পৃথিবীতে বহু সম্পর্কের নীরব ভিত্তি হলো অযৌন অন্তরঙ্গতা। অযৌন অন্তরঙ্গতা সম্পর্কের সেই স্তম্ভ, যা দেখা যায় না, কিন্তু সম্পর্কের ভিত্তিকে দাঁড় করিয়ে রাখে। আমরা প্রায়ই সম্পর্ককে শরীরের ভাষায় মাপতে শিখেছি, অথচ সম্পর্কের গভীরতা তৈরি হয় সেইসব মুহূর্তে—যেখানে কোনো দাবি নেই, কোনো প্রমাণের প্রয়োজন নেই, কেবল উপস্থিতি আছে। চোখে চোখ রাখা মানে শুধু তাকিয়ে থাকা নয়; এর অর্থ হলো—“আমি এখানে আছি, তোমাকে দেখছি, তোমাকে শুনছি।” সেই দৃষ্টিতে কোনো অধিকারবোধ থাকে না, থাকে স্বীকৃতি। এমন এক স্বীকৃতি, যেখানে মানুষ নিজেকে অভিনয় ছাড়া মেলে ধরতে পারে। মৃদু স্পর্শ—কাঁধে হাত রাখা, কপালে আলতো ছোঁয়া, আঙুলের ফাঁকে আঙুল জড়ানো—এসবের ভেতরে যে আশ্বাস লুকিয়ে থাকে, তা কোনো উত্তেজনার ভাষা নয়; বরং তা বলে, “তুমি নিরাপদ।” মানুষ নিরাপত্তার জন্যই সম্পর্ক খোঁজে। আর এই নিরাপত্তা শরীরের উন্মাদনায় নয়, বরং কোমল উপস্থিতিতে জন্ম নেয়। চোখে চোখ রাখা মানে শুধু তাকিয়ে থাকা নয়; এর অর্থ হলো—“আমি এখানে আছি, তোমাকে দেখছি, তোমাকে শুনছি।” সেই দৃষ্টিতে কোনো অধিকারবোধ থাকে না, থাকে স্বীকৃতি। এমন এক স্বীকৃতি, যেখানে মানুষ নিজেকে অভিনয় ছাড়া মেলে ধরতে পারে। মৃদু স্পর্শ—কাঁধে হাত রাখা, কপালে আলতো ছোঁয়া, আঙুলের ফাঁকে আঙুল জড়ানো—এসবের ভেতরে যে আশ্বাস লুকিয়ে থাকে, তা কোনো উত্তেজনার ভাষা নয়; বরং তা বলে, “তুমি নিরাপদ।” মানুষ নিরাপত্তার জন্যই সম্পর্ক খোঁজে। আর এই নিরাপত্তা শরীরের উন্মাদনায় নয়, বরং কোমল উপস্থিতিতে জন্ম নেয়। গভীর আলাপ হলো অন্তরঙ্গতার সবচেয়ে শক্তিশালী রূপগুলোর একটি। সেখানে কথা কেবল তথ্যের আদান-প্রদান নয়; বরং আত্মার দরজা খোলা। যখন কেউ তার ভয়, অনিশ্চয়তা, অতীতের ক্ষত বা ভবিষ্যতের স্বপ্ন ভাগ করে—সে আসলে নিজেকে উন্মুক্ত করে। আর যে মনোযোগ দিয়ে শোনে, সে তাকে গ্রহণ করে। এই গ্রহণযোগ্যতার অনুভূতি মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। একসঙ্গে নীরব থাকা—এটিও এক বিরল শিল্প। অনেক সম্পর্ক নীরবতায় ভেঙে যায়, কারণ সেখানে অস্বস্তি জন্মায়। অথচ প্রকৃত অন্তরঙ্গতায় নীরবতা উষ্ণ হয়। সেখানে কথা না বললেও বোঝাপড়া থাকে। যেন দুটি মন পাশাপাশি বসে বিশ্রাম নিচ্ছে—কেউ কাউকে প্রমাণ করছে না, তবু দূরত্ব নেই। অযৌন আলিঙ্গন—যেখানে শরীরের চেয়ে বেশি জড়িয়ে থাকে ভরসা। এই আলিঙ্গন কোনো তাড়না থেকে আসে না; আসে ক্লান্ত দিনের শেষে আশ্রয় খোঁজার আকাঙ্ক্ষা থেকে। এমন আলিঙ্গনে মানুষ নিজের ভার নামিয়ে রাখতে পারে। তার দুর্বলতা লুকাতে হয় না। একসঙ্গে রান্না করা, বৃষ্টি দেখা, গান শোনা, হাঁটতে বের হওয়া—এসব সাধারণ কাজই যখন ভাগ করা হয়, তখন তা হয়ে ওঠে স্মৃতি। সম্পর্ক আসলে বড় বড় ঘোষণা দিয়ে টিকে থাকে না; টিকে থাকে ছোট ছোট ভাগ করা মুহূর্তে। যে সম্পর্ক দৈনন্দিনতার ভেতরেও উষ্ণতা খুঁজে পায়, সেই সম্পর্কই দীর্ঘস্থায়ী হয়। পারস্পরিক সমর্থন হলো এই অন্তরঙ্গতার আরেকটি স্তর। কঠিন দিনে পাশে দাঁড়ানো মানে সমাধান দেওয়া নয়; বরং উপস্থিত থাকা। আনন্দের দিনে হাততালি দেওয়া মানে ঈর্ষা নয়, গর্ব অনুভব করা। যখন দুইজন মানুষ একে অপরের সাফল্যে আলো খুঁজে পায়, তখন সম্পর্ক প্রতিযোগিতা নয়, সহযাত্রায় রূপ নেয়। সবচেয়ে বড় কথা—অযৌন অন্তরঙ্গতায় অধিকার কম, কৌতূহল বেশি। এখানে মানুষ প্রতিদিন নতুন করে জানতে চায়—“আজ তুমি কেমন?” এই প্রশ্নটি যদি সত্যি মন থেকে আসে, তবে সেটিই ভালোবাসার পরিপক্ব রূপ। আজকের দ্রুতগতির সময়ে আমরা প্রায়ই তাড়াহুড়ো করি—ফল চাই, প্রমাণ চাই, উত্তেজনা চাই। কিন্তু অযৌন অন্তরঙ্গতা ধীর। এটি সময় নেয়। এটি মনোযোগ দাবি করে। এটি এমন এক বন্ধন তৈরি করে, যেখানে শরীর অনুপস্থিত থাকলেও সংযোগ অটুট থাকে। এই শিল্প হারিয়ে গেলে সম্পর্ক থাকে, কিন্তু গভীরতা থাকে না। কথা থাকে, কিন্তু বোঝাপড়া থাকে না। কাছাকাছি থাকা থাকে, কিন্তু উষ্ণতা থাকে না। অথচ মানুষ সবচেয়ে বেশি যা খোঁজে—তা হলো এই নীরব, ধীর, আশ্বাসময় অন্তরঙ্গতা। যেখানে কেউ কারও উপর চড়াও হয় না, বরং পাশে বসে। যেখানে ভালোবাসা প্রমাণের নয়, উপস্থিতির। যেখানে স্পর্শ তাড়নার নয়, যত্নের। আর যেখানে নীরবতাও বলে—“আমি আছি।” অযৌন অন্তরঙ্গতা সম্পর্কের সেই পরিণত স্তর, যেখানে মানুষ আর “পাওয়া” নিয়ে ব্যস্ত থাকে না—বরং “থাকা” শেখে। এটি এমন এক সংযোগ, যা স্পর্শের চেয়েও সূক্ষ্ম, শব্দের চেয়েও গভীর, আর প্রতিশ্রুতির চেয়েও নীরব। আমরা প্রায়ই ভাবি অন্তরঙ্গতা মানেই কাছাকাছি শরীর। কিন্তু সত্যিকারের অন্তরঙ্গতা শুরু হয় যখন দুইজন মানুষ একে অপরের ভেতরের অন্ধকার ঘরগুলোতেও প্রবেশের অনুমতি দেয়। সেখানে কোনো সাজসজ্জা নেই, কোনো প্রস্তুত সংলাপ নেই—শুধু অপরিপূর্ণ, অসম্পূর্ণ, অথচ সত্য একটি মানুষ। অযৌন অন্তরঙ্গতা মানে কাউকে বদলানোর চেষ্টা না করা। বরং তার অসম্পূর্ণতাকে জায়গা দেওয়া। সে যেমন, তাকে তেমনভাবে গ্রহণ করা। এই গ্রহণযোগ্যতার ভেতরেই সম্পর্কের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা তৈরি হয়। কারণ মানুষ তার শরীরের জন্য নয়—তার ভেতরের ভাঙাচোরা অংশগুলোসহ গ্রহণযোগ্য হতে চায়। এই অন্তরঙ্গতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মনোযোগ। আজকের সময়ে মনোযোগই সবচেয়ে দামী জিনিস। কাউকে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য কেউ যদি নিয়মিত খোঁজ নেয়, দেখা হলে ফোন সরিয়ে রাখে, সমস্ত ব্যস্ততা থামিয়ে, শুধু তোমার দিকে মনোযোগ দেয়—এটাই এক ধরনের গভীর ভালোবাসা। কারণ মনোযোগ মানে গুরুত্ব। আর গুরুত্ব পাওয়া মানে অস্তিত্বের স্বীকৃতি। অযৌন অন্তরঙ্গতা হলো নিরাপদ দুর্বলতা। যখন কেউ তার কষ্ট, ব্যর্থতা, ভয় বা অপূর্ণতার কথা বলতে পারে—এবং জানে, তাকে বিচার করা হবে না—সেই মুহূর্তে সম্পর্ক একটি আশ্রয়ে রূপ নেয়। সেখানে প্রতিরক্ষা ভেঙে যায়, মুখোশ খুলে যায়, এবং মানুষ সত্যিকারের মানুষ হয়ে ওঠে। এমন অন্তরঙ্গতায় সময়ের একটি বিশেষ ভূমিকা আছে। এখানে দ্রুত কিছু হয় না। এখানে সম্পর্ক ধীরে ধীরে পাকে—যেমন গাছের শিকড় মাটির গভীরে নেমে যায়। বাইরে হয়তো ফুল কম, কিন্তু ভিতরে শক্তি বেশি। ঝড় এলে যে সম্পর্ক ভেঙে পড়ে না, তার ভেতরে এমন অদৃশ্য শিকড় থাকে। অযৌন অন্তরঙ্গতা মানে একসঙ্গে নীরবে বেড়ে ওঠা। একই বই পড়ে ভিন্ন মতামত ভাগ করা। একই সমস্যার ভিন্ন সমাধান নিয়ে আলোচনা করা। একে অপরের চিন্তার জগতে ভ্রমণ করা। যখন দুইজন মানুষ পরস্পরের মনের ভেতর হাঁটতে শেখে, তখন শরীরের দূরত্ব বড় বিষয় থাকে না। এটি অধিকারহীন ঘনিষ্ঠতা। এখানে “তুমি আমার” নয়—বরং “তুমি তোমার মতো থেকেও আমার পাশে আছো।” এই স্বাধীনতার ভেতরেই ভালোবাসার পরিণতি লুকিয়ে থাকে। কারণ যেখানে শ্বাসরোধ নেই, সেখানে স্থায়িত্ব জন্মায়। আরও একটি বিষয় হলো—অযৌন অন্তরঙ্গতা স্মৃতিকে আলাদা রঙ দেয়। একটি সাধারণ বিকেল, একদিন দীর্ঘপথ হাঁটা, একটি অনর্থক হাসি, হাত ধরে বসে থাকা—এসব মুহূর্ত বছরের পর বছর মনে থেকে যায়। কারণ সেখানে শুধু উত্তেজনা নয়, ছিল স্বস্তি। মানুষ শেষ পর্যন্ত স্বস্তিকেই বেশি মনে রাখে। সবচেয়ে গভীর কথা হলো—অযৌন অন্তরঙ্গতা মানুষকে নিজেকেও ভালোবাসতে শেখায়। যখন কেউ তাকে সম্মান দেয়, শোনে, বোঝে—তখন সে নিজেকেও নতুনভাবে দেখতে শেখে। সম্পর্ক তখন আয়নার মতো কাজ করে; সেখানে নিজেকে ছোট নয়, সম্পূর্ণ মনে হয়। অযৌন অন্তরঙ্গতা একটি শিল্প। যা আজ হারিয়ে যাচ্ছে কারণ আমরা ফল চাই, প্রমাণ চাই, দ্রুত আবেগ চাই। কিন্তু অযৌন অন্তরঙ্গতা ধৈর্য শেখায়। এটি বলে—ভালোবাসা মানে সবসময় আগুন নয়; কখনও কখনও তা নীরব আলো, যা জ্বলে থাকে, পুড়ে যায় না। মানুষ যে শূন্যতার কথা বলে—তার অনেকটাই এই অন্তরঙ্গতার অভাব। পাশে কেউ থাকে, তবু একা লাগে। কথা হয়, তবু সংযোগ হয় না। কারণ শরীরের কাছাকাছি আসা সহজ; কিন্তু মনের ভেতর প্রবেশ করা সাহসের কাজ। অযৌন অন্তরঙ্গতা সেই সাহসের নাম—যেখানে মানুষ একে অপরের পাশে শুধু উপস্থিত থাকে। কোনো দাবি ছাড়া, কোনো তাড়াহুড়ো ছাড়া, কেবল সত্যিকারভাবে। আর সেই উপস্থিতিতেই সম্পর্ক তার সবচেয়ে গভীর রূপ খুঁজে পায়। অযৌন অন্তরঙ্গতা আসলে আত্মার ভেতরের দরজা খুলে দেওয়ার শিল্প। এখানে মানুষ শরীর দিয়ে নয়, সচেতন উপস্থিতি দিয়ে ছুঁয়ে যায়। এটি এমন এক ঘনিষ্ঠতা, যেখানে স্পর্শের প্রয়োজন নেই—তবু সংযোগ স্পষ্ট, গভীর এবং স্থায়ী। আমরা প্রায়ই সম্পর্ককে আবেগের উচ্ছ্বাস দিয়ে বিচার করি। কিন্তু উচ্ছ্বাস ক্ষণস্থায়ী; গভীরতা দীর্ঘস্থায়ী। অযৌন অন্তরঙ্গতা সেই দীর্ঘস্থায়ীতার অনুশীলন। এটি সেই ক্ষমতা, যেখানে দুইজন মানুষ একে অপরের সামনে নিরস্ত্র হতে পারে—তবু আহত হয় না। কারণ এখানে আঘাত করার ইচ্ছা নেই; আছে ধারণ করার প্রস্তুতি। এই অন্তরঙ্গতা শুরু মনোযোগ থেকে হলেও কিন্তু পরিণত হয় সম্মানে। তুমি যখন কারও কথা বাধা না দিয়ে শোনো, তার অনুভূতিকে খাটো না করো, তার কষ্টকে তুচ্ছ না ভাবো—তখন তুমি তাকে সম্মান দাও। আর সম্মান ছাড়া কোনো সম্পর্ক গভীর হতে পারে না। অযৌন অন্তরঙ্গতার এক বড় লক্ষণ হলো ধৈর্য। এখানে তাড়াহুড়ো নেই। কেউ তৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়া না দিলেও ভুল বোঝাবুঝি হয় না। কেউ চুপ থাকলে তাকে ছেড়ে দেওয়া নয়, বরং তার নীরবতার ভেতরে জায়গা দেওয়া হয়। কারণ বোঝাপড়া শব্দের উপর নির্ভর করে না; তা নির্ভর করে সংবেদনশীলতার উপর। এমন ঘনিষ্ঠতায় মানুষ একে অপরের মানসিক আবহাওয়া পড়তে শেখে। মুখে কিছু না বললেও বোঝা যায়—আজ তার মন ভারী, আজ তার হাসির আড়ালে ক্লান্তি আছে। এই উপলব্ধি শরীরের নয়; এটি মনস্তাত্ত্বিক সুর মেলানোর ফল। যেন দুটি সেতারের তার আলাদা হলেও এক সুরে কাঁপছে। অযৌন অন্তরঙ্গতা মানুষকে অধিকারবোধ থেকে মুক্ত করে। এখানে “তুমি আমার” বলার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো “তুমি স্বাধীন থেকেও আমার পাশে থাকতে চাও।” এই ইচ্ছার স্বাধীনতাই সম্পর্ককে সত্য করে তোলে। কারণ বাধ্যতায় টিকে থাকা ঘনিষ্ঠতা নয়; তা কেবল সহাবস্থান।আরও গভীরভাবে দেখলে, অযৌন অন্তরঙ্গতা মানুষকে নিজস্ব সত্তার কাছে ফিরিয়ে দেয়। যখন কেউ তোমাকে মনোযোগ দিয়ে শোনে, তোমার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেয়—তখন তুমি নিজেকেও গুরুত্ব দিতে শেখো। সম্পর্ক তখন আত্মমর্যাদার উৎস হয়ে ওঠে, নির্ভরতার নয়। এই অন্তরঙ্গতায় শরীরের অনুপস্থিতি নয়, বরং আত্মার উপস্থিতি বড় হয়ে ওঠে। এখানে দীর্ঘ আলাপের চেয়ে একটি ছোট বাক্য বেশি মূল্যবান। এখানে উত্তেজনার চেয়ে বিশ্বাস বেশি স্থায়ী। এখানে চাওয়ার চেয়ে দেওয়া বেশি শান্তিময়। মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় শূন্যতা তখনই জন্মায়, যখন সে স্পর্শ পায় কিন্তু বোঝাপড়া পায় না; কথা পায় কিন্তু মনোযোগ পায় না; পাশে কাউকে পায় কিন্তু উপস্থিতি পায় না। অযৌন অন্তরঙ্গতা সেই শূন্যতাকে পূরণ করে—কারণ এটি অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দেয়। এই অন্তরঙ্গতা হলো এমন এক বন্ধন, যেখানে দুটি মানুষ একে অপরের জীবনে বাড়তি চাপ নয়, বরং বাড়তি শান্তি হয়ে ওঠে। যেখানে সম্পর্ক উত্তেজনার ঝড় নয়, বরং গভীর সমুদ্র—নিঃশব্দ, বিস্তৃত, অথচ অসীম গভীর। এই শিল্প সত্যিই বিরল। কারণ এতে অভিনয় চলে না, কৌশল চলে না। এখানে কেবল সত্যিকারের উপস্থিতি লাগে। আর যে সম্পর্ক এই উপস্থিতিকে ধারণ করতে পারে, তার ভেতরেই জন্ম নেয় সবচেয়ে স্থায়ী ভালোবাসা।অযৌন অন্তরঙ্গতা আসলে দুইটি সত্তার মাঝে নির্মিত এক অদৃশ্য সেতু—যেখানে পা রাখার আগে কেউ অনুমতি চায়, আর পা রাখার পর কেউ তাড়াহুড়ো করে না। এই সেতু শরীরের উপর দাঁড়ায় না; দাঁড়ায় বিশ্বাস, মনোযোগ আর পরস্পরের ভেতরের পৃথিবীকে জানার বিনম্র ইচ্ছার উপর। এই অন্তরঙ্গতায় মানুষ একে অপরকে “ব্যবহার” করে না, “ধারণ” করে। এখানে সম্পর্ক কোনো প্রয়োজন মেটানোর উপায় নয়; বরং একসঙ্গে বেঁচে থাকার এক নীরব চুক্তি। তুমি ক্লান্ত হলে আমি শব্দ কমাই, তুমি ভেঙে পড়লে আমি বিচার সরাই, তুমি আনন্দ পেলে আমি ঈর্ষা সরিয়ে হাততালি দিই—এগুলোই এই ঘনিষ্ঠতার সরল নিয়ম। অযৌন অন্তরঙ্গতা হলো নিরাপদ দূরত্বের সৌন্দর্য। খুব কাছাকাছি থেকেও কেউ কারও ভেতরে হানা দেয় না। কেউ কারও গোপন ভাবনার উপর আক্রমণ করে না। বরং জানে—প্রত্যেক মানুষেরই একটি ব্যক্তিগত আকাশ আছে, যেখানে মাঝে মাঝে একা উড়তে দিতে হয়। এই স্বাধীনতাকে সম্মান করতে পারাই গভীর ভালোবাসার লক্ষণ। এমন সম্পর্কের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো—এখানে প্রতিদিন নতুন করে দেখা হয়। তুমি গতকালের মানুষ নও; তুমি বদলাচ্ছো, শিখছো, ভাঙছো। আর আমি সেই পরিবর্তন লক্ষ্য করি, গ্রহণ করি। কৌতূহল এখানে কখনও ফুরোয় না। কারণ আমি তোমাকে জানি বলেই তোমাকে আরও জানতে চাই। অযৌন অন্তরঙ্গতা মানে একসঙ্গে নীরবতাকে ভয় না পাওয়া। অনেক সম্পর্ক শব্দ দিয়ে ফাঁকা জায়গা ভরতে চায়। কিন্তু এখানে ফাঁকা জায়গা মানেই অস্বস্তি নয়; তা হলো বিশ্রাম। দুটি মন পাশাপাশি বসে থাকে—কেউ কারও উপর ঝুঁকে পড়ে না, তবু কেউ দূরে সরে যায় না। এই ভারসাম্যই গভীরতার প্রমাণ। এই অন্তরঙ্গতা মানুষের অহং ভাঙে। কারণ এখানে জিততে হয় না, প্রমাণ করতে হয় না, বড় হতে হয় না। বরং ছোট হতে হয়—ক্ষমা চাইতে, ধন্যবাদ বলতে, ভুল স্বীকার করতে। যখন দুইজন মানুষ নিজেদের দুর্বলতাকে লুকানোর বদলে ভাগ করে, তখন সম্পর্ক আর প্রতিযোগিতা থাকে না; হয়ে ওঠে সহযোগিতা। অযৌন ঘনিষ্ঠতা হলো সময়ের প্রতি শ্রদ্ধা। এটি জানে—সবকিছু দ্রুত পেলে তার গভীরতা থাকে না। তাই এটি অপেক্ষা করে, ধীরে ধীরে বোঝে, ধীরে ধীরে শিকড় গাঁথে। যে সম্পর্ক সময়কে সম্মান করে, সে সম্পর্ক স্থায়িত্ব পায়। আরও গভীরভাবে বললে, এই অন্তরঙ্গতা হলো এক ধরনের আধ্যাত্মিক সংযোগ। এখানে মানুষ শুধু একে অপরকে ভালোবাসে না; বরং একে অপরের ভেতরের আলোকে সম্মান করে। তুমি যখন তোমার স্বপ্নের কথা বলো, আমি তা ছোট করি না। তুমি যখন ভয়ের কথা বলো, আমি তা অস্বীকার করি না। এই স্বীকৃতিই আত্মার কাছে পৌঁছানোর পথ। অযৌন অন্তরঙ্গতা আমাদের শেখায়—ভালোবাসা সবসময় আগুন নয়; কখনও তা নরম আলো, যা চিৎকার করে না, কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে জ্বলে থাকে। এটি ঝড় নয়; এটি বাতাস, যা অদৃশ্য অথচ অনুভবযোগ্য। এটি দাবি নয়; এটি আমন্ত্রণ। যে সম্পর্ক এই শিল্প জানে, সেখানে একাকিত্ব কমে যায়। কারণ মানুষ বুঝতে পারে—তার পাশে কেউ আছে, যে তাকে স্পর্শ না করেও ছুঁতে পারে; কথা না বলেও শুনতে পারে; দূরে থেকেও অনুভব করতে পারে। এই বিরল শিল্পকে যারা ধারণ করতে পারে, তারা জানে—শরীরের কাছাকাছি আসা সহজ, কিন্তু মনের গভীরে পৌঁছানোই আসল ঘনিষ্ঠতা। আর সেই গভীরতাই সম্পর্ককে শুধু টিকিয়ে রাখে না, অর্থপূর্ণও করে তোলে। অযৌন অন্তরঙ্গতা কোনো বিকল্প নয়, এটি সম্পর্কের ভিত্তি। শরীর সময়ের সাথে বদলে যায়, আবেগের তীব্রতা ওঠানামা করে, কিন্তু মনোযোগ, সম্মান, নীরব বোঝাপড়া আর নিরাপদ উপস্থিতি—এইগুলোই সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করে। যে সম্পর্ক কেবল আকর্ষণে দাঁড়িয়ে থাকে, তা একদিন ক্লান্ত হয়। কিন্তু যে সম্পর্ক বোঝাপড়ায় দাঁড়ায়, তা পরিণত হয়। অযৌন অন্তরঙ্গতা আমাদের শেখায়—ভালোবাসা মানে সবসময় উত্তেজনা নয়; অনেক সময় তা ধীর স্থির এক সঙ্গ, যেখানে কেউ কাউকে প্রমাণ করতে ব্যস্ত নয়, বরং পাশে থাকতে প্রস্তুত। মানুষ শরীরের স্পর্শের চেয়ে বেশি খোঁজে—মনকে ছুঁয়ে দেওয়া উপস্থিতি। আর সেই উপস্থিতিই সম্পর্ককে ক্ষণিক থেকে চিরস্থায়ীতে রূপ দেয়। লেখক : কবি ও কথাসাহিত্যিক। এইচআর/এএসএম