রোজা ফরজ হওয়ার ইতিহাস

‘রোজা’ শব্দটি ফারসি। ফারসি শব্দ ‘রোজ’ থেকে এসেছে রোজা। আরবি হলো সাওম বা সিয়াম। এর অর্থ কোনো কাজ থেকে বিরত থাকা। ইসলামি পরিভাষায়, ‘সুবহে সাদিক থেকে নিয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সব ধরনের খাবার-পানীয় ও স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাকার নাম রোজা।রমজানের রোজা যেভাবে ফরজ হয় ইমাম নববী (রহ.) লেখেন, রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মোট নয় বছর রমজানের রোজা রেখেছেন। কেননা, তা দ্বিতীয় হিজরির শাবান মাসে ফরজ হয়। যেহেতু দ্বিতীয় হিজরিতে রমজানের রোজা ফরজ হয়। আর নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাদশ হিজরির রবিউল আউয়ালে ইন্তেকাল করেন। (আল-মাজমুয়া: ৬/২৫০)। পবিত্র কোরআনের যে আয়াতটির মাধ্যমে রোজা ফরজ হয়, সেটিতেই ইঙ্গিত রয়েছে, পূর্ববর্তী জাতি-গোষ্ঠীর জন্য রোজা ফরজ ছিল। আদম (আ.) থেকে শুরু করে মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত সব নবী-রসুলের যুগেই রোজার বিধান ছিল। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন,  یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا كُتِبَ عَلَیۡكُمُ الصِّیَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَی الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُوۡنَ অর্থ: হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল; তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার। (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৩) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা আলুসি (রহ.) রুহুল মায়ানিতে লিখেছেন, আয়াতে ‘মিনকাবলিকুম’ দ্বারা আদম (আ.) থেকে ঈসা (আ.) পর্যন্ত-- সব নবী-রসুলের যুগকে বোঝানো হয়েছে। আদম (আ.)-এর রোজা আদম (আ.)-এর ওপর রোজার বিধান আরোপের মাধ্যমে মানব ইতিহাসে সর্বপ্রথম রোজার প্রচলন ঘটে। তাঁর সময় আইয়ামে বিজ বা প্রতি চন্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ রোজা রাখতে হতো। ‘আইয়ামে বিজ’ অর্থ শুভ্রতার দিনসমূহ। আদম ও হাওয়া (আ.) জান্নাতে থাকাকালে নিষিদ্ধ ফল খেয়ে ফেলায় তাদের গায়ের রং কালো হয়ে যায়। তাই ফেরেশতারা তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং তারাও তওবা করেন। ফলে তাদের গায়ের রং সাদা ও সুন্দর হয়। এরপর আল্লাহ আদম (আ.) ও তার উম্মতকে প্রতি মাসে তিনটি করে রোজা রাখার নির্দেশ দেন। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আইয়ামে বিজের রোজা রাখতেন।’ (নাসায়ি) নুহ (আ.)-এর রোজা নুহ (আ.)-এর যুগেও রোজা পালন করা হতো। নবীজি বলেন, ‘নুহ (আ.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা ছাড়া সারা বছর রোজা রাখতেন।’ (ইবনে মাজাহ)। মুসা (আ.)-এর রোজা মুসা (আ.)-এর উম্মতের জন্য আশুরার রোজা ফরজ ছিল। রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় আসার পর ইহুদিদের আশুরার রোজা পালন করতে দেখে এর কারণ জিজ্ঞাসা করেন। তারা বলল,  এটি এক শুভ দিন। এই দিনে আল্লাহ বনি ইসরাইলকে তাদের শত্রু থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। ফলে মুসা (আ.) আল্লাহর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ওই দিনে রোজা রাখেন।’ এ কথা শুনে মহানবী (সা.) বলেন, ‘তাহলে আমি হজরত মুসা (আ.)-এর অনুসরণে তোমাদের তুলনায় বেশি হকদার।(বুখারি)।  এরপর মহানবী (সা.) আশুরার রোজা রাখেন এবং সাহাবিদের রোজা রাখার নির্দেশ দেন। এরপর রমজানের রোজা ফরজ হলে আশুরার রোজা নফলে পরিণত হয়। দাউদ (আ.)-এর রোজা দাউদ (আ.) বছরে ছয় মাস রোজা রাখতেন আর ছয় মাস রোজা রাখতেন না। নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় রোজা হলো দাউদ (আ.)-এর রোজা। তিনি এক দিন পর পর রোজা রাখতেন। ঈসা (আ.)-এর রোজা ঈসা (আ.)-এর উম্মতের সময়েও রোজার প্রচলন ছিল। ঈসা (আ.)-এর যখন জন্ম হয়, তখন লোকজন তার মা মরিয়ম (আ.) কে তার জন্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে, তিনি উত্তরে বলেছিলেন,  আমি করুণাময়ের উদ্দেশ্যে রোজা পালনের মানত করেছি। তাই আজ আমি কিছুতেই কোনো মানুষের সঙ্গে কথা বলব না। (সুরা মরিয়ম, আয়াত: ২৬)। ঈসা (আ.) জঙ্গলে ৪০ দিন রোজা রেখেছিলেন। একবার ঈসা (আ.)-এর উম্মতরা তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘আমরা পাপ আত্মাকে কীভাবে বের করব?’ তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ‘দোয়া ও রোজা ছাড়া তা অন্য কোনো উপায়ে বের হতে পারে না।’ আরও পড়ুন: রমজান মাসে কি বিয়ে করা যাবে? ইসলাম-পূর্ব আরবে রোজা ইসলাম আগমনের পূর্বে আরব সমাজেও রোজার প্রচলন ছিল। আয়েশা (রা.) বলেন, জাহেলি যুগে কুরাইশরা আশুরার রোজা পালন করত এবং আল্লাহর রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও এই রোজা পালন করতেন। যখন তিনি মদিনায় আগমন করেন তখনও এ রোজা পালন করেন এবং তা পালনের নির্দেশ দেন। যখন রমজানের রোজা ফরজ করা হলো, তখন আশুরার রোজা ছেড়ে দেয়া হলো। যার ইচ্ছা সে পালন করবে আর যার ইচ্ছা পালন করবে না। (বুখারি, হাদিস: ২০০২)। রমজানের রোজা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতগুলোর একটি, যা মুসলমানদের আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায়। হিজরি ২য় বর্ষে নাজিল হওয়া এ বিধান আজও কোটি কোটি মুসলমানের জীবনের অংশ। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে যথাযথভাবে রোজা পালনের তৌফিক দান করুন। আমিন। রমজান জিজ্ঞাসা সুপ্রিয় দর্শক শ্রোতা, রমজানের রোজা সঠিকভাবে পালনের জন্য রমজান সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ মাসায়ালা জানা জরুরি। তাই এ সংক্রান্ত দুটি মাসায়ালা এখানে উপস্থাপন করছি। একজন জানতে চেয়েছেন, রোজার নিয়ত আরবিতে করা কি জরুরি? রোজার নিয়ত করা ফরজ। নিয়তের অর্থ অন্তরের সংকল্প যেমন মনে মনে এভাবে সংকল্প করবে আমি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশে রোজা রাখার নিয়ত করলাম। নিয়তের জন্য অন্তরের ইচ্ছাই যথেষ্ট; মুখে বলা আবশ্যক নয়। রোজার উদ্দেশে সাহরি খেলে সেটিও রোজার নিয়ত বলে গণ্য হবে। আরবি নিয়ত জরুরি নয়, উত্তমও নয়-- আরবি নিয়তে পৃথক কোনো সওয়াবও নেই। আরও পড়ুন: তারাবি নামাজের ফজিলত আরেকজন জানতে চেয়েছেন, পুরো রমজানের জন্য একত্রে নিয়ত করা যাবে? পুরো রমজানের জন্য একত্রে নিয়ত করা যথেষ্ট নয় বরং প্রতিদিনের রোজার জন্য সেদিনই নিয়ত করতে হবে। কারণ প্রতিটি রোজা ভিন্ন ভিন্ন ইবাদত আর প্রতিটি আমলের জন্যই নিয়ত জরুরি।