পাইপলাইনে লসের কারণ হিসেবে পাম্পিংয়ের সময়, পরিমাণ নির্ধারণের জন্য স্থাপিত ফ্লো মিটারের ক্যালিব্রেশন না থাকা, আন্তঃকোম্পানি সমন্বয়হীনতা এবং তাপমাত্রার পরিবর্তনের কারণে পাইপলাইনে শূন্যস্থান (ভ্যাকুয়াম) সৃষ্টি হওয়াকে দায়ী করেন। পিটিসিপিএলসির সহকারী ব্যবস্থাপক (কেমিক্যাল) মোহাম্মদ ওসমান তদন্ত কমিটিকে বলেন, আরটি ফতুল্লার মাস ফ্লো মিটার, টারবাইন ফ্লো মিটার, ফ্লো কম্পিউটার সঠিক মান না দেখানোর কারণে অপারেশন যথাযথভাবে মনিটরিং সম্ভব হচ্ছে না। পর্যবেক্ষণে তদন্ত কমিটি যা বলছে ডিটিতে দুটি মাস-ফ্লো মিটার থাকলেও তা ফ্লো-কম্পিউটারের সঙ্গে ডেনসিটি ইন্টিগ্রেট করা ছিল না। যে কারণে ফ্লো-মিটার থেকে সরবরাহ করা পণ্যের সঠিক পরিমাণ সংক্রান্ত তথ্য ফ্লো-কম্পিউটারের মাধ্যমে পাওয়া যায়নি। এতে প্রতীয়মান হয়, ফ্লো-কম্পিউটার টেকনিক্যাল সমস্যার কারণে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা পণ্যের পরিমাণ যথাযথভাবে (নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও ঘনত্ব) পরিমাপ করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে জানতে সিডিপিএল প্রকল্পের অটোমেশন কাজের ঠিকাদার বেঞ্চমার্ক কনসাল্টিং কোম্পানির সিইও ইঞ্জিনিয়ার আহমেদ গণি চৌধুরীকে ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে সিডিপিএল প্রকল্পে পিআইডিএস ও এলডিএসের কার্যকারিতা নিয়ে খুদেবার্তার উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমাদের সিস্টেম ঠিকঠাক কাজ করছে, এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি।’ ক্যালিব্রেশনে ভুল ইচ্ছাকৃত নাকি মুদ্রণজনিত বিপিসির তদন্ত কমিটিকে দেওয়া যমুনা অয়েলের ফতুল্লা ডিপোর কর্মকর্তা (অপারেশন) ইমরান হোসাইন তার বক্তব্যে সিডিপিএলে সংগঠিত লসের কারণ হিসেবে ক্যালিব্রেশন ত্রুটি ও স্যাম্পে তেল জমা হওয়াকে উল্লেখ করেন। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ফতুল্লা ডিপোর ট্যাংক-২২ যমুনা অয়েলের বিদ্যমান ক্যালিব্রেশন চার্টের ভিত্তিতে অটোগেজিং স্থাপন ও ক্যালিব্রেশন করা হয়। ট্যাংকের রক্ষণাবেক্ষণ ও নতুন করে ক্যালিব্রেশনের জন্য ২০২৪ সালের ২০ নভেম্বর যমুনা অয়েলের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগ থেকে মেসার্স আরিয়ান ট্রেডিংকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। পরে আরিয়ান ট্রেডার্স ২০২৫ সালের ৪ মার্চ তৃতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে মেসার্স এস এম নুরুল হকের মাধ্যমে ক্যালিব্রেশন করে চার্ট বিএসটিআইকে জমা দেন। পরবর্তীসময়ে সিডিপিএলে ডিজেল পরিবাহিত হওয়ার পর ফতুল্লা ডিপোর ট্যাংক-২২ এ সোয়া লাখ লিটার তেল তারতম্য হওয়ার পর ২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর পুনরায় ক্যালিব্রেশন করার জন্য ঠিকাদারকে চিঠি দেয় যমুনা অয়েল। এরপর ৫ অক্টোবর প্রথম ক্যালিব্রেশনে মুদ্রণজনিত ভুলের দায় স্বীকার করে সংশোধিত ক্যালিব্রেশন চার্ট পুনঃপ্রত্যয়নের জন্য অনুরোধ জানিয়ে বিএসটিআইকে চিঠি দেয়। পাশাপাশি ট্যাংক-২৩ এ ক্যালিব্রেশন চার্ট সংশোধন করার অনুরোধ জানায়। পরে দুই ট্যাংকের ক্যালিব্রেশন চার্ট সংশোধন করা হয়। সংশোধিত চার্ট অনুযায়ী যমুনা অয়েলের প্রথম দুই চালানের হিসাবে প্রথম ক্যালিব্রেশন চার্টের চেয়ে ৭২ হাজার ৮৩৮ লিটার বেশি পাওয়া যায়। একইভাবে তৃতীয় চালানেও সংশোধিত চার্ট অনুযায়ী দুই ট্যাংকে আগের হিসাবের চেয়ে ৪৪ হাজার ৭৯ লিটার তেল বেশি পাওয়া যায়। এতে লসের পরিমাণ অনেক কমে আসে। অভিযোগ উঠেছে, যমুনা অয়েলে প্রশাসনের ইন্ধনে ক্যালিব্রেশন প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে ট্যাংকের ক্যালিব্রেশনে তেলের পরিমাণ কম দেখিয়ে পরবর্তীসময়ে চুরির পরিকল্পনা করা হয়। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেও অভিযোগের সত্যতা মেলে। তদন্ত কমিটি প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে- ক্যালিব্রেশন চলাকালে বিএসটিআই বা ডিপোর কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না। তাছাড়া মেসার্স এস এম নুরুল হকের প্রতিনিধির বক্তব্যে ডিপো সুপার ও বিএসটিআইর প্রতিনিধির নির্দেশনা অনুযায়ী খসড়া ক্যালিব্রেশন চার্টে পরিবর্তন আনা হয়েছে, ‘যা তাদের অসৎ উদ্দেশ্যের দিকে ইঙ্গিত করে’ মর্মে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে তদন্ত কমিটি। এর আগে যমুনা অয়েলের নিজস্ব তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন নিয়ে গত ১১ নভেম্বর যমুনা অয়েলের মহাব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ) মো. মাসুদুল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের যমুনা অয়েলের তদন্তে মাত্র ৭ হাজার ৭৭১ লিটার ঘাটতি থাকার বিষয়টি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মূলত প্রথম ক্যালিব্রেশনে ভুল ছিল। ক্যালিব্রেটরদের পানিশমেন্ট হওয়া উচিত।’ এ বিষয়ে জানতে ফতুল্লা ডিপো সুপার মো. আসলাম খান আবুল উলায়ীর মোবাইল ফোনে বেশ কয়েকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে খুদেবার্তা দিলেও কোনো সাড়া দেননি। এমডিআইএইচ/এএসএ/এমএফএ/জেআইএম