ঈদ ঘিরে কেরানীগঞ্জে পাইকারি কাপড় বাজারে ভিড়

ভোর হতে না হতেই বুড়িগঙ্গার তীরে শুরু হয় কর্মব্যস্ততা। ট্রলার থেকে নামছে কাপড়ের গাঁট, আর ভ্যানগাড়িগুলো টইটম্বুর হয়ে ছুটছে বড় বড় শো-রুমের দিকে। দেশের বৃহত্তম তৈরি পোশাকের পাইকারি বাজার কেরানীগঞ্জে এখন ঈদের কেনাকাটার ধুম। গত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের ঈদে বিক্রির পরিমাণ এবং ক্রেতাদের আনাগোনা দুই-ই আশাব্যঞ্জক বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, কেরানীগঞ্জের কালিগঞ্জ ও শুভাঢ্যা এলাকার পাইকারি পোশাক পল্লী মানেই দেশের পোশাকের ‘পাওয়ার হাউজ’। ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, এখানকার অলিগলি তত বেশি সরগরম হয়ে উঠছে। বুড়িগঙ্গার তীরের এই বিশাল পাইকারি বাজারে এখন দম ফেলার সময় নেই কারিগর থেকে শুরু করে কাপড় মালিক-ব্যবসায়ীদের। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদের প্রায় মাসখানেক আগে থেকেই পাইকারি বিক্রি বাড়ে। তবে এবার জাতীয় নির্বাচন থাকায় বিক্রি কম ছিল। আগামী ১০ রমজানের পর আরেক ধাপে বিক্রি বাড়ার প্রত্যাশা ব্যবসায়ীদের। ব্যস্ততার চিত্রকেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা, আগা নগর এবং কালিগঞ্জ এলাকায় প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার ছোট-বড় কারখানা ও শো-রুম রয়েছে। মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) ভোর থেকে সরেজমিন দেখা যায়, প্রতিটি দোকানেই পাইকারদের উপচে পড়া ভিড়। কেউ নমুনা (স্যাম্পল) দেখছেন, কেউ দরদাম করছেন, আবার কেউ ট্রাকে পণ্য তুলছেন। ক্রেতা-বিক্রেতারা যা বলছেনখাজা সুপার মার্কেটের এক ব্যবসায়ী বলেন, আমাদের এখানে ঘুমের কোনো সময় নেই। গত ১৫ দিন ধরে কারিগররা শিফট করে কাজ করছেন। সারাদেশ থেকে পাইকাররা আসছেন। কেউ আসছেন সিলেট থেকে, কেউ পঞ্চগড় থেকে। আগা নগরের ‘মুসলিম কালেকশন’ এর স্বত্বাধিকারী জাহিদ বলেন, এবারের ঈদে আমরা ফেব্রিক্সের মানের ওপর বেশি জোর দিয়েছি। প্রচণ্ড গরমের কথা মাথায় রেখে সুতি এবং লিনেন কাপড়ের ওপর কাজ করা হয়েছে বেশি। গত বছরের তুলনায় এবার বেচা-কেনা প্রায় ২০-৩০ শতাংশ বেশি। বিশেষ করে পাঞ্জাবি ও বাচ্চাদের সেট আইটেমগুলো হট কেকের মতো বিক্রি হচ্ছে। বগুড়া থেকে আসা খুচরা ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম বলেন, আমি প্রতি বছর এখান থেকেই মাল নিই। ঢাকার বড় বড় শপিং মলে যে পোশাক ২-৩ হাজার টাকায় বিক্রি হয়, আমরা এখান থেকে তা ৭০০-৯০০ টাকায় পাইকারি নিতে পারি। তবে এবার ভিড় অনেক বেশি। রাস্তায় যানজটের কারণে মাল ট্রাকে তুলতে অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে। অনলাইন শপ ‘হ্যাপি জোন’-এর মালিক ফারহানা আক্তার বলেন, আমি আগে ভারত থেকে থ্রি-পিস আনতাম। কিন্তু এবার কেরানীগঞ্জের থ্রি-পিস ও কুর্তির ডিজাইন দেখে আমি অবাক। বিশেষ করে অর্গানজা এবং ডিজিটাল প্রিন্টের কাজগুলো দারুণ। মান ভালো হওয়ায় কাস্টমারদের ভালো সাড়া পাচ্ছি। এবারের ঈদের ট্রেন্ড: কোন কাপড়ে মানুষের আগ্রহ বেশি?বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এবার ফ্যাশনে বৈচিত্র্য এসেছে। ক্রেতারা ঝকঝকে জাঁকজমকপূর্ণ কাপড়ের চেয়ে আরামদায়ক ও ট্রেন্ডি পোশাকের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। পুরুষদের জন্য এবার ‘ডিজিটাল প্রিন্ট’ এবং ‘সাদা সুতি কাবলি’ পাঞ্জাবির ব্যাপক চাহিদা। এছাড়া কলার ও হাতায় হালকা কাজ করা সেমি-ফিটিং পাঞ্জাবিগুলো তরুণদের পছন্দের শীর্ষে। মেয়েদের পোশাকে নায়রা কাট, আলিয়া কাট এবং পাকিস্তানি স্টাইলের লং কামিজের চাহিদা বেশি। বিশেষ করে প্যাস্টেল রঙের অর্গানজা এবং জর্জেট কামিজগুলো সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে। শিশু ও বাচ্চাদের জন্য ‘বাবা সেট’ এবং সিন্থেটিক মিশ্রিত আরামদায়ক সুতি পোশাকের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। বডিকন ও জিন্স: কেরানীগঞ্জের জিন্স প্যান্টের সুনাম দেশজুড়ে। এবার স্ট্রেচাবল ডেনিম এবং কার্গো প্যান্টের ভালো অর্ডার পাচ্ছেন বিক্রেতারা। কারিগরদের কথাকালিগঞ্জের একটি ছোট কারখানায় সেলাই মেশিনে মগ্ন ষাটোর্ধ্ব আব্দুল মজিদ। ৩০ বছর ধরে এখানে কাজ করছেন তিনি। ঘাম মুছতে মুছতে আব্দুল মজিদ জাগো নিউজকে বলেন, যখন দেখি আমাদের বানানো পাঞ্জাবি পরিধান করে ঈদের দিন মানুষ নামাজ পড়তে যায়, তখন সব কষ্ট ভুলে যাই। মালিক বোনাস দিয়েছেন, এবার ছেলে-মেয়েদের জন্য ভালো কিছু নিয়া বাড়ি যাবো। মজিদ মিয়ার মতো হাজারো কারিগরের হাতের দক্ষতাই কেরানীগঞ্জকে আজ দেশের পোশাকের রাজধানী বানিয়েছে। ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশাকেরানীগঞ্জের ব্যবসায়ীরা মনে করেন, কিছু সমস্যার সমাধান করে এখানকার সম্ভাবনা আরও অনেক বেশি বাড়ানো সম্ভব। অসুবিধার প্রথম বিষয় নাজুক যোগাযোগ ও যানজট। রাস্তা সরু হওয়ায় পণ্য পরিবহনে প্রচুর সময় নষ্ট হয়। ফ্লাইওভার বা প্রশস্ত রাস্তার দাবি দীর্ঘদিনের। দ্বিতীয়ত ব্যাংকিং সুবিধা বাড়ানো। কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয় এখানে, কিন্তু সেই তুলনায় ব্যাংক বুথ বা নগদ টাকা জমা দেওয়ার সহজ ব্যবস্থা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। প্রয়োজন নিরাপত্তা ও বৃহৎ পার্কিং এলাকা। দূর-দূরান্ত থেকে আসা পাইকারদের জন্য বড় ট্রাক পার্কিং জোন এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন বলে জানান ব্যবসায়ীরা। এছাড়াও ঘিঞ্জি এলাকা হওয়ায় আগুনের ঝুঁকি থাকে। প্রতিটি মার্কেটে আধুনিক ফায়ার ফাইটিং সিস্টেম নিশ্চিত করা জরুরি, বলে অনেক ব্যবসায়ী বলেন। কেরানীগঞ্জের স্থানীয় বাসিন্দা এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক রাইসুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, কেরানীগঞ্জের পাইকারি পোশাক বাজার বর্তমানে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগভিত্তিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তিকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। স্বল্প পুঁজিতে গড়ে ওঠা দেশীয় পোশাক উৎপাদন ও বিপণন উদ্যোগ ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে এবং আমদানিনির্ভর ভোগ ব্যবস্থার বদলে উৎপাদনমুখী অর্থনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলছে। দেশীয় পোশাকের প্রতি ভোক্তাদের বাড়তি আগ্রহ স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা ও ব্রান্ডমূল্য বৃদ্ধির প্রমাণ, যা বৈদেশিক পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়তা করছে। তিনি আরও বলেন, নীতিগত সহায়তা, অবকাঠামো উন্নয়ন, মাননিয়ন্ত্রণ, ব্র্যান্ডিং, সহজ অর্থায়ন ও প্রযুক্তি আধুনিকায়নের মাধ্যমে এ শিল্প খাতকে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নিলে কেরানীগঞ্জ আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নিতে পারবে। সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ রপ্তানিমুখী শিল্পায়নের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ভূমিকা রাখতে পারে। তাই কেরানীগঞ্জের পাইকারি পোশাক বাজারকে সুসংগঠিত, টেকসই ও রপ্তানিমুখী শিল্প ক্লাস্টারে রূপান্তর করা সময়ের দাবি, যা জাতীয় অর্থনীতিকে আরও স্বনির্ভর ও শক্তিশালী করতে সক্ষম। এমডিএএ/এমআইএইচএস/