কক্সবাজার শহরের কলাতলী এলাকায় নতুন স্থাপন করা একটি এলপিজি গ্যাস পাম্পে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১০ জন দগ্ধ হয়েছেন। এর মধ্যে ৬ জনকে রাতেই চট্টগ্রাম মেডিকেলে পাঠানো হয়েছে। দগ্ধদের মধ্যে দুইজনকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি ও বাকি দুইজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ছাড় দেয়া হয়েছে। আগুনে আশপাশের অন্তত বেশ কিছু স্থাপনা এবং গাড়ি পুড়ে গেছে।বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) মাগরিবের পরপরই প্রথমে পাম্পে লিকেজ শুরু হয় বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের উপ-সহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন। তিনি বলেন, প্রথম দফায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর ফের রাত ৮টার দিকে দ্বিতীয় গ্যাস পাম্পে বিস্ফোরণ হয়ে আগুনের সূত্রপাত হয়। তাৎক্ষণিক ফায়ার সার্ভিসের ৫টি ইউনিট ঘটনাস্থলে এসে আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ শুরু করে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিস, সেনা ও বিমান বাহিনীর ৯টি ইউনিট ঘটনাস্থলে কাজ করে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের আরও একটি ইউনিটকে রিজার্ভ রাখা হয়। তবে রাত ১টা দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও গ্যাস লিকেজ বন্ধ করা যায়নি। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দগ্ধরা হলেন: চকরিয়ার সিকদার পাড়ার মিজানুর রহমানের ছেলে সাকিব (২৪), রামুর জোয়ারিয়ানালার আবুল হোসেনের ছেলে মো: সিরাজ (২৪), কলাতলীর মৃত জাকারিয়ার ছেলে আব্দুর রহিম (৪৫), আদশগ্রামের আবদু রশিদের ছেলে মোতাহের (৪৫), কক্সবাজার পৌরসভার বাহারছড়ার কালামিয়ার ছেলে কামরুল হাসান,(৩০), আবু তাহের (৪৫), মেহেদী (২৬), খোরশেদ আলম (৫৩) ও টিটন সেন (৪০)। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. আবু সাইদ বলেন, ‘বার্ন ইউনিট না থাকায় দগ্ধদের মধ্যে ৬ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে আবদুর রহিম ও আবু তাহেরের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তারা ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ আক্রান্ত হয়েছেন। বাকীদের মধ্যে দুজনকে হাসপাতালে ভর্তি ও দুইজনকে চিকিৎসা শেষে ছাড় দেয়া হয়েছে। এদিকে রাত সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে সরেজমিনে খোঁজ নিতে আসেন কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান। আরও পড়ুন: রূপগঞ্জে মাদ্রাসায় অগ্নিকাণ্ডে ১০ টি কক্ষ পুড়ে ছাই, ২০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি এসময় তিনি বলেন, গ্যাস পাম্পে বিস্ফোরণের ঘটনায় হাসপাতলে ১০ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। এদের মধ্যে দুইজন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বাকি ছয়কে চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেলে প্রেরণ করা হয়েছে। একজন সামান্য আহত এখনও হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। দ্রুত সুচিকিৎসার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম হাসপাতালে ইতিমধ্যেই খবর দেয়া হয়েছে যাতে রোগীদের দ্রুত এবং সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়। এদিকে অগ্নিকাণ্ডের ফলে পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং নিরাপত্তার স্বার্থে মহাসড়কে দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া হয়। সরেজমিনে দেখা যায়, পাম্পে থাকা গ্যাস শহরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে, যা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। ঘটনার পরপরই পুরো কক্সবাজার শহরজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তা নিশ্চিত ও উৎসুক জনতার ভিড় এড়াতে সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, নৌ স্কাউট, রেড ক্রিসেন্ট সদস্যরা ঘটনাস্থলে কাজ করে। প্রত্যক্ষদর্শী মোহাম্মদ রিয়াদ বলেন, মাগরের পর থেকে গ্যাস লিকেজের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিস এসে পরিস্থিতি মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে আনছিল। কিন্তু প্রায় ঘণ্টা খানেক পরে পাম্পে বিস্ফোরণে ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার স্থানের পাশে একটি বাসা রয়েছে। এতে কয়েকটি জীপ গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কয়েকজন মানুষ আগুনে দগ্ধ হয়েছে।’ প্রত্যক্ষদর্শী ইউসুফ আলী বলেন, আমি কলাতলের দিকে আসছিলাম, অর্ধেক পথ পার হওয়ার পর দেখলাম একটি বড় বিস্ফোরণ হয়েছে। বিস্ফোরণের ধাক্কায় আমি নিজেও পড়ে গিয়েছিলাম। পাশেই এক ড্রাইভার, টমটম ড্রাইভার, তার গাড়ি উল্টে পড়েছে। আমরা চার-পাঁচজন মিলে তাকে গাড়িতে তুলে নিরাপদ স্থানে নিয়ে গিয়েছি।’ এদিকে, পাম্প থেকে চারদিকে গ্যাস ছড়িয়ে পড়ায় মারাত্মক ঝুঁকির সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনার জন্য গ্যাস পাম্প মালিককে দায়ী করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। স্থানীয় বাসিন্দা শরীফ আহমদ বলেন, জনবহুল বসতি এলাকায় কোনো ধরনের গ্যাস পাম্প স্থাপন করা উচিত হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে এর অনুমতি দেয়াও সঠিক নয় এবং এটি একটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।’ মো. ওসমান গণি বলেন, এ ধরনের পাম্প বসতবাড়ির পাশে স্থাপন করা মোটেও সঠিক নয়। এটি একটি আবাসিক ও জনবহুল এলাকা, যেখানে প্রচুর মানুষ বসবাস করে। জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখানে সতর্ক থাকা আবশ্যক। গুরুত্বপূর্ণ এ ধরনের স্থানে পাম্প রাখা ঝুঁকিপূর্ণ এবং অযৌক্তিক। বিমান বাহিনীর কক্সবাজারস্থ অফিসার কমান্ডিং স্কোয়াডন লিডার ফারসিন বলেন, বিমান বাহিনীর দুটি টিম দুটি ভেহিকেল নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। দুটি ভেহিকেল দুই রাউন্ড রিফিল সম্পন্ন করেছে। দুটি ভেডিকেল ৪ বার রিফিল করে এনে আগুন নেভানোর জন্য কাজ করছে। আমরা অবিরত পানি ব্যবহার করছি, তবে গ্যাস এখনও বের হচ্ছে। এছাড়াও স্থানীয় লোকদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করার কাজ করছে বিমান বাহিনী। কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের উপ-সহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, আগুন প্রায় নিয়ন্ত্রণে এসেছে, তবে গ্যাস নিঃসরণের কারণে আশেপাশের মানুষদের সতর্ক করা হচ্ছে। অনুরোধ করা হচ্ছে কেউ সিগারেট বা অন্য কোনো আগুনের উৎস ব্যবহার করবেন না, কারণ গ্যাস নিঃসরণের ফলে আগুন আবার ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। আরও পড়ুন: লঞ্চে অগ্নিকাণ্ড: মৃত্যুপুরীর সেই দুঃসহ রাতের স্মৃতি আজও কাঁদায় আগুনের সূত্রপাতের ব্যাপারে সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, গ্যাস লিকেজ ছিল এবং আনলোডের সময় আগুন ধরে যায়। ফায়ার সার্ভিসের ৫টিসহ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর মোট ৯টি ইউনিটের সদস্যরা এবং তাদের যানবাহনগুলো আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করেছে। আগুনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১০ জন আহত হয়েছে। তার মধ্যে ৬ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রেরণ করা হয়েছে। সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন আরও বলেন, গ্যাস পাম্প ষ্টেশনটি স্থাপনের ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিসের কোন অনুমতি নেয়নি মালিক কর্তৃপক্ষ। এব্যাপারে জেলা প্রশাসক একটি তদন্ত কমিটি গঠন করবেন এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।