কৃষক মানব সভ্যতার এক অবিচ্ছেদ্য চরিত্র। রাষ্ট্র, অর্থনীতি ও সভ্যতার প্রতিটি স্তরে কৃষকের শ্রম, ত্যাগ ও সংগ্রাম অনিবার্য ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। অথচ ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতা হলো কৃষক শ্রেণি প্রায় সব সময়ই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামোর প্রান্তে অবস্থান করেছে। তেভাগা আন্দোলন ও নানকার বিদ্রোহ থেকে ২৪ এর জুলাই গণ অভ্যুত্থান পর্যন্ত প্রতিটি গণ আন্দোলনের সময়ে সবচেয়ে বেশি প্রাণ দিয়েছে কৃষক ও তাদের সন্তানেরা। কিন্তু রাষ্ট্র কখনো তাদের পাশে দাঁড়ায়নি। দেশের প্রধান উৎপাদক হিসেবে কৃষককে সেই প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়া হয়নি। এই বক্তব্যটি কেবল আবেগঘন অভিযোগ নয়; বরং এটি দীর্ঘ রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার একটি গভীর প্রতিফলন। বিশেষ করে বাংলাদেশ-এর ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কৃষকের সংগ্রাম এবং রাষ্ট্রীয় অবহেলার এই দ্বৈত বাস্তবতা বারবারই আমাদের সামনে ফিরে এসেছে। বাংলার কৃষক সমাজের সংগ্রামের ইতিহাস বহু পুরোনো এবং গভীরভাবে প্রোথিত। ঔপনিবেশিক আমলে জমিদারি প্রথা কৃষকদের ওপর যে শোষণমূলক কাঠামো তৈরি করেছিল, তা ছিল নির্মম, নিষ্ঠুর এবং মানবিক মর্যাদাবিরোধী। জমিদার ও মহাজনী শোষণের চাপে কৃষকেরা ধীরে ধীরে প্রায় ভূমিদাসে পরিণত হয়েছিল। তারা অক্লান্ত পরিশ্রম করত, জমিতে উৎপাদন করত, অথচ তাদের জীবন ও জীবিকার ওপর স্বাধীনতা ও অধিকার ছিল অত্যন্ত সীমিত। উৎপাদনের নিয়ন্ত্রণ ছিল অন্যের হাতে, আর দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তা ছিল তাদের নিত্যসঙ্গী। এই দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও শোষণই কৃষকের মনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দেয়, যা এক সময় সংগঠিত প্রতিরোধে রূপ নেয়। এই প্রেক্ষাপটেই নানকার বিদ্রোহের সূচনা ঘটে, যা কৃষক প্রতিরোধ আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। এই বিদ্রোহে কৃষকেরা জীবন বিসর্জন দিয়েছিল, কিন্তু রাষ্ট্রীয় কাঠামো তাদের ন্যায্য দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল ভূমিকা গ্রহণ করেনি। বরং তৎকালীন প্রশাসনিক ও শাসনব্যবস্থা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জমিদার শ্রেণির স্বার্থ রক্ষায় সক্রিয় থেকেছে এবং কৃষকের আর্তি ও প্রতিবাদকে উপেক্ষা করেছে। এই বাস্তবতা কেবল ঔপনিবেশিক আমলে সীমাবদ্ধ ছিল না। স্বাধীনতার সংগ্রামেও কৃষকের অবদান ছিল অসামান্য। মুক্তিযুদ্ধের সময় গ্রামের প্রতিটি ক্ষেত্র ছিল প্রতিরোধের প্রাথমিক স্তম্ভ। কৃষকরা খাদ্য, আশ্রয় এবং তথ্য সহায়তা দিয়ে স্বাধীনতার যুদ্ধে অপরিসীম অবদান রেখেছে। তাদের অনেকেই সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল এবং অসংখ্য প্রাণ হারিয়েছে। ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে, ফসল নষ্ট হয়েছে, পরিবারগুলো চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়ে। স্বাধীনতা অর্জনের পরও কৃষি খাতকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি। কৃষি অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলেও কৃষকের আয় এবং সামাজিক মর্যাদা শিল্প বা সেবাখাতের তুলনায় পিছিয়ে আছে। ২৪–এর জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের মতো সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাগুলোতেও একই বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়েছে। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী সাধারণ মানুষের মধ্যে কৃষক পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতি সর্বাধিক লক্ষ্য করা যায়। কারণ কৃষক সমাজ রাষ্ট্রীয় নীতির পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে দ্রুত এবং গভীরভাবে অনুভব করে। কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং বাজার ব্যবস্থার অনিয়ম কৃষকের জীবনকে অনিশ্চয়তায় ফেলে। ফলে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের দাবিতে কৃষকের অংশগ্রহণ একটি স্বাভাবিক ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা। রাষ্ট্র কেন কৃষকের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছে, এই প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক অর্থনীতির কাঠামো বিশ্লেষণ করলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কার্যকরভাবে দৃশ্যমান। শিল্প ও বাণিজ্য খাত সাধারণত স্বল্প সময়ে তুলনামূলক দ্রুত অর্থনৈতিক ফলাফল প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়, ফলে এই খাতগুলো রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ, নীতিগত সুবিধা এবং প্রশাসনিক সমর্থন সহজেই লাভ করে। এর বিপরীতে কৃষি খাত প্রাকৃতিক ঝুঁকির ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল এবং এর উন্নয়ন প্রক্রিয়া স্বভাবতই ধীর ও দীর্ঘমেয়াদি। আবহাওয়া, জলবায়ু ও বাজারের অনিশ্চয়তা কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে। এসব বাস্তবতার কারণে নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে কৃষি খাত প্রায়ই অগ্রাধিকার তালিকার দ্বিতীয় সারিতে পড়ে যায় এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার গুরুত্ব যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে কৃষক সমাজ দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। তাদের শ্রম ও ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়েই রাষ্ট্র এবং অর্থনীতির ভিত্তি নির্মিত হয়েছে। তবু কৃষকের প্রাপ্য মর্যাদা আজও প্রতিষ্ঠিত না হওয়া একটি গভীর কাঠামোগত ব্যর্থতার পরিচয় বহন করে। নানকার বিদ্রোহ থেকে সাম্প্রতিক গণ অভ্যুত্থান পর্যন্ত কৃষকের আত্মত্যাগ আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে রাষ্ট্র যদি কৃষকের পাশে দৃঢ়ভাবে না দাঁড়ায়, তবে উন্নয়ন, অগ্রগতি এবং স্থিতিশীলতার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই একটি টেকসই, ন্যায়ভিত্তিক এবং সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনের জন্য কৃষকের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা সময়ের অন্যতম প্রধান ও অনিবার্য দাবি। কৃষকের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বও তুলনামূলকভাবে দুর্বল। গ্রামীণ জনগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও তাদের সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি সীমিত। কৃষক সংগঠনগুলো বিচ্ছিন্ন এবং নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় কার্যকর প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ। ফলে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রে কৃষকের স্বার্থ প্রায়ই ব্যবহার হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ঘাটতি থেকে যায়। সামাজিক মর্যাদার দিক থেকেও কৃষক দীর্ঘদিন অবহেলিত। আধুনিক নগরায়ণ এবং শিক্ষাব্যবস্থার প্রসারে কৃষিকে অনেক সময় পশ্চাৎপদ পেশা হিসেবে দেখা হয়। শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম কৃষি পেশা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, কারণ কৃষি লাভজনক এবং সম্মানজনক পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অথচ কৃষকই খাদ্য নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় কৃষিকে কেবল খাদ্য উৎপাদনের মাধ্যম হিসেবে দেখা হলে চলবে না; এটিকে মর্যাদাপূর্ণ অর্থনৈতিক খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অর্থনৈতিক দিক থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কৃষক উৎপাদনের মূল চালিকাশক্তি হলেও মূল্য সংযোজনের বড় অংশ মধ্যস্বত্বভোগী এবং বাজার ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে চলে যায়। কৃষিপণ্যের বাজারে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা না হলে কৃষকের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কৃষি ঋণ, প্রযুক্তি সহায়তা এবং আধুনিক অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিন ধরে ঘাটতি রয়েছে। তবে রাষ্ট্র কখনোই কৃষকের জন্য কাজ করেনি, এমন ধারণা সম্পূর্ণভাবে একমাত্রিক নয়। বিভিন্ন সময়ে কৃষি ভর্তুকি প্রদান, খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে, যা কৃষি খাতকে সহায়তা করার রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টারই অংশ। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার উৎসাহিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের ধারাবাহিকতা এবং সামগ্রিক কার্যকারিতা নিয়ে নানা প্রশ্ন থেকেই যায়। নীতির বাস্তবায়ন পর্যায়ে দুর্নীতি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব প্রায়ই প্রকট হয়ে উঠেছে। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে ঘোষিত নীতির সুফল মাঠপর্যায়ে পৌঁছায়নি এবং কৃষকের ন্যায্য প্রত্যাশা পূরণে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র নির্মাণে কৃষকের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা একটি নৈতিক ও অর্থনৈতিক দায়িত্ব। কৃষিকে কেবল উৎপাদন খাত হিসেবে নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার একটি মৌলিক ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, কৃষি প্রযুক্তির বিস্তৃত প্রসার ঘটানো, কৃষি শিক্ষা উন্নয়ন এবং কৃষকের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রকে পরস্পরের সঙ্গে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়াই বর্তমান সময়ের অপরিহার্য দাবি। সর্বোপরি ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে কৃষক সমাজ দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। তাদের শ্রম ও ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়েই রাষ্ট্র এবং অর্থনীতির ভিত্তি নির্মিত হয়েছে। তবু কৃষকের প্রাপ্য মর্যাদা আজও প্রতিষ্ঠিত না হওয়া একটি গভীর কাঠামোগত ব্যর্থতার পরিচয় বহন করে। নানকার বিদ্রোহ থেকে সাম্প্রতিক গণ অভ্যুত্থান পর্যন্ত কৃষকের আত্মত্যাগ আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে রাষ্ট্র যদি কৃষকের পাশে দৃঢ়ভাবে না দাঁড়ায়, তবে উন্নয়ন, অগ্রগতি এবং স্থিতিশীলতার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই একটি টেকসই, ন্যায়ভিত্তিক এবং সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনের জন্য কৃষকের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা সময়ের অন্যতম প্রধান ও অনিবার্য দাবি। লেখক: কৃষিবিদ, কলামিস্ট ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন। rssarker69@gmail.com এইচআর/এমএস