ঠাকুরগাঁওয়ে পুলিশ সদস্যদের জন্য সরকার নির্ধারিত ভর্তুকি মূল্যের রেশনের চিনি খোলা বাজারে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরপিএমপি) নামে বরাদ্দ এই চিনি অবৈধভাবে মেসার্স টি এস ট্রেডারস নামের একটি দোকানে বিক্রির সময় স্থানীয় জনতা তা আটকে দেয়। দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র এই কাজ করে আসছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।ঠাকুরগাঁও সুগার মিলসের প্রশাসন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে মিল থেকে ১২৫ টাকা কেজি দরে মোট ৪৪ মেট্রিক টন চিনি বিক্রি করা হয়। এর মধ্যে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ ১৫ মেট্রিক টন, রংপুর পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার ১১ মেট্রিক টন এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) ৬ মেট্রিক টন চিনি নেয়। এছাড়া ১২ মেট্রিক টন শ্রমিক-কর্মচারীদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয় এবং বাকি অংশ সংরক্ষিত খাতে দেখানো হয়েছে। স্থানীয়দের তথ্যমতে, সোমবার দুপুরে মিলের গুদাম থেকে ৫ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার তিনটি গাড়ি বের হয়। এর মধ্যে একটি ট্রাক রংপুরের উদ্দেশে রওনা দিলেও বাকি দুটি পাওয়ার টিলার মিলগেটের পাশের রোড বাজার এলাকায় রেললাইনের পাশে অবস্থিত ‘মেসার্স টি এস ট্রেডারস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সামনে গিয়ে থামে। গোপন সূত্রের দাবি, মিলের ক্যাশিয়ার মো. শামীম রহমানের মালিকানাধীন ওই প্রতিষ্ঠানটি বাজারদরের চেয়ে কম মূল্যে ১০ মেট্রিক টন চিনি কিনে নেয়। এ সময় স্থানীয়দের সন্দেহ হলে তারা দোকান মালিকের কাছে পুলিশের বরাদ্দপত্র (ডিও) দেখতে চান। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে দোকান মালিক রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তাকে ফোনে ডেকে আনেন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের রেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও মেস ম্যানেজার উপপরিদর্শক (সশস্ত্র) মমিনুল ইসলামসহ কয়েকজন সদস্য। এ সময় তারা দাবি করেন, রেশনের চিনি বিক্রি করে যে অর্থ পাওয়া যায়, তা দিয়ে মেসে অবস্থানরত প্রায় ৩০০ সদস্যের জন্য মাছ-মাংসসহ অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী কেনা হয়। রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের রেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, ‘আমরা ১৫ মেট্রিক টন চিনি উত্তোলন করেছি। এর মধ্যে ৭ মেট্রিক টন চিনি বিক্রি করা হয়েছে। আমাদের মেস ম্যানেজার প্রতি মাসে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার ৯০০ কেজি চিনি বরাদ্দ পান। বর্তমানে মেসে প্রায় ৬ হাজার কেজি চিনি মজুত রয়েছে, যা কয়েক দিনের মধ্যে সমন্বয় (কভার) হয়ে যাবে। সে কারণেই মেস পরিচালনার স্বার্থে ওই অংশের চিনি বিক্রি করা হয়েছে।’ আরও পড়ুন: বাসরঘরে মুখ ধোয়ার পর ‘অচেনা’ নববধূ, অভিযোগ গড়াল আদালতে! সরকারি চিনি খোলা বাজারে বিক্রি করা যায় কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সরকারি জিনিস বাইরে বিক্রি হওয়ার নজির আছে। আমরা রেশন টেন্ডারের মাধ্যমে ক্রয় করি। তবে এই চিনি টেন্ডারে ক্রয় করা হয়নি, আর বিক্রির ক্ষেত্রে টেন্ডারের প্রয়োজন হয় না। মেসে অবস্থানরত সদস্যদের অংশের চিনি থেকেই এই বিক্রি করা হয়েছে। এখানে বাইরের কারও বরাদ্দের চিনি বিক্রি করা হয়নি।’ মেস ম্যানেজার এসআই (সশস্ত্র) মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘মেসের জন্য যে চিনি বরাদ্দ হয়, তা বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে আমি ফোর্সের খাবারের ব্যবস্থা করি। ডিও ইস্যু হয়, আমরা চেক জমা দিই, এরপর ওসি (রেশন) স্যারের মাধ্যমে চিনি উত্তোলন করা হয়। আমি যেহেতু মেস পরিচালনা করি, সে হিসেবে প্রয়োজন অনুযায়ী চিনি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিতে পারি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই চিনি বিক্রির অর্থ দিয়েই ফোর্সের জন্য মাছ-মাংসসহ অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী কিনে থাকি। যেখানে কিছুটা বেশি দাম পাওয়া যায়, সেখানেই বিক্রি করা স্বাভাবিক। দোকান মালিক মো. শামীম রহমান চিনি নিয়েছেন। তার সুবিধা হলে রাখবেন, না হলে ফেরত দেবেন। কারণ শেষ পর্যন্ত এই চিনি বিক্রির অর্থ দিয়েই আমাকে ফোর্সের খাবারের ব্যবস্থা করতে হয়।’ এ বিষয়ে মেসার্স টি এস ট্রেডারসের মালিক ও সুগার মিলের ক্যাশিয়ার মো. শামীম রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘শুধু পুলিশ নয়, র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সদস্যরাও তাদের রেশনের পণ্য বিক্রি করে থাকেন। সেই ধারাবাহিকতায় আমি পুলিশের বরাদ্দের চিনি ক্রয় করেছি। তাদের সঙ্গে আগেই একটি সমঝোতা হয়েছিল, নির্ধারিত সেই দামে চিনি নেয়া হয়েছে। আমি না কিনলে তারা অন্য দোকানেও বিক্রি করতে পারত।’ আরও পড়ুন: ঠাকুরগাঁওয়ে চাল সংগ্রহে অনিয়ম, খাদ্য পরিদর্শক বরখাস্ত তিনি আরও বলেন, ‘ঠাকুরগাঁও সুগার মিলের চিনির দাম তুলনামূলক বেশি হওয়ায় সংশ্লিষ্টরা এই চিনি বিক্রি করে অন্য উৎস থেকে সস্তায় চিনি কিনে থাকেন।’ তবে ঠিক কত দামে এই কেনাবেচা হয়েছে এমন প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের পারস্পরিক বোঝাপড়ার বিষয়, যাতে তারাও ক্ষতিগ্রস্ত না হন, আমরাও কিছুটা লাভ করতে পারি।’ এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও সুগার মিলের প্রশাসন বিভাগের উপব্যবস্থাপক সুভাষ চন্দ্র সিংহের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আজ রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে ১৫ মেট্রিক টন চিনি নিয়ে গেছে। শুধু তারা নন, র্যাব ও রংপুর পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারও চিনি নিয়ে গেছে। পরবর্তীতে এই চিনি তারা কোথায় কী করবে, সেটা তাদের ব্যাপার। এ বিষয়ে আমাদের বলার কিছু নেই।’ অন্যদিকে, রেশনের চিনি খোলা বাজারে বিক্রির বিষয়ে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের পুলিশ কমিশনার মো. মজিদ আলীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘রেশনের চিনি খোলা বাজারে বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। কেউ এমন কাজ করে থাকলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। সত্যতা পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’