পুলিশ চাইলেই কি কাউকে মারধর করতে পারে, আইনে কী আছে?

পুলিশ চাইলেই সাধারণ মানুষকে ধরে মারধর কিংবা তল্লাশি চালাতে পারে কি না, এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সাম্প্রতিক একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর ধানমন্ডি লেক এলাকায় হঠাৎ অভিযান চালায় পুলিশ। পরদিন একই ধরনের ঘটনা দেখা যায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। মাদকবিরোধী অভিযানের নামে সাধারণ শিক্ষার্থী, পথচারী এবং বিনোদনপ্রেমীদের যেভাবে জেরা, তল্লাশি ও ক্ষেত্রবিশেষে লাঠিপেটা করা হয়, তা নিয়ে এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে। ঘটনার ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, পুলিশ সদস্যদের কেউ কেউ নাগরিকদের মানিব্যাগ, পকেট এবং মোবাইল ফোন চেক করছেন কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই। এমনকি এক শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় ‘ভদ্রলোক ইফতারের পর এখানে আসে না’ বলে মন্তব্য করে মারধর করার দৃশ্যও ভাইরাল হয়েছে। রাতে কিশোররা অযাচিত ঘোরাঘুরি করলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলনের এমন ঘোষণার পরপরই এ অভিযানগুলো শুরু হয়। যদিও পরবর্তীতে শিক্ষামন্ত্রী তার এ নির্দেশনাটি নিজ নির্বাচনি এলাকা চাঁদপুরের জন্য দিয়েছেন এবং এটি সারাদেশের জন্য প্রযোজ্য নয় বলে জানিয়েছেন। মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা বলছেন, দেশের কোনো আইনই সাধারণ মানুষকে মারধরের অধিকার দেয়নি পুলিশকে। সাধারণ মানুষকে মারধর বেআইনি ও মানবাধিকার লঙ্ঘন। পুলিশের মূল দায়িত্ব জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বাহিনীর কিছু সদস্যের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড পুরো পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। জনগণের জানমাল রক্ষার পরিবর্তে যদি সাধারণ মানুষই নির্যাতনের শিকার হন, তবে তা রাষ্ট্র ও আইনের শাসনের জন্য উদ্বেগজনক। পুলিশ আপনাকে যে কোনো স্থানে থামিয়ে আপনার পরিচয় বা গন্তব্য জানতে চাইতে পারে, কিন্তু আপনাকে উত্তর দিতে বাধ্য করতে পারে না, যদি সেই উত্তর আপনাকে কোনো অপরাধে ফাঁসিয়ে দেয়। অর্থাৎ নিজেকে দোষী সাব্যস্ত করার মতো কোনো কথা বলার বিরুদ্ধে আপনার আইনি সুরক্ষা রয়েছে গত সোমবার রাতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদকবিরোধী অভিযানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থী ও বিপ্লবী যুব আন্দোলনের নেতা নাইম উদ্দীনসহ কয়েকজনের ওপর পুলিশের হামলার প্রতিবাদে পরদিন মঙ্গলবার শাহবাগ থানায় বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভকারীরা ‘হারুন গেছে যে পথে, মাসুদ যাবে সে পথে’, ‘আমার ভাইকে মারলো কেন, প্রশাসন জবাব চাই’, ‘শাহবাগ থানা জবাব চাই, আমার ভাইকে মারলো কেন’, ‘মাসুদের গদিতে, আগুন জ্বালো একসাথে’সহ নানান স্লোগান দেন। ওই রাতে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলমের নেতৃত্বে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানকালে শিক্ষার্থী ও দায়িত্বরত সাংবাদিকদের মারধরের ঘটনায় সমালোচনার মুখে পরদিনই (মঙ্গলবার) পুলিশের চার সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়। আরও পড়ুনডিসি মাসুদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে থানা ঘেরাও ঢাবি শিক্ষার্থীদেরসোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শিক্ষার্থীকে মারধর: ৪ পুলিশ সদস্য প্রত্যাহার পরে ডিসি মাসুদ জানান, সোমবার রাতের ঘটনায় জড়িত চার পুলিশ সদস্যকে ক্লোজড করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ঘটনায় আরও দু-তিনজনকে শনাক্তের চেষ্টা চলছে। তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জেরা বা জিজ্ঞাসাবাদের আইনি ভিত্তি কী?রাস্তায় পুলিশ কাউকে থামালে বা প্রশ্ন করলে অনেকেই ঘাবড়ে যান। তবে পুলিশ আইন ১৮৬১-এর ২৩ ধারা অনুযায়ী, অপরাধ প্রতিরোধ এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা পুলিশের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। ফৌজদারি কার্যবিধির (সিআরপিসি) ১৬১ ধারা পুলিশকে যে কোনো ব্যক্তিকে তদন্তের স্বার্থে মৌখিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করার ক্ষমতা দিয়েছে। তবে এ ক্ষমতার একটি সীমারেখা আছে। পুলিশ আপনাকে যে কোনো স্থানে থামিয়ে আপনার পরিচয় বা গন্তব্য জানতে চাইতে পারে, কিন্তু আপনাকে উত্তর দিতে বাধ্য করতে পারে না, যদি সেই উত্তর আপনাকে কোনো অপরাধে ফাঁসিয়ে দেয়। অর্থাৎ নিজেকে দোষী সাব্যস্ত করার মতো কোনো কথা বলার বিরুদ্ধে আপনার আইনি সুরক্ষা রয়েছে। তল্লাশির নিয়ম কী?কাউকে তল্লাশি করার প্রক্রিয়া ফৌজদারি কার্যবিধি এবং পুলিশ রেগুলেশনস বেঙ্গল (পিআরবি) দ্বারা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। চাইলেই একজন কনস্টেবল বা কর্মকর্তা কারও পকেটে হাত ঢোকাতে পারেন না। সাধারণ নিয়ম হলো, কোনো বদ্ধ স্থান বা ব্যক্তির দেহ তল্লাশির জন্য ম্যাজিস্ট্রেটের সার্চ ওয়ারেন্ট লাগে (ধারা ৯৪ ও ৯৬)। তবে তদন্তকারী কর্মকর্তা যদি মনে করেন ওয়ারেন্ট আনতে গেলে আলামত নষ্ট হবে, তবে তিনি কারণ লিপিবদ্ধ করে (ধারা ১৬৫) তাৎক্ষণিক তল্লাশি চালাতে পারেন। ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৩ ধারা অনুযায়ী, তল্লাশি হতে হবে স্বচ্ছ। পুলিশ যখন কাউকে তল্লাশি করবে, তখন স্থানীয় দুই বা ততোধিক গণ্যমান্য ব্যক্তিকে সাক্ষী হিসেবে রাখতে হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক অভিযানে দেখা গেছে, পুলিশ একাই তল্লাশি চালাচ্ছে, যা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ফৌজদারি কার্যবিধির ৫২ ধারা অনুযায়ী, কোনো নারীকে তল্লাশি করতে হলে অবশ্যই একজন নারী পুলিশ সদস্যের সাহায্য নিতে হবে। পুরুষ পুলিশ সদস্যের কোনো নারীর দেহ স্পর্শ করা বা তল্লাশি করার এখতিয়ার নেই। পুলিশ মোবাইল ফোন চেক করতে পারে কি?বর্তমান সময়ে পুলিশের হাতে হেনস্তার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে মোবাইল ফোন চেক করা। রাস্তায় থামিয়ে গ্যালারি বা মেসেজ চেক করার যে সংস্কৃতি চালু হয়েছে, তা সংবিধান ও মানবাধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৩(খ) অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিককে তার চিঠিপত্র ও যোগাযোগের গোপনীয়তা রক্ষার গ্যারান্টি দিয়েছে। মোবাইল ফোন এখন ব্যক্তিগত জীবনের ডিজিটাল ডায়েরি। কোনো সুনির্দিষ্ট মামলা বা আদালতের নির্দেশ ছাড়া পুলিশ কারও ফোন চেক করতে পারে না। সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩ বা অন্য কোনো আইনেও পুলিশকে এমন র‍্যান্ডম চেক করার ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ সোলায়মান তুষার জানান, মোবাইল ফোন চেক করা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার মারাত্মক লঙ্ঘন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দোহাই দিয়ে বিনা কারণে কারও ব্যক্তিগত ডিভাইসে প্রবেশ করা বেআইনি। উচ্চ আদালতও বিভিন্ন রায়ে বলেছে, তদন্তের স্বার্থে ডিভাইস জব্দ করতে হলে সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে পাসওয়ার্ড চাওয়া বা জোর করে ফোন খুলে দেখা পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহার। মারধর ও নির্যাতন: আইনের চোখে অপরাধসোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভিডিওতে দেখা গেছে, পুলিশ এক শিক্ষার্থীকে লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছে। এটি কি আইনসম্মত? উত্তর হলো ‘না’। বাংলাদেশের কোনো আইনেই পুলিশকে সন্দেহভাজন বা আটক ব্যক্তিকে মারধর করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। জনগণের জানমাল রক্ষার পরিবর্তে যদি সাধারণ মানুষই নির্যাতনের শিকার হন, তবে তা রাষ্ট্র ও আইনের শাসনের জন্য উদ্বেগজনক। তাই পুলিশের পেশাগত আচরণ, জবাবদিহি ও মানবাধিকার সচেতনতা আরও জোরদার করা জরুরি নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ অনুযায়ী, পুলিশি হেফাজতে কাউকে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করা দণ্ডনীয় অপরাধ। যদি কোনো কর্মকর্তার নির্যাতনে কারও মৃত্যু হয়, তবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং জরিমানা হতে পারে। এমনকি ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৬ থেকে ৫৩ ধারা অনুযায়ী, গ্রেফতারের সময় যতটুকু বলপ্রয়োগ প্রয়োজন (পালিয়ে যাওয়া ঠেকাতে), তার বেশি শক্তি প্রয়োগ করা যাবে না। অর্থাৎ, কেউ যদি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে, তবে তাকে চড়-থাপ্পড় বা লাঠিপেটা করা সম্পূর্ণ বেআইনি। কিছু সদস্যের কর্মকাণ্ডে পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্তআইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী আবু নোমান শাওনের বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব ও সীমারেখার প্রশ্নটি। তিনি মনে করেন, অভিযান ও তল্লাশির নামে কোনো ধরনের হয়রানি, নির্যাতন বা মারধর আইনসম্মত নয় এবং তা মানবাধিকারের পরিপন্থি। পুলিশের মূল দায়িত্ব জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বাহিনীর কিছু সদস্যের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড পুরো পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ‘জনগণের জানমাল রক্ষার পরিবর্তে যদি সাধারণ মানুষই নির্যাতনের শিকার হন, তবে তা রাষ্ট্র ও আইনের শাসনের জন্য উদ্বেগজনক। তাই পুলিশের পেশাগত আচরণ, জবাবদিহি ও মানবাধিকার সচেতনতা আরও জোরদার করা জরুরি’—মন্তব্য করেন তিনি। অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ সংবিধানের পরিপন্থিবাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক কাজী লতিফুর রেজা জাগো নিউজকে বলেন, ‘শুধু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘটনা নয়, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। ক্ষমতার অতিরিক্ত ব্যবহার কোনোভাবেই আইনসঙ্গত নয়।’ তিনি বলেন, ‘কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অপরাধের প্রমাণ বা বৈধ গ্রেফতার প্রক্রিয়া ছাড়া শিক্ষার্থী, সাংবাদিক বা সাধারণ নাগরিকের ওপর শারীরিক আঘাত কিংবা অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ সংবিধানের ৩১, ৩২ ও ৩৫(৫) অনুচ্ছেদের পরিপন্থি।’ ‘এছাড়াও ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৪৬ অনুযায়ী গ্রেফতারের সময় শুধু প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক বলপ্রয়োগই বৈধ। অন্যথায় দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ধারা ৩২৩ ও ৩৫০ অনুযায়ী তা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে’—যোগ করেন তিনি। টিটি/এমকেআর