ইফতারিতে ছোলা, মুড়ি, বেগুনি, পেঁয়াজু ছাড়া বাঙালি চিন্তাই করতে পারেন না। রোজা আসলেই বেড়ে যায় মুড়ির চাহিদা। আর সেই মুড়ি যদি হয় হাতে ভাজা, তাহলে তো কথাই নেই। টাঙ্গাইলে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে হাতে ভাজা মুড়ি। জেলার কালিহাতী উপজেলার প্রায় দুই শতাধিক পরিবার সারা বছর ব্যস্ত থাকেন মুড়ি ভাজতে। রমজানকে কেন্দ্র করে দিন রাত সমান তালে ব্যস্ত সময় পার করছেন হাতে ভাজা মুড়ির কারিগররা। নিন্ম আয়ের নারীরা কোনো রাসায়নিক পদার্থ ছাড়াই মুড়ি ভাজেন। তাই বাজারের অন্য মুড়ির চেয়ে এটি বেশি স্বাস্থ্যকর। তাদের হাতে ভাজা মুড়ি জেলার চাহিদা মিটিয়ে জেলা রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় চলে যাচ্ছে। জানা যায়, টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার দৌলতপুর গ্রাম। রমজানকে কেন্দ্র করে গ্রামটির অধিকাংশ বাড়িতেই এখন ব্যস্ততা মুড়ি ভাজা নিয়ে। মাটির চুলা, বড় লোহার কড়াই আর খুন্তির ছন্দে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে গ্রামীণ স্বাদের ঐতিহ্যবাহী হাতে ভাজা মুড়ি। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই শুরু হয় কর্মযজ্ঞ। প্রথমে ধান ভিজিয়ে সিদ্ধ করা হয়। এরপর সারাদিন রোদে শুকিয়ে তৈরি করা হয় চাল। সেই চালই আবার আগুনের তাপে ফুলে ওঠে মচমচে মুড়িতে। হাতে ভাজা মুড়ির চাহিদা বাড়ায় সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চলে এই ভাজা-ভাজির কাজ। এই কাজে সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করেন বাড়ির নারীরাই। স্বামী-সন্তানরা সহযোগিতা করলেও মূল দায়িত্ব থাকে তাদের কাঁধে। আরও পড়ুনতিস্তার চরে স্বপ্নের আলো জ্বালাচ্ছে ‘লালমনি বিদ্যাপীঠ’শোলার তৈরি ফুলেই সংসার চলছে রেখা বিশ্বাসের সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল থেকে বাড়ির নারীরা মুড়ি তেরি করছেন। আর এ কাজে সহযোগিতা করছেন পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। দূর দূরন্ত থেকে ক্রেতারা মুড়ি কিনতে ভিড় করছেন তাদের বাড়িতে। মুড়ি প্রস্তুতকারীরা জাগো নিউজকে বলেন, ‘রমজান মাস আসলে হাতে ভাজা মুড়ির চাহিদা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। ভোর থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়। ৫ কেজি মুড়ি সাড়ে ৪শ’ টাকায় বিক্রি করছি। তবে পরিশ্রমের তুলনায় লাভ খুব বেশি নয়। সংসারের সব খরচ এর উপর নির্ভরশীল। আমরা সরকারের কাছে সহযোগিতা কামনা করছি।’ মুড়ি প্রস্তুতকারক নূরজাহান জাগো নিউজকে বলেন, ‘রমজান মাসে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করছি। অনেকই মেশিংয়ের মুড়ি পছন্দ করেন না। তাই হাতে ভাজা মুড়ির চাহিদা বেশি। আমার এ কাজে স্বামী ও ছেলে সহযোগিতা করে থাকে। প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ কেজি মুড়ি ভাজতে পারি।’ আরেক নারী জাগো নিউজকে বলেন, ‘আগের থেকে এখন মুড়ি বেচা কেনা ভালোই হচ্ছে। আমরা ইরি এবং আমন ধানের মুড়ি বেশি ভেজে থাকি। রমজান মাস ছাড়া অন্যন্য মাস খুব কম চলে। এখন প্রতিদিন প্রায় ৫০ কেজি হাতে ভাজা মুড়ি তৈরি করতে পারি। প্রতি কেজি মুড়ি ৯৫-১০০ টাকায় বিক্রি করছি। সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সহযোগিতা পাইনি। অল্প সুদে ঋণ পেলে আমাদের ব্যবসা আরও ভালো হতো।’ কুদ্দুস নামের আরেক কারিগর জাগো নিউজকে বলেন, ‘সারা বছরই কম বেশি মুড়ি বিক্রি করি। তবে রোজার মাসে কয়েকগুণ বেশি আমরা মুড়ি বিক্রি করতে পারি। টাঙ্গাইল ছাড়াও হাতে ভাজা মুড়ি দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়।’ হাতে ভাজা মুড়ি কিনতে আসা ভূঞাপুরের আল আমিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি দোকানের জন্য ১০০ কেজি মুড়ি ক্রয় করলাম। হাতে ভাজা মুড়ির চাহিদা বেশি। প্রয়োজন হলে এখান থেকে আরও মুড়ি ক্রয় করবো।’ এ ব্যাপারে কালিহাতী উপজেলা নির্বাহী অফিসার খায়রুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘ক্যামিকেল মুক্ত হওয়ায় হাতে ভাজা মুড়ির স্বাদ অতুলনীয়। সারাদেশেই এর সুপরিচিতি রয়েছে। আমাদের কাছে যদি কেউ সরকারি সহযোগিতা কিংবা ঋণ চায়, তাহলে তাদের সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।’ আব্দুল্লাহ আল নোমান/কেএসকে