রমজানে বাজার পরিস্থিতি ও ইসলামের শিক্ষা

এখন চলছে বরকতময় রমজান মাস। সিয়াম সাধনা ও আত্মশুদ্ধির এই পবিত্র সময়ে প্রতিটি মুমিনের লক্ষ্য থাকে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, ইবাদতের এই মাসেও আমরা দেখছি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার অস্থির। সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে।ইসলাম যেখানে মানুষের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশের নির্দেশ দেয়, সেখানে এক শ্রেণির অসাধু চক্র একে মুনাফা লোটার হাতিয়ার বানাচ্ছে। এটি ইসলামের সুমহান আদর্শের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ইসলামে ব্যবসাকে একটি মহৎ পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ব্যবসা কেবল পার্থিব মুনাফা নয়, বরং এটি একটি বড় ইবাদত ও খিদমত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেছেন, وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন। (সুরা বাকারা: ২৭৫) ব্যবসায়ীদের মর্যাদা সম্পর্কে রাসূল সা. এরশাদ করেছেন, التَّاجِرُ الصَّدُوقُ الأَمِينُ مَعَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবীগণ, সিদ্দিকগণ এবং শহীদগণের সাথে থাকবে। (তিরমিজি) চলমান বাজারের এই অস্থিরতার মূলে রয়েছে কৃত্রিম সংকট বা মজুদদারি, যাকে শরিয়তের পরিভাষায় 'ইহতিকার' বলা হয়। অধিক মুনাফার আশায় পণ্য গুদামজাত করে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ানো ইসলামের দৃষ্টিতে চরম অপরাধ। রাসূল সা. এ ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে এরশাদ করেছেন, لا يَحْتَكِرُ إِلَّا خَاطِئٌ পণ্য মজুদকারী ব্যক্তি মূলত অপরাধী। (সহিহ মুসলিম) অন্য একটি হাদিসে রাসূল সা. আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, যে ব্যক্তি মুসলমানদের খাদ্যদ্রব্য মজুদ করে রাখে, আল্লাহ তায়ালা তার ওপর দারিদ্র্য ও কুষ্ঠব্যাধি চাপিয়ে দেন। অর্থাৎ মানুষের ইফতার ও সেহরির কষ্ট বাড়িয়ে যারা সম্পদ গড়তে চায়, তাদের সেই সম্পদে কোনো বরকত থাকতে পারে না। আরও পড়ুন: রোজা না রেখে মসজিদের ইফতার খাওয়া যাবে?রমযান হলো মাগফিরাত বা ক্ষমার মাস। এই মাসে ব্যবসায়ীদের উচিত মানুষের প্রতি অধিক দয়ালু হওয়া। রাসূল সা. এরশাদ করেছেন: مَنْ لَا يَرْحَمِ النَّاسَ لَا يَرْحَمْهُ اللَّهُ যে মানুষের প্রতি দয়া করে না, আল্লাহও তার প্রতি দয়া করেন না। (সহিহ বুখারি) বিশ্বের অনেক মুসলিম দেশে দেখা যায়, রমযান উপলক্ষে ব্যবসায়ীরা বিশেষ ছাড় দেন, যেন সাধারণ মানুষ সহজে ইবাদত করতে পারে। আমাদের দেশের ব্যবসায়ীদেরও সেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করা উচিত। ইহকালীন সাময়িক লাভের চেয়ে পরকালীন মুক্তি অনেক বেশি মূল্যবান। ক্রেতা হিসেবে আমাদেরও এই রমযান মাসে মিতব্যয়ী হওয়া জরুরি। অনেক সময় দেখা যায়, আমরা প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি পণ্য কিনে ঘরে মজুদ করি, যা বাজারে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দেয়। ইসলাম আমাদের অপব্যয় থেকে বিরত থাকতে বলেছে। কুরআন মজিদে বলা হয়েছে, إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ নিশ্চয়ই অপচয়কারী শয়তানের ভাই। (সুরা ইসরা: ২৭) আমাদের সংযম কেবল খাদ্যে নয়, বরং ভোগের ক্ষেত্রেও থাকা প্রয়োজন। পরিশেষে বলা যায়, বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কেবল প্রশাসনের কঠোরতা যথেষ্ট নয়, বরং আমাদের প্রত্যেকের অন্তরে আল্লাহর ভয় বা 'তাকওয়া' জাগ্রত করা প্রয়োজন। ব্যবসায়ীরা যদি আখিরাতের জবাবদিহির কথা স্মরণ করেন এবং লাভ কিছুটা কমিয়ে মানুষের সেবার নিয়ত করেন, তবেই সমাজ শান্তিময় হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই পবিত্র রমযান মাসে একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল ও ইনসাফপূর্ণ আচরণ করার তৌফিক দান করুন। আমিন।