ক্ষমতায় যাওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিসহ দেশের ছয়টি সিটি করপোরেশনে প্রশাসক পরিবর্তন করেছে বিএনপি সরকার। নতুন নিয়োগ পাওয়া ছয় প্রশাসকই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১৮ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দ্রুত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্বাচন আয়োজনের কথা বলেছিলেন। সোমবার একই কথা আবারও বলেছেন তিনি। তবে তার মধ্যেই স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ (সিটি করপোরেশন-১ শাখা) থেকে নতুন প্রশাসকদের নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি হয়।২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েই সিটি করপোরেশনগুলোর নির্বাচিত মেয়রদের অপসারণ করে প্রশাসক নিয়োগ দেয়। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের পর আবারও রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হলো।দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মধ্যে যে ছয়টি আজ প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হলো তার মধ্যে চারটিই ঢাকা বিভাগের। বাকি দুটি সিলেট এবং খুলনা।ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)ডিএসসিসির নতুন প্রশাসক হয়েছেন আবদুস সালাম। বিএনপির এই বর্ষীয়ান নেতা একসময় অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের ডেপুটি মেয়র ছিলেন।তিনি ঢাকা মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব ছিলেন। পরে মহানগর বিএনপি উত্তর ও দক্ষিণে বিভক্ত হলে তিনি বর্তমানে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সভাপতি হন। আবদুস সালাম বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যও।২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রার্থী হলেও এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পাননি তিনি। তবে ঢাকা-১৭ আসনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেছেন।আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ডিএসসিসির মেয়র ছিলেন শেখ ফজলে নুর তাপস। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের আগ মুহূর্তে তিনি দেশ ছাড়েন। পরে ২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি শাহজাহান মিয়াকে অতিরিক্ত সচিব পদে বহাল রেখে প্রশাসক করা হয়। গত অক্টোবরে তাকে সরিয়ে দেয়া হয়। নভেম্বরে মো. মাহমুদুল হাসানকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। এখন তার স্থলাভিষিক্ত হলেন আবদুস সালাম। আরও পড়ুন: গাজীপুর মহানগর বিএনপির সভাপতি শওকত হলেন গাসিকের প্রশাসকঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ডিএনসিসির নতুন প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। রাজধানীর শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, কাফরুল ও মিরপুরের একাংশ নিয়ে গঠিত এ আসনে তিনি জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের কাছে পরাজিত হন।যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি শফিকুল ইসলাম খান। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সদস্যসচিব ছিলেন।আওয়ামী লীগ আমলে ডিএনসিসির মেয়র ছিলেন আতিকুল ইসলাম। ২০১৯ সালে দায়িত্ব নেয়া আতিকুল ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে কারাগারে আছেন।অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদ এজাজকে এক বছরের জন্য ডিএনসিসিরি প্রশাসক নিয়োগ দেয়। মেয়াদ শেষে এ মাসের শুরুতে অতিরিক্ত সচিব সুরাইয়া আখতার জাহানকে প্রশাসক করা হয়। তারই স্থলাভিষিক্ত হলেন শফিকুল ইসলাম খান।গাজীপুর সিটি করপোরেশনগাজীপুর সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসক হয়েছেন শওকত হোসেন সরকার। তিনি গাজীপুর মহানগর বিএনপির সভাপতি।২০১৩ সালে গাজীপুর সিটি করপোরেশন গঠিত হওয়ার আগে টানা ১০ বছর শওকত হোসেন সরকার কাশিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। একই ইউনিয়ন পরিষদে তার বাবা গিয়াসউদ্দিন সরকার, চাচা সোহরাব উদ্দিন সরকার ও দাদা জবেদ আলী সরকারও চেয়ারম্যান ছিলেন।আওয়ামী লীগের সময় জাহাঙ্গীর আলম ছিলেন গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরীকে প্রশাসক করা হয়। এখন তার স্থলাভিষিক্ত হলেন শওকত হোসেন সরকার।নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশননারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসক হয়েছেন সাখাওয়াত হোসেন খান। তিনি নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি।নারায়ণগঞ্জের আলোচিত ‘সাত খুন’ মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী হিসেবে পরিচিত সাখাওয়াত হোসেন খান জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ছিলেন। ২০১৬ সালের সিটি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন তিনি। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী সেলিনা হায়াত আইভীর কাছে পরাজিত হন তিনি।অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পদচ্যুত হন আইভী। বর্তমানে তিনি কারাগারে আছেন। নাসিকের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পান আবু নছর মোহাম্মদ আবদুল্লাহ। এখন তার স্থলাভিষিক্ত হলেন সাখাওয়াত হোসেন খান। আরও পড়ুন: ৬ সিটিতে প্রশাসক নিয়োগসিলেট সিটি করপোরেশনসিলেট সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি তিনি।ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক দপ্তর সম্পাদক, যুবদলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব ছিলেন আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী।২০২২ সালের ২৯ মার্চ সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ১২ মার্চ পর্যন্ত সিলেটে বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামের সমন্বয়কারী এবং সিলেট বিভাগের সাংগঠনিক দায়িত্বে ছিলেন।চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক ছিলেন আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। বর্তমানে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য।ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৩ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন, তবে মনোনয়ন পাননি। ওই আসনে যুক্তরাজ্য বিএনপির সদ্য সাবেক সভাপতি এম এ মালিকে মনোনয় দেয় বিএনপি। তবে নির্বাচনে জেলার সব আসনে বিএনপি প্রার্থীদের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসক খান মো. রেজা-উন-নবীর স্থলাভিষিক্ত হলেন আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী।খুলনা সিটি করপোরেশনখুলনা সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক।২০২১ সালের আগে দীর্ঘ ২৮ বছর খুলনা মহানগর বিএনপির শীর্ষস্থানীয় পদে ছিলেন। সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ১৬ বছর ও ১২ বছর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।সাবেক এই সংসদ সদস্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। তবে জামায়াতে ইসলামীর শেখ জাহাঙ্গীর হোসেন হেলালের কাছে পরাজিত হন।২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি জোটের ভরাডুবির মধ্যেও খুলনা-২ আসনে জয় পেয়েছিলেন নজরুল ইসলাম মঞ্জু। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচন ও একই বছরের খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও জয় পাননি।অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া মোখতার আহমেদের স্থলাভিষিক্ত হলেন নজরুল ইসলাম মঞ্জু। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়রের মেয়াদ আর কতদিন? বর্তমানে দেশের সিটি করপোরেশনগুলোর মধ্যে একমাত্র দায়িত্বে থাকা মেয়র চসিকের শাহাদাত হোসেন।তিনি দাবি করেছেন, আদালতের রায় অনুযায়ী তার মেয়াদ ২০২৯ সালের ৩ নভেম্বর পর্যন্ত। তবে এর আগেই দ্রুত নির্বাচন চান তিনি।রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) নগরের হালিশহরে একটি খেলার মাঠ উদ্বোধনের সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত তিনি মেয়র হিসেবেই দায়িত্ব পালন করবেন।২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরী বিজয়ী ঘোষিত হন। পরে ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার তাকে অপসারণ করে। ওই নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন শাহাদাত হোসেন। ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর আদালত তাকে মেয়র ঘোষণা করেন; ৩ নভেম্বর শপথ নিয়ে ৫ নভেম্বর দায়িত্ব নেন তিনি।মেয়র বলেন, আদালত রেজাউল করিম চৌধুরীর মেয়াদ অবৈধ ঘোষণা করায় তার শপথের তারিখ থেকেই পাঁচ বছরের মেয়াদ গণনা হবে। প্রশাসক নিয়োগের সুযোগ নেই বলেও দাবি করেন তিনি।আর নির্বাচনের প্রর প্রথম সভা থেকে মেয়াদ হিসাব করলে ডা. শাহদাত হোসেনের মেয়াদ শেষ হয়েছে রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি)। বর্তমান নির্বাচিত ষষ্ঠ পরিষদের প্রথম সভা হয়েছিল ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি।এদিকে মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিন পূর্বে নির্বাচন আয়োজন করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও এ বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।এর বাইরে রাজশাহী, বরিশাল, কুমিল্লা, রংপুর এবং ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের বিষয়ে নতুন সরকারের তরফ থেকে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।