নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) নতুন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান।রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মাহবুবা আইরিন স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এ নিয়োগ আদেশ জারি করা হয়।একই প্রজ্ঞাপনে দেশের আরও পাঁচটি সিটি কর্পোরেশনে নতুন প্রশাসক নিয়োগের তথ্য জানানো হয়েছে।সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি ) বিএনপি সরকার অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়ার বিষয়টি প্রকাশ পেলে দলের স্থানীয় নেতা কর্মীদের মধ্যে আনন্দের জোয়ার বইতে শুরু করে। দলীয় নেতা কর্মীরা তার ব্যক্তিগত কার্যালয়ে দিয়ে ফুল দিয়ে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানান সাখাওয়াতকে।২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে টানা তিনবারের নির্বাচিত মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে অপসারণ করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। পরে অতিরিক্ত সচিব এএইচএম কামরুজ্জামানকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। পরবর্তীতে তাকে বদলি করে যুগ্ম সচিব আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহকে নতুন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। এখন পর্যন্ত আবু নছর আব্দুল্লাহ নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে প্রশাসকের দায়িত্বে আছেন।তবে সাখাওয়াত হোসেন খানের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে তিনি আগামীকাল ২৪ ফেব্রুয়ারি (মঙ্গলবার) দুপুরে প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জে আলোচিত সাত খুন মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী হয়ে দেশ জুড়ে আলোচনায় আসেন অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। তখন থেকেই তিনি গণমাধ্যমে বেশ পরিচিত মুখ হয়ে উঠেন। পরে ২০১৬ সালে তিনি নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়ে ধানের শীষ প্রতীকে মেয়র পদে নির্বাচনে অংশ নেন। তবে ওই নির্বাচনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর কাছে পরাজিত হন তিনি।পরে ২০১৮ সালে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে সংসদ সদস্য পদে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। তবে ওই নির্বাচনে বিএনপি নিজ দলীয় কোন প্রার্থী না দিয়ে আসনটি ছেড়ে দেয় শরিক দলকে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও আসনটিতে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রাথমিকভাবে সাখাওয়াতের নাম শোনা যায়। পরবর্তীতে শেষ মূহুর্তে তিন বারের নির্বাচিত সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালামকে চূড়ান্ত প্রার্থী করে বিএনপি। তাই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন বঞ্চিত সাখাওয়াতকে বিএনপি সরকার নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে মূল্যায়ন করেছে বলে মনে করছেন দলীয় নেতাকর্মীরা।আরও পড়ুন: নারায়ণগঞ্জে আদালত প্রাঙ্গণে মারধরের মামলায় বিএনপি নেতা সাখাওয়াতের জামিনএ বিষয়ে প্রতিক্রিয়ায় অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, ‘আমি প্রথমে মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আরও কৃতজ্ঞতা জানাই আমার দলের প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রতি। আমি মনে করি গত ১৭ বছর আমাদের আন্দলন সংগ্রাম, ত্যাগ তিতিক্ষা, জেল জুলুম ও যেভাবে নির্যাতন করা হয়েছে তার মূল্যায়ন হয়েছে। আমার নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাহেব আমাকে মূল্যায়ন করেছেন। আমি মনে করি আমাকে মূল্যায়ন করা মানে তৃণমূলকে মূল্যায়ন করা হয়েছে। আমি নিজেকে তৃণমূলের প্রতিনিধি হিসেবে মনে করি।’ অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান আরও বলেন, ‘আমি সব সময় দলের প্রতি অনুগত ছিলাম। দলের আদেশ নির্দেশের কোন বিরোধিতা কখনও করিনি। গত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও প্রাথমিক পর্যায়ে আমাকে এমপি প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করা হয়েছি। কিন্তু পরবর্তীতে অন্য জনকে প্রার্থী করা হয়। আমি কোন প্রতিবাদ করিনি। আমি দলের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছি। আজকে আমাকে যে পদ দেয়া হয়েছে আমি কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কাউকে বলি নাই আমাকে পদটি দেয়া হোক। কিন্তু আমার দল আমার নেতা তারেক রহমান আমাকে মূল্যায়ন করেছেন। আমি মনে করি তার ৩১ দফা নারায়ণগঞ্জে তৃণমূল পর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্যই আমাকে এই দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আমাদের নেতা আমাদের দিক নির্দেশনা দিয়েছেন আমাদের কি করতে হবে। জনগণের সঙ্গে আমাদের আচরণটা কেমন হবে। আমরা তার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করব।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার প্রথম কাজ হবে নারায়ণগঞ্জে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, কিশোর গ্যাংসহ সব অপকর্ম থেকে নারায়ণগঞ্জবাসীকে মুক্ত করা। এছাড়া সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং কাজ হবে নগরীর যানজট, রাস্তার বেহাল অবস্থা সমাধান করা। আজকে আমাকে যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে আমি দলের এমপি, প্রশাসন সবাইকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জের এই সব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করব। আমি জনগণের মন জয় করে জনগণের প্রশাসক হতে চাই। আমি মন প্রাণ দিয়ে নারায়ণগঞ্জবাসীর সকল সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করব।’ উল্লেখ্য, ২০১১ সালের ৫ মে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা, সিদ্ধিরগঞ্জ পৌরসভা ও কদমরসূল পৌরসভাকে বিলুপ্ত করে ২৭টি ওয়ার্ডের সমন্বয়ে গঠিত হয় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক)। ৭১.৪৩ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের অধিবাসী ২০ লাখের বেশি। মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৫ লাখ। ২০১১ সালের অক্টোবর মাসে প্রথম নির্বাচনে শামীম ওসমানকে এক লাখের বেশি ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে দেশের প্রথম নারী মেয়র নির্বাচিত হন ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী।