বাগান থেকে বাজার সব জায়গার লেবু দামে আগুন

‘রমজানে সব শয়তানগুলো মনে হয় লেবুর বাগানে বাঁধা রয়েছে। তা না হলে ২-১ দিনের ব্যবধানে ২০ টাকা হালির লেবু কীভাবে ১২০ টাকা হয়?’ রাজধানী ঘেঁষা ঢাকার সবশেষ উত্তরের উপজেলা ধামরাই বাজারে লেবু কিনতে গিয়ে এভাবেই ক্ষোভ ঝাড়েন আলমাস হোসেন নামের বেসরকারি এক কর্মকর্তা। তিনি আরও বলেন, বাজারে কঠোর মনিটরিং না থাকায় বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছে বিক্রেতারা। লাভের আশায় রসবিহীন লেবু বাগান থেকে তুলে এনে বাজারে তুলছে। মনে হচ্ছে ক্রেতাদের ঠকাতেই দোকান খুলেছে তারা। উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য মতে, রাজধানীসহ আশপাশের বাজারের সিংহভাগ লেবুর সরবরাহ করা হয় ঢাকার ধামরাই থেকে। উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের অর্ধ শতাধিক গ্রামের প্রায় ৭০০ হেক্টরের বেশি জমিতে চাষ হয় নানা প্রজাতির লেবু। এসব লেবু পাইকারি বিক্রি হয় ধামরাইয়ে বিভিন্ন লেবু বাজারে। তেমনই এক পাইকারি বাজার রয়েছে ধামরাইয়ের বালিয়া এলাকায়। সেখানে কথা হয় মফিজুল নামের এক কৃষকের সঙ্গে। তিনি জানান, একবার লেবু বাগান করলে ১০-১২ বছর বাগান থেকে লেবু সংগ্রহ করা যায়। তবে লেবু তোলা হয় সমিতির মাধ্যমে। পাইকাররা বছর চুক্তিতে বাগান কিনে নেন। এরপর পাইকারদের সমিতির মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে লেবু তোলা হয়। বছরের শীতের শেষ সময়টিতে এসে লেবুর ফলন কিছুটা কমে যায়। ফলে গ্রীষ্ম বা বৃষ্টির সময়ে যেখানে ১০০ শতাংশ জমি থেকে বড় একেক টুকরি (৫ থেকে ৬ ফুট লম্বা) লেবু তোলা যায়, সেখানে শীতের সময় ওই টুকরি ভর্তি করতে ৪০০-৫০০ শতাংশ জমির লেবুর প্রয়োজন হয়। আবুল কাশেম নামে স্থানীয় আরেক লেবু চাষি বলেন, বর্তমান লেবু বাজার আমাদের জন্য স্বাভাবিক। কারণ এখন চৈত্র মাস, খরার সময়। জমির মাটি এখন খড়খড়ে, উর্বরতা কম। যে কারণে উৎপাদন কম। যখন ফসল উৎপাদন কম হয়, স্বাভাবিকভাবে দাম বেড়ে যায়। এক মাস পর এলে দেখবেন, বৃষ্টি হবে, উৎপাদন বেড়ে যাবে। তখন চাহিদা কমে যাবে, আমরা দাম কম পাবো। বর্তমানে ৩০০ শতাংশ ঘুরে এক খাচি (টুকরি) লেবু তুলি। একটি খাচি পূর্ণ করতে ৫০ গামলা লেবু লাগে। আর কিছু দিন গেলে, ১০০ শতাংশ জমিতে ৩ খাচি লেবু তুলতে পারবো। তখন চাহিদা থাকবে না। দেখা যাবে তখন যে শ্রমিক খরচ, সেটাও ভর্তুকি দিতে হবে। তিনি বলেন, এখন ডিজেল দিয়ে সেচ পাম্পের মাধ্যমে জমিতে পানি দিতে হচ্ছে, এটাও বাড়তি খরচ। ফলে এখন যে বেশি দাম পাচ্ছি, বছর শেষে দেখা যাবে কয়েক মাসের লোকসানসহ আমরা কিছুটা লাভ পাবো। পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা লেবু পাইকার আলী হোসেন বলেন, আমরা কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ী, শ্যাম বাজারে লেবু পাঠাই। সেখান থেকে অন্যান্য জায়গায় নিয়ে বিক্রি করে। আমাদের এখানে যে লেবু চাষ হয়, বাগানে বছরজুড়ে শ্রমিক কাজ করে, খরচ আছে। তারপর দেখা যায়, খুব অল্প পরিমাণ লাভ পাওয়া যায়। এখন ৪০-৬০ হাজার টাকা খাচি পাওয়া গেলেও, এক মাস পর দেখা যাবে এক খাচি লেবু বিক্রি হবে ১০ হাজার বা তারও কম টাকায়। তখন লোকসান হবে, এমনকি খরচও উঠবে না। এখনকার বাজারদরকে আমাদের প্রচুর লাভ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ধামরাই উপজেলা কৃষি অধিদপ্তরের উপজেলা কৃষি অফিসার মো. আরিফুর রহমান বলেন, কৃষির জন্য একটা সম্ভাবনাময় একটি উপজেলা ধামরাই। ধামরাইয়ের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী একটি ফসল লেবু। বড় একটি এলাকাজুড়ে লেবু চাষ হয়। বর্তমানে প্রায় ৭০০ হেক্টর জমি রয়েছে, যেখানে লেবু বাগান রয়েছে। আমাদের প্রায় এক হাজারের ওপরে লেবু চাষি রয়েছেন। তারা লেবু থেকে ভালো লাভ পাচ্ছেন। এখন বাজারে লেবুর প্রচুর চাহিদা রয়েছে, চাহিদা থাকায় দামটা একটু বেশি। হয়তো কিছুদিন পরে বৃষ্টিপাত হলে ও অফ সিজন শেষ হলে লেবুর উৎপাদন বেড়ে যাবে আর দামটাও কমে যাবে। এফএ/এমএস