রমজান আত্মার পুনর্জাগরণ, চরিত্রের পুনর্গঠন আর রবের সান্নিধ্যে প্রত্যাবর্তনের এক গভীর আধ্যাত্মিক সফর। এ মাসে সিয়াম আমাদের সংযম শেখায়, কুরআন আমাদের চিন্তার জগৎ আলোকিত করে, আর লাইলাতুল কদর আমাদের সামনে খুলে দেয় অনন্ত সম্ভাবনার দ্বার। রমজানের মৌলিক ভিত্তি তিনটি— তাকওয়া, কোরানের সাথে নিবিড় সম্পর্ক এবং লাইলাতুল কদরের অনুসন্ধান। এই তিনের সমন্বয়েই রমজান হয় অর্থবহ, ফলপ্রসূ ও রূপান্তরমুখী।প্রথম স্তম্ভ : তাকওয়া— সম্মানভিত্তিক ভয় ও সচেতন জীবনযাপনআল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ“হে ইমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।”— সূরা আল-বাকারা ২:১৮৩রমজানের চূড়ান্ত লক্ষ্য তাকওয়া। তাকওয়া শব্দটি আমাদেরকে ভয়ের একটি পরিশুদ্ধ রূপের দিকে নিয়ে যায়—যেখানে রয়েছে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আনুগত্য।আরও ইরশাদ হয়েছে:يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ“হে ইমানদারগণ! আল্লাহকে তাঁর যথাযথ ভয়ের সঙ্গে ভয় কর, এবং কখনো মুসলিম না হয়ে মরো না।”— সূরা আলে ইমরান ৩:১০২এই আয়াত নির্দেশ করে— আল্লাহভীতি কেবল বাহ্যিক আচরণ নয়; এটি অন্তরের সতর্কতা, ইখলাস ও আত্মনিয়ন্ত্রণের সমন্বয়।কুরআনে আল্লাহভীতির ক্ষেত্রে দুটি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে—খাওফ (خوف) ও খাশিয়া (خشية)।فَلَا تَخَافُوهُمْ وَخَافُونِ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ“তোমরা তাদেরকে ভয় করো না; বরং আমাকে ভয় করো, যদি তোমরা মুমিন হও।”— সূরা আলে ইমরান ৩:১৭৫إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ“নিশ্চয় আল্লাহকে তাঁর বান্দাদের মধ্যে তারাই প্রকৃত অর্থে ভয় করে, যারা জ্ঞানী।”— সূরা ফাতির ৩৫:২৮রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:“আমি তোমাদের মধ্যে আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয় করি এবং তাঁর ব্যাপারে সবচেয়ে অধিক সচেতন।”— সহিহ বুখারি ৬১০১; সহিহ মুসলিম ২৩৫৬তাকওয়া হলো অন্তরের প্রহরী। এক সাহাবী তাকওয়ার উদাহরণ দিয়েছিলেন কাঁটাযুক্ত পথের সঙ্গে—যেখানে মানুষ অত্যন্ত সতর্কভাবে চলাফেরা করে। দ্বীনের পথে চলাও তেমন সতর্কতার দাবি রাখে—চোখের গুনাহ, জিহ্বার গুনাহ, সন্দেহযুক্ত উপার্জন—সবকিছু থেকে বাঁচার সচেতন প্রচেষ্টা।রমজান আমাদের শেখায় ক্ষুধা সহ্য করা সহজ, কিন্তু নফসকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তাকওয়া মানে একান্তে থেকেও আল্লাহর উপস্থিতি অনুভব করা। এ অনুভূতি যার অন্তরে জাগ্রত হয়, তার জীবনই হয়ে ওঠে ইবাদত। দ্বিতীয় স্তম্ভ: কুরআনের সাথে প্রাণের সম্পর্ক আত্মার পুনর্জন্মআল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ রমজান মাস, যাতে নাজিল করা হয়েছে কুরআন মানবজাতির জন্য হিদায়েতস্বরূপ। (সুরা আল-বাকারা ২:১৮৫)আরেক স্থানে, إِنَّ قُرْآنَ الْفَجْرِ كَانَ مَشْهُودًا নিশ্চয় ফজরের কুরআন (তিলাওয়াত) উপস্থিত ও সাক্ষ্যপ্রাপ্ত। (সুরা আল-ইসরা ১৭:৭৮) রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সে, যে কুরআন শিক্ষা করে এবং শিক্ষা দেয়। (সহিহ বুখারি ৫০২৭)রমজান ও কুরআনের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। কুরআন কেবল তিলাওয়াতের গ্রন্থ নয়; এটি হৃদয়ের রূপান্তরের আলো। আল্লাহ তাআলা বলেন, إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ মুমিন তো তারাই, যাদের সামনে আল্লাহর কথা স্মরণ করা হলে হৃদয় বিগলিত হয়। তৃতীয় স্তম্ভ: লাইলাতুল কদর এক রাতে অনন্ত সম্ভাবনা আল্লাহ তাআলা বলেন, لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। (সুরা আল-কদর ৯৭:৩) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরে কিয়াম করবে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। (সহিহ বুখারি ২০১৪; সহিহ মুসলিম ৭৬০)লাইলাতুল কদর হলো ভাগ্যনির্ধারণের রাত, রহমতের রাত, ক্ষমার রাত। এ রাতের আমল পরিমাণে কম হলেও মর্যাদায় অপরিসীম। রাসুল (সা.) শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন, পরিবারকে জাগিয়ে তুলতেন এবং ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। এটি আমাদের শেখায় লাইলাতুল কদরের অনুসন্ধান একটি সচেতন ও সক্রিয় প্রচেষ্টা।রমজানপরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি তাকওয়া আমাদের চরিত্র গড়ে, কুরআন আমাদের চিন্তা গড়ে, লাইলাতুল কদর আমাদের ভবিষ্যৎ গড়ে। যদি রমযান শেষে আমরা আগের মতোই থাকি, তবে বুঝতে হবে আমরা রমজানের বাহ্যিকতা পেয়েছি, সারবস্তু পাইনি।আসুন, এ রমজানকে করি আত্মশুদ্ধির অঙ্গীকার, কুরআনের সাথে নবায়িত সম্পর্কের অঙ্গীকার এবং লাইলাতুল কদরের সন্ধানে এক আন্তরিক অভিযাত্রা। আল্লাহ আমাদের ইখলাস দান করুন, আমল কবুল করুন এবং রমজানের প্রকৃত স্বাদ আস্বাদনের তাওফিক দিন।আমিন।লেখক: মুফতি জালাল উদ্দিন জামালীইসলামী মোটিভেশনাল স্পিকার