গত বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও আলুর বাজারে ধস নেমেছে। উত্তরের শস্য ভাণ্ডার জয়পুরহাটে বাম্পার ফলন হলেও কৃষকরা হাসিমুখে ফসল ঘরে তুলতে পারছেন না। উৎপাদন খরচ তুলতে পারাই দূরের কথা, পানির দরে আলু বিক্রি করে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা।সরজমিনে দেখা গেছে, জয়পুরহাটের বিস্তীর্ণ মাঠ জুড়ে আলু তোলার ব্যস্ততা। মাটির বুক চিরে বের হচ্ছে গোল আকৃতির এই সবজি। কিন্তু কৃষকের চোখে মুখে আনন্দের বদলে বিষণ্নতার ছাপ। বাজারের বর্তমান চিত্র তাদের সব স্বপ্ন ফিকে করে দিয়েছে। জয়পুরহাট সদর উপজেলার ধারকি ঘোনপাড়া গ্রামের কৃষক আজিজার রহমান জানান, গত বছর লাভের আশায় ১০০ বস্তা আলু হিমাগারে রেখেছিলাম। প্রতিবস্তা ১৫০০ টাকায় রাখলেও উত্তোলনের সময় মাত্র ৫০০ টাকা পেয়েছি। সেই ক্ষতি পোষাতে এবারও ৬ বিঘা জমিতে আলু লাগিছি। কিন্তু এবারও লাভ হলো না। প্রতি বিঘায় ৩৫-৪০ হাজার টাকা খরচ হলেও বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২০-২৫ হাজার টাকায়। আরও পড়ুন: গোমতীর চরে আলু-কুমড়ার সমন্বিত চাষ, তবুও ক্ষতির মুখে চাষিরা এতে আজিজার রহমানসহ জেলার অন্যান্য কৃষক দিশেহারা। আগামীতে আলু উৎপাদনে না যাওয়ার ঘোষণা দিচ্ছেন তারা। জয়পুরহাট সদর উপজেলার বানিয়াপাড়া গ্রামের কৃষক শহিদুল সরদার, খাঁ পাড়ার আলম হোসেন ও সরদার পাড়ার এরশাদুল হক বলেন, গত বছর আলুর দাম না পাওয়ায় হিমাগারে শত শত বস্তা আলু ফেলে দিয়েছিলাম। অনেক আশা নিয়ে এবার আলু লাগালাম, তাতেও লাভ হলো না। বিঘায় ৩০-৩৫ হাজার টাকা খরচ করে উঠছে মাত্র ২০-২৫ হাজার টাকা। তাই আগামী বছরগুলোতে আর আলু লাগাবো না। তবে কালাই উপজেলার কৃষক মিজানুর রহমান, আব্দুল হাব ও নাহিদ ইসলাম কিছুটা আশাবাদী। তারা বলেন, যদি জয়পুরহাটের আলু বিদেশে রফতানি করা যায়, তাহলে দাম ভালো পাওয়া যাবে। এছাড়া এই জেলায় আলু নির্ভর শিল্প কল কারখানা গড়ে তোলা সম্ভব হলে আলু নিয়ে আর ঝামেলা হবে না। এজন্য এমপি ও মন্ত্রীদের সদিচ্ছা প্রয়োজন। জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার বটতলী বাজারের পাইকারি আড়তদার মিজানুর রহমান বলেন, মৌসুমের শুরুতে প্রতিমণ আলুর বাজার ছিল ১২-১৩শ টাকা। এখন আলু প্রকারভেদে স্টিক ৩০০ টাকা, ১২-১৩ জাতের আলু ২৮০ টাকা এবং গ্র্যানুলা ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। জয়পুরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক ডা. মাহবুব হাফিজ বলেন, সরকার যদি ব্যবসায়ীদের সহজ শর্তে ও কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা করে দেয়, তবে এখানে অনেক উদ্যোক্তা গড়ে উঠবে। এতে আলু নির্ভর শিল্প কল কারখানা গড়ে উঠার পাশাপাশি বিদেশে রফতানি সহজ হবে এবং কৃষকরা লোকসানের হাত থেকে বাঁচবে। আরও পড়ুন: পানির চেয়ে কম দামে মিলছে আলু, লোকসানে রংপুরের চাষিরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক একেএম সাদিকুল ইসলাম জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় জয়পুরহাটে এ বছর প্রায় ৪০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে, যা থেকে ১০ লাখ মেট্রিক টন আলু উৎপাদন হবে। আলুর ব্যাপক ফলন হলেও দাম নিয়ে কৃষকরা হতাশ। জয়পুরহাটের উৎপাদিত আলু বিদেশে রফতানির ব্যবস্থা করা উচিত। জয়পুরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেন, এই সংকট নিরসনে জেলায় আলু নির্ভর একটি শিল্প কল কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হবে। উত্তরের সীমান্ত ঘেঁষা এই জেলা আলু উৎপাদনের জন্য অন্যতম। ধান চাষে কিছুটা লাভ হলেও আলু চাষে কৃষকরা খরচও তুলতে পারছেন না। কৃষকদের কথা চিন্তা করে আমরা আলু নির্ভর শিল্প কল গড়ে তোলার চিন্তা ভাবনা করছি। জয়পুরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, জেলায় এবার প্রায় ৪০ হেক্টর জমিতে আলু উৎপাদন হয়েছে, যা থেকে ১০ লাখ মেট্রিক টন আলু আশা করা হচ্ছে।